মনের মত

মনের মত
নন্দা মুখাৰ্জী রায় চৌধুরী

বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে কোন সন্তান না হওয়ায় সুবিমল আর এলিসা খুবই ভেঙ্গে পরে | ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সমস্ত জায়গায় চিকিৎসা করে বেরিয়েছে | কিন্তু সবজায়গায় সেই একই কথা সন্তান ধারণের এলিসার অক্ষমতা | আত্মীয়স্বজন বর্জিত দুটি প্রাণী সম্পূর্ণ একাকী | সুবিমল অফিস আর বাড়ি আর এলিসা তার সংসার নিয়ে |
অবাঙালী মেয়ে এলিসা | সুবিমল মুখাৰ্জী পরিবারের বড় ছেলে | কুলীন বংশজাত ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তানের সাথে অবাঙালী পরিবারের মেয়ের বিয়ে হতে পারেনা একথা সুবিমলের বাবা তার স্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন | পরিণামে সুবিমল মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ঘর ছেড়েছিলো | মস্তবড় পরিবার এই মুখাৰ্জীদের | সম্পত্তি , বাড়ি ,অর্থ প্রাচুর্য্যে জমজমাট এই পরিবারের কাছে শহরের অনেক গাড়ি বাড়িয়ালা ধনী পরিবারও মৃয়মান | বাড়িতে ঠাকুর , দাসদাসী আজকের যুগেও বর্তমান | এহেন পরিবারের ছেলে সে কিনা ভালোবাসলো এক শিখ বংশজাত একটি মেয়েকে?সুবিমল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে বাড়ির কর্তা সকলকে ডেকে জানিয়ে দিলেন ‘ আজ থেকে সুবিমল এই পরিবারে মৃত |’ বাড়ির সকলে চমকে উঠলো | আর বাড়ির কর্ত্রীর বুকে হাতুড়ি পেটালেও কোনদিন পাশের মানুষটি যেমন টের পায়নি আজও তার অন্যথা হলনা | এরকম যে হবে তা তিনি জানতেন | সুবিমলের হাত দিয়েই তিনি তার ভাবি পুত্রবধূর জন্য তার বাবার দেওয়া মোটা মাছের কাটার সোনার হারটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন |
সন্তান না হওয়ার যন্ত্রণা ভুলতে প্রত্যেক রবিবার স্বামী , স্ত্রী দুজনেই বেরিয়ে পড়তো লংড্রাইভিং এ | কোনদিন তারা ফিরে আসতো আর কোনদিন বা অনেক দূরে চলে গেলে ছোটবড় যেকোন হোটেলে রাত কাটিয়ে ভোরবেলায় বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিত | এইরকমই কোন একদিন তারা এক হোটেলে যখন রাত্রিযাপন করছিলো ; রাত তখন তিনটে কি সাড়ে তিনটে হবে , দরজায় বারবার ধাক্কা পড়ছে | ঘুম চোখে দুজনেই ভয় পেয়ে যায় | পরে হোটেল ম্যানেজারের গলার আওয়াজ পেয়ে ভিতর থেকেই সুবিমল জানতে চায় ‘ কি হয়েছে ?’ একজন মহিলার লেবার পেইন উঠেছে তাকে একটু হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে গাড়িতে করে |
মেয়েটির সাথে শুধু তার স্বামীই আসে | কাছেপিঠে কোন স্বাস্হ্যকেন্দ্রে তাকে ভর্তি নেয়না | বাচ্চার হাত বেরিয়ে এসেছে মায়ের জীবনহানির সম্ভাবনা রয়েছে | এইভাবে তিনচার জায়গায় ঘোরার পর অবশেষে একটি নার্সিংহোমে তাকে ভর্তি করা হল তার স্বামীর অর্থ খরচ করার ক্ষমতা নেই জেনেও | এলিসা সুবিমলকে রাজি করালো সমস্ত খরচ বহন করার জন্য | ভোররাতে সুন্দর এক ফুটফুটে মেয়ের জম্ম দিয়ে মহিলা মারা গেলেন | কিন্তু তার স্বামীটি ওই বাচ্চা নিতে অস্বীকার করলেন | সংসারের তিনি একা মানুষ এ বাচ্চা কিভাবে তিনি মানুষ করবেন ?এবং কোন একসময় তিনি লুকিয়ে নার্সিংহোম থেকে পালিয়ে গেলেন |
এলিসা আর সুবিমলের আদরের মেয়ে হয়ে লিজা ওরফে শাবানা মানুষ হতে লাগলো | অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ছুটাছুটি দৌড়াদৌড়ির পর তার বাবা মোসলেমুদ্দিনের জায়গায় বাবা সুবিমল মুখাৰ্জী আর মা আমিনা খাতুনের জায়গায় এলিসা মুখার্জী — সরকারি সমস্ত নিয়মকানুন মেনে |
শাবানা মুখাৰ্জী একজন বড় হার্ট সার্জন | ডাক্তারি পাশ করার পাঁচ বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষের যেকোন প্রান্তে এই নামটা সুপরিচিত হয়ে উঠেছে | এই মেয়ের কথাও সুবিমলের মায়ের অজানা নয় | বাবা বাড়িতে না থাকলে মাঝে মধ্যে একটু আধটু কথা সুবিমলের সাথে তার মায়ের হয় তাও বাড়ির সকলের চোখ এড়িয়ে | গতরাত্রে লিজা বাড়িতে ফিরতে পারেনি বেশ কয়েকটি ক্রিটিকাল অপারেশন থাকায় | স্বাভাবিক ভাবেই তার বাবা, মা সারাটা রাত ভালোভাবে ঘুমাতে পারেনি | যদিও মাঝেমধ্যে লিজার এরকম হয় কিন্তু তারা তো মেয়েকে চোখে হারায় | একদম ভোরের দিকে দুজনেরই চোখটা একটু লেগে এসছে অমনি ল্যান্ডফোনের আওয়াজ | উঠে গিয়ে ড্রয়িংরুমে ফোন তুলে শোনে মায়ের গলার আওয়াজ | খুব চাপা স্বরে মা যা বললেন তার সারমর্ম হল কাল থেকে তার বাবার বুকের বাদিকটা ব্যথা হচ্ছিলো এখানকার ডক্টর বলে গেছেন কলকাতায় নিয়ে যেতে — সময় খুব কম হাতে | সুবিমল লিজাকে ফোন করে সব জানালো এবং এও বললো ‘ উনি তোমার দাদু কিন্তু তুমি ওনাকে পরিচয় দেবেনা | আমার বাবার জীবন আজ তোমার হাতে তুমি আমার বাবাকে বাঁচিয়ে দাও | তারা রওনা দিয়েছেন খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবেন |’
বাহাত্তর ঘন্টা ধরে জমিমানুষে টানাটানি আর বেলুন সার্জারির পর সুকমল মুখাৰ্জী চোখ খোলেন | এই তিনদিন সুবিমলের মা ও ছোটভাই তার বাড়ি থেকেই হাসপাতালে যাতায়াত করেছে |
— কেমন আছেন মিষ্টার মুখাৰ্জী ?
— ভালো আছি ম্যাডাম | আপনার হাতে তো জাদু আছে ম্যাডাম |
লিজা হেসে পরে বললো ,
— আপনি আমার দাদুর বয়সী | আমার ডাক নাম লিজা | আপনি আমাকে এই নামেই ডাকেন আর তুমি করে বলুন |
— তাহলে তো তোমাকেও আমাকে দাদু ডাকতে হয় | আর তুমি করে বলতে হয় |
— আমার কোন আপত্তি নেই |
ঠিক এই সময়ে সুবিমলের মা আর ভায়ের প্রবেশ |
— এই দেখো | এতো বড় একজন ডাক্তার অথচ কি অমায়িক ব্যবহার | আমরা দুজনে দাদু নাতনি হয়ে গেছি | এই হচ্ছে পরিবারের শিক্ষা | ও ও কিন্তু মুখাৰ্জী | তারপর স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন – আচ্ছা তোমরা কোথায় আছো এ কটাদিন ?
— হো –টে — লে
পূর্ব প্লান মত সুবিমল আর এলিসা এসে ঢোকে | সঙ্গে সঙ্গে লিজা দৌড়ে গিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে ,
— বাবা আমি তোমার কথা রাখতে পেরেছি | তোমার বাবাকে আমি সুস্থ্য করে দিয়েছি |
সকলেই নিঃশ্চুপ | কারো মুখে কোন কথা নেই | নিস্তব্দতা ভেঙ্গে সুবিমলের দিকে তাকিয়ে তার বাবা বললেন ,
— ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায় | অপমানের যোগ্য জবাবটা দিয়েছো | মেয়েকে খুব সুন্দর মানুষ করেছো | বাবা হিসাবে আমি গর্বিত | পারলে আমায় ক্ষমা কোরো | সুবিমল , এলিসা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করে | গিন্নীর দিকে তাকিয়ে সুকমল বলেন ,
— আরে চুপ করে কি বসে আছো ? গলার হারটা খুলে ওর গলায় পরিয়ে দাও | মুখাৰ্জী বাড়ির বড় বৌ | খালি হাতে মুখ দেখা ঠিক নয় |
এলিসা গলায় হাত দিয়ে হারটা তুলে বলে ,
— মা তো মুখ দেখার আগেই আমাকে এটা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন | আর হাতটা দেখিয়ে বলে , সেদিন বাড়িতে ঢুকেই নিজের হাত থেকে খুলে এই বালা জোড়া দিয়েছেন |
— ও তারমানে আমার কাছে মিথ্যা বলা হয়েছে হোটেলের কথা |প্রথম থেকেই তোমাদের মায়ের সাথে যোগাযোগ ছিল | মাঝখান থেকে আমিই খারাপ হলাম | যাকগে যাক — দিদিভাই আমায় কবে ছাড়বি বলতো ?
— তোমাকে তো আমি আর ছাড়বোনা দাদু | এখান থেকে ছেড়ে দিয়ে সাথে করে আমার বাবার বাড়ি নিয়ে যাবো | এতে যদি তুমি রাজি না থাকো তাহলে আরও কিছুদিন এখানেই থাকতে হবে |
— না রে দিদিভাই তুই আমাকে তোদের কাছেই নিয়ে চল | বৌমার হাতের একটু সেবাযত্ন নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই | নিজের অন্যায় অনেকেই নিজের মুখে স্বীকার করতে পারেনা | কিন্তু আজ স্বীকার করতে আমার একটুও বাধা নেই — জাত , ধর্ম , বংশমর্যাদা নয় মানুষের মনুষ্যত্বই হচ্ছে আসল | আর এই সহজ সত্যতা বুঝতে আমার সারাটা জীবন লেগে গেলো |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top