মধ্যবিত্তের জীবন সমীকরণ

 8 total views

গল্প:”মধ্যবিত্তের জীবন সমীকরণ”
লেখায়ঃ মুহাম্মদ ফয়সাল উদ্দীন

 

—শহরের নিভু-নিভু ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে আছে এক ক্লান্ত অবসন্ন হৃদয়।দেখে মনে হয় যেন একটা অনিশ্চয়তার শহর কাঁধে বহন করে চলছে প্রতিনিয়ত। মনে হয় যেন গ্রীষ্মের কাটফাটা রৌদের তিব্রতায় ধুক-ধুক করা হৃদয়ের ন্যায় তার হৃদয়েও কঠিন তৃষ্ণা কিন্তু নিবারণ করার মতো পর্যাপ্ত জল নাই।

যাই-হোক ধুলো-বালির আস্তরণে আলতো করে একটা ফুঁ দিয়ে তার পাশের খালি জায়গা এসে বসে পড়লাম।যদিও আমি এসে বসাতে তার মনঃসংযোগে একটু ব্যাঘত ঘটলো ।কারণ এতক্ষণ হয়তো তার বিচরণ ছিলো অন্য কোনো জগতে। যেখানে কষ্টেগুলো লালন করা হয় যত্ন সহাকারে।
যাই-হোক পঞ্চাশোর্ধ কোন মানুষ যখন ২৩ বছরের কোনো টগবগে যুবকের পাশে এসে বসে তখন যেভাবে সম্ভোধন করা উচিত স্বভাব-সূলভ ভঙ্গিতে ঔইভাবে করে ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা আলতো করে হাঁসি দিলো। দুজনে চুপচাপ বসে রইলাম অনেক্ষণ

তারপর,
আস্তে আস্তে তার কাছে গল্পের অজুহাত খুজতে লাগলাম।প্রথমে তার কাছে নাম জিজ্ঞেস করলাম।
~আমি কপিল
—তারপর তার কাছে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুড়ে মারলাম।প্রথমে একটু ইতস্তত করল।করবেনা ই বা কেন।অপরিচিত কোনো মানুষ তাও আবার পঞ্চাশোর্ধ।

কিছুক্ষণ পর,
জবাব আসলো..
~আঙ্কেল আমার দেশের বাড়ি ভোলা। এখানে থেকে পড়ালেখা করি।
—তোমার ফ্যামিলিতে আর কে কে আছে?
~জ্বি আম্মু আর দুইটা ছোট ভাই বোন।
—তোমার আব্বু নাই?
~না।আমি যখন ক্লাস নাইনে এ তখন ওনি মারা যান।
—দুঃখিত।ফ্যামিলি কি তুমি চালাও।
~জ্বি হ্যাঁ।
—কীভাবে!তুমি কি করো?
~আমি পড়ালেখা করি। একটা পার্টটাইম জবও করি।যদিও বেতন বেশি না।তাই টিওশন ও করতে হয় রাত্রে।
—কিছু মনে কইরো না তোমাকে দেখেই আমার মনে হয়েছে তোমার মন ভালো নেই।ভারি কোনো অবসাদ তোমার সঙ্গি।তাই ভাবলাম একটু গল্পগুজব করি।দেখি ছেলেটার দুঃখের নদী কত্তো গভীর।দেখি একটু হালকা হয় কি না।তাই মুলতঃ তোমার পাশে এসে বসা।
~ধন্যবাদ।
—তো আজকে মন খারাপের কারণ কি?

~ইয়ে কিছু না।
—কপিল আমি তোমার বাবার মতো।আমাকে বলতে পারো।আর দুঃখ নিজের মধ্যে চেপে রাখলে আরও বেড়ে যায়।
~আসলে আঙ্কেল আব্বু মারা যাওয়া পর থেকে আম্মু আমাদের ফ্যামিলির দায়িত্ব নিছিলো।আমিও তখন অনেক ছোট ছিলাম।সবে মাত্র ক্লাস নাইনে পা রাখছি।আম্মুর ইচ্ছা আম্মু আমাদের মানুষের মতো মানুষ করবে।তাই ওনি অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়ালেখা চালাইছে।এজন্য আম্মু মাইনষের ক্ষেতে কামলার কাজ পর্যন্ত করছে।

ইন্টারমিডিয়েট শেষ করার পর
আমি অনার্সে ভর্তি হয়।আস্তে আস্তে নিজের খরচ নিজে টিওশন করিয়ে বহন করতে শুরু করি।একটা সময় ছোট্ট একটা জব পেয়ে যায়। তারপর থেকে আম্মুকেও অসুস্থ শরীর নিয়ে কামকাজ না করার জন্য বলে দিই।প্রথম প্রথম আম্মু আমাকে না বলেই কাজ করতে থাকে।

এরপর একসময় অসুস্থতার কারণে আম্মু কাজকাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।মোটামুটি এখন আমার টাকাই সংসার চলে। এভাবে প্রায় দুবছর চলে।কিন্তু গত চারমাস আগে আমাদের অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি নেই।অল্প অল্প টাকা পাঠাচ্ছি।তাও ধার দেনা করে। মোটামুটি অনেক টাকা ধার করছি।আম্মুর অবস্থাও দিনদিন অবনতির দিকে।তার উপর ছোট ভাই গতকাল কল দিয়ে বলেছে তার নাকি ফর্ম পিলাপের জন্য আড়াই হাজার টাকা লাগবে।তাও কালকের মধ্যে।এসবের মধ্যে আবার ছোট বোন বায়না ধরে আছে কিছু। কি করবো বুঝে ওঠতে পারতেছি না।
ছোট ভাইয়ের পরিক্ষা, মায়ের অসূখ আর বোনের আবদার,কি করবো বুঝতেছি না…
—টিউশন থেকে বুঝিয়ে কিছু এডভান্স নাও
—ইতোমধ্যে এডভান্স নিয়ে খরচ করে পেলছি।
—অনেক্ষণ শোনার পর আমি থ হয়ে রইলাম।এটা ছিলো আমার ভাবনাতীত।মনে হলো অনিশ্চিত শহরে এই এক নিশ্চিত হরতাল।তাও তাকে সান্তনা দিতে চেষ্টা করলাম..

—সমাস্যা নেই।আল্লহর উপর তাওয়াককুল করো আর ধৈর্য ধরো
বিপদ মুমিনের জন্য রবের পক্ষ থেকে পরিক্ষা স্বরুপ।আর এই টাকাগুলো রাখো!তোমার ভাইকে দিও। ঋণ হিসেবে দিলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিশোধ করে দিও। আর এই নাও! এটা আমার কার্ড।আমার সাথে যোগাযোগ কইরো।
চললাম ভালো থেইকো।পরিবারের যত্ন নিও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *