ভেঁপু – শর্মিষ্ঠা গুহ রায়(মজুমদার)

 [post-views]

 [printfriendly]

 

এইতো সেইদিনকার কথা,মেলা হইতে একখানি ভেঁপু কিনিলাম।তাহা নিজ ইচ্ছায় নহে,আমার পঞ্চম বর্ষীয় পুত্র যে পরিমাণে জেদ শুরু করিয়াছিল তাহাতে সেইটি না কিনিয়া উপায় ছিলনা।যাহা হউক,বড় খুশী হইয়া সে সারাটি পথ তাহা বাজাইতে বাজাইতে আসিল।বাড়ি আসিয়াও রক্ষা নাই,ভেঁপু বাজাইয়া বাজাইয়া কানের অবস্থা করুণ  করিয়া তুলিল।

এইভাবে দিনদুই গত হইল।এখন তো বলিতে গেলে পোঁপোঁ আওয়াজ অভ্যাসে পরিণত হইয়াছে।যখনতখন তাহার আওয়াজ বাজিয়া উঠিতেছে।ফলস্বরূপ পুত্রের পিঠে দুমাদুম্ কয়েক ঘা পড়িতেছে দিন দুপুরে।তাহাতে তাহার ভ্রূক্ষেপ নাই।কানের ডাক্তারবাবুর নিকট অতি শীঘ্র যাইতে হইবে বলিয়া প্রায় মনস্থির করিয়া ফেলিয়াছি।

তিন নম্বর দিনের ঘটনা,দুপুরবেলা মাতাপুত্রে খাওয়াদাওয়া সাঙ্গ করিয়া একটুখানি শুইয়াছি।পুত্রের চক্ষু প্রায় লাগিয়া আসিয়াছে।আমারও তন্দ্রামতন আসিয়াছে।কোথা হইতে যেন ভেঁপু বাজিতেছে।চক্ষু খুলিয়া দেখিলাম,পুত্রতো পাশেই শুইয়া ঘুমাইতেছে,তবে ভেঁপু কে বাজাইতেছে?

আমি তড়িৎ গতিতে উঠিয়া বসিলাম।জানালার নিকট দৌড়াইয়া গিয়া দেখিতে লাগিলাম-কে এমন করিয়া আবার ভেঁপু বাজাইয়া আমার কানের মাথা খাইতেছে?না, কোথাও তো কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না।একটু নহে,বেশখানিকটা হতভম্ব হইয়া খুঁজিতে শুরু করিলাম-শব্দের উৎসটি কোথায়? কেন জানিনা মনে হইতেছে এ শব্দ আমার ঘর হইতেই নির্গত হইতেছে।আমি শব্দ অনুসরণ করিয়া হাঁটা শুরু করিলাম।এ ঘর ও ঘর করিয়া শেষঘরখানিতে প্রবেশ করিয়া মনে হইতে লাগিল এই ঘরেই কোথাও শব্দটি হইতেছে।

আমি পাগলের ন্যায় খুঁজিতে লাগিলাম ভেঁপুটিকে।অবশেষে খাটের নীচে তাহাকে পড়িয়া থাকিতে দেখিলাম। এবং বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার,তাহা হইতে আপনা হইতেই আওয়াজ নির্গত হইতেছে।আমার কান যেন ফাটিয়া যাইতেছে।আমি অসুস্থ বোধ করিতেছি।ভেঁপু সমানতালে বাজিয়া চলিতেছে।

আমি পাগলের ন্যায় ভেঁপু টিকে মাটিতে ছুঁড়িয়া ফেলিলাম।পা দিয়া আঘাত করিতে লাগিলাম।ভেঁপুটি ভাঙিয়া গেল,কিন্তু তাহার আওয়াজ বন্ধ হইল না।

আজ সাতদিন হইল আমি হাসপাতালে ভর্তি।নার্স মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছি প্রায় তিনদিন যাবৎ আমি অজ্ঞান হইয়া ছিলাম।চারদিন যাবৎ আমি কেমন জানি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আছি।জাগিয়া উঠিলেই আমি সেই আওয়াজটা শুনিতে পাইতেছি।আমি বাদে কিন্তু সেই আওয়াজ আর কেহই শুনিতে পাইতেছে না।আমি বারংবার সেই সম্বন্ধে সবাইকে জিজ্ঞাসা করিতেছি।

আর কিছুক্ষণ পর আমার পুত্র  আসিবে তাহার পিতার সাথে।এই কয়েকদিন তাহার আমার সহিত দেখা করিবার অনুমতি ছিলনা।সে তাহার পিতার হাত ধরিয়া আমার নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল।আমি চক্ষু খুলিয়া তাহার হাতটি ধরিবার চেষ্টা করিলাম।

হাত ধরিয়াই আমি এক ঝটিকায় তাহার হাতটি ফেলিয়া দিলাম।এ কী দেখিলাম! তাহার হাতে সেই ভেঁপু যার আওয়াজ আমাকে পাগল করিয়া তুলিয়াছে।আমি ভয়ে চক্ষু বন্ধ করিয়া ফেলিলাম।পুত্র আমার চিৎকার করিয়া ডাকিতেছে -‘মা ও মা মাগো’।আর আমার কানে তখনো বাজিতেছে সেই তীক্ষ্ণ  আওয়াজ-পোঁ–পোঁ————পোঁ———-।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top