ভালোবাসার দিন

ভালোবাসার দিন
  সারাটা দিন এ বাড়ি ও বাড়ি দুবেলা কাজ করে সন্ধ্যার সময় ঘরে এসে দু চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে দুলুর। কিন্তু বদমেজাজী,মাতাল স্বামী ঘরে ঢুকেই দুলুর কাছে খেতে চাইবে। আর তখনই তাকে খাবার দিতে না পারলে সে দুলুর চুলের মুঠি ধরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ আর মারধর করতে শুরু করে। সংসারে একটা পয়সা দেওয়ার মুরোদ নেই।সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যে টাকা পায় তা দিয়ে গলা অবদি মদ খেয়ে ঘরে এসে দুলুর উপর অত্যাচার শুরু করে।
   একখানা মাত্র ঘর।এক চিলতে বারান্দা। বারান্দাতেই রান্নাবান্না আর তা নিয়ে এসে ঘরে বসে খাওয়া।দুটো মানুষ একসাথে নিচে বসে খেতে খুবই অসুবিধা হয়। এই ঘরের ভাড়া দেড় হাজার টাকা।তারপর লাইট আলাদা, জল বাইরে থেকে টেনে নিয়ে আসতে হয়।সবকিছুই করতে হয় দুলুকে। নরেশ তাকে একটা টাকা দিয়েও সাহায্য করে না। খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দুলু চলে যায় লোকের বাড়িতে কাজ করতে।এক বাড়িতে রান্নাবান্না করে সেখানে এসে দুপুরে খায় সে। আর নরেশ ভ্যান চালিয়ে বাইরে কোথাও ডাল ভাত ,ডিম ভাত খেয়ে নেয়।দুলুর ঘরে রান্না বলতে সেই রাতে।সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার সময় একটু আনাজপাতি আর  কম পয়সায় একটু মাছ যদি পায় তাহলে সে কিনে নিয়েই বাড়িতে আসে।তার বরটা ভালোমন্দ খেতে একটু ভালোবাসে। দুলু এত অত্যাচার সহ্য করেও বরের মন রাখতে আর নিজের ভালোবাসার টানে নরেশ এর জন্য সব সময় একটু ভাল মন্দ রান্না করার চেষ্টা করে। দুলু দেখেছে যখন তার বর মদ খায় না ভালো থাকে তখন সে দুলুর সাথে খুব ভালো ব্যবহার করে,মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, বাইরে বেরোলে একটা টিপের পাতা বা একটা কানের দুল দুলুর জন্য কিনে নিয়ে আসে।তাতেই দুলু বুঝতে পারে নরেশ তাকে এখনো খুব ভালোবাসে। কিন্তু পেটে  মদ পড়লে সে হয়ে যায় সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।তখন তার কোন কিছুই হুশ থাকেনা।অনেকদিন খেতে খেতে সেখানেই ঝিমাতে শুরু করে।দুলু তখন তার মুখ ধুয়ে, মুখ মুছিয়ে দিয়ে ধরে নিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দেয়।
   আজ দুবছর ওদের বিয়ে হয়েছে। বিয়ের মাস ছয়েক পর থেকেই লোকটা মদ ধরেছে।আগে মানুষটা কত ভালো ছিল। সারাটাদিন ভ্যান চালালেও সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে কত গল্প করতো।এদিক ওদিকে ঘুরতেও নিয়ে যেত।সেই কবে মানুষটার সাথে গিয়ে “বাবা কেন চাকর” দেখে এসেছিল তারপর আর কোনদিন হলমুখো হয়নি মানুষটা।সন্ধ্যা হলেই তো মদ গিলে বসে থাকে।এসব ভাবতে ভাবতে মাঝেমধ্যেই দুলু অন্যমনস্ক হয়ে পরে।আজ কাজের থেকে ফেরার পথে দুলু আড়াইশ মুরগির মাংস কিনে নিয়ে এসেছে।মাইনে পেলে সেদিনটা সে একটু মাংস আনে।তার মানুষটা যে খেতে ভালোবাসে।এমাসে প্রথমদিকে যে সব বাড়ির মাস হয়ে যায় সেখান থেকে টাকা পেয়েও আনেনি।একটা বাড়িতে ১৪ই ফেব্রুয়ারি দুলুকে কাজের জন্য মাইনে দেয়।এ দিনটা সবাই বলে দুলু শুনেছে ভালোবাসার দিন।তাই মনেমনে ঠিক করে রেখেছিল এ মাসে ওখান থেকে মাইনেটা দিলে সে মানুষটার জন্য একটু মাংস আনবে।
 দুলু সেদিন বাড়িতে ফিরে দেখে মানুষটা আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে।এসে স্নান করে পরিষ্কার জামা কাপড় পরে দুলুর জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। দুলু এসে দেখে তো অবাক! দুলুকে দেখে বলল,
— একটু চা করে নিয়ে এসো। আলুর চপ এনেছি। দুজনে বসে মুড়ি মেখে চপ দিয়ে খাই।
 দুলু তো অবাক!আজ কতদিন পর কত মিষ্টি মিষ্টি কথা স্বামীর মুখে শুনে দুলুর বেশ ভালো লাগে।সে  তড়িৎ গতিতে মুড়ি মেখে নিয়ে আসে। মাংসটা রান্না করে তার স্বামীকে খেতে দেয়।নরেশ খেতে খেতে বলে,
— তুমিও নিয়ে বস আজকে দুজনে একসাথে খাই। খেয়েদেয়ে দুজনে খাটে উঠে যায়।হঠাৎ করে নরেশ খাট থেকে নেমে জামার পকেট হাতরে কিছু একটা হাতে করে নিয়ে খাটে উঠে আসে।তখন দুলু তাকে বলে,
—- আরে লাইটটা অফ করে দাও।সারাদিন পরিশ্রম করার পর খুব ঘুম পাচ্ছে।আচ্ছা মাংসটা কেমন খেলে বললে নাতো?
—  বলবো বলবো তোমায় একটা জিনিস দেবো।আসলে কিভাবে দেবো সেটাই ভাবছি।
দুলু আরো অবাক হয়!ভাবছে মানুষটার হল কি?বলে,
— কি দেবে দাও না।
—-চোখটা বন্ধ করো, আমার লজ্জা করছে।
—আচ্ছা ঠিক আছে বুঝেছি।এই বুজলুম চোখ এবার দাও– । নরেশ তখন তার হাতে একটা লাল গোলাপ ধরিয়ে দেয়। আর বলে,
— জানো দুলু  আজ না  ভালোবাসার দিন।যে যাকে ভালোবাসে আজকের দিনে তাকে নাকি লাল গোলাপ দিতে হয়।কত লোক কিনে নিয়ে যাচ্ছে গোলাপ।আমিও আজকে তোমার জন্য তাই একটা লাল গোলাপ কিনে আনলাম।
 দুলু আনন্দে আত্মহারা হয়ে নরেশের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে, “সেই জন্যই তো আমিও ভালোবেসে তোমার জন্য মুরগীর মাংস আনলম।তুমি যে মাংস খেতে খুব ভালোবাসো।”অনেকদিন পর নরেশ দুলুকে সেই আগের মতো কাছে টেনে নিয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দিল।

  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *