মাতৃত্বের স্বাদ

মাতৃত্বের স্বাদ
কলমে: দয়াময় বাগ
——————————–
ও কি মাল যাচ্ছে রে পল্টু, পুরো খাসা- এইভাবেই নিজের পড়ার রাস্তার মোড়ে কবিতাকে প্রায়ই এই রকম ট্রল শুনতে হয়। যারা ট্রল করে তারা বছর কুড়ি-একুশের ছেলে। ওরা জানে কখন কবিতা এই মোড়ের মাথা দিয়ে বাড়ি যায়। আগেও অনেক বার করেছে। এই রকম ট্রল কবিতার ভালো না লাগলেও তাকে শুনতে বাধ্য কারণ নিষিদ্ধপল্লীতে তো আর ভালো লোক আসবে না। নিষিদ্ধপল্লীতে যৌবনের ভাঁজে সবাই যে পাগল।এই কথা কবিতা খুব ভালো করেই জানে, আর এরা তো কুড়ি একুশের ছোকরা।
জন্মের পর থেকে এই সব শুনে কবিতার অভ্যস্ত তাই এই রকম কথা কবিতার কানে ঢুকলেও মনে রাখে না। কিন্তু আজ কেন অন্যরকম দেখাচ্ছে কবিতাকে।
রোজকার মতন একটু এড়িয়ে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে কবিতা ঘরে ঢুকলো।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে দোতালায় এসে কম্পিউটার বই ও খাতাটা খাটের মধ্যে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলল,
—- মা – ও মা, মা গো । তুমি কি শুনতে পাওনা।

হাতে ধুপ আর দেশলাই নিয়ে ঠাকুর ঘর থেকে কবিতার মা বেরিয়ে তার কাছে এসে,
— সন্ধ্যার ধুপ-ধুনো টা তুই দিতে দিবি না দেখছি। বল কি হয়েছে ?এত চিৎকার করছিস কেন ?গোটা এলাকা টাকে মাথায় করে দিবি দেখছি!
মায়ের কথা থামতে না থামতেই কবিতা শুরু করে দিল-
—- আমাকে তুমি সেদিন কেন গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দাওনি? কেন আমার গলা চেপে মেরে দাও নি? যারা আমাকে জন্ম দিল তারাই যখন আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেল, তাহলে তোমার কি দরকার ছিল, আমাকে সেখান থেকে কুড়িয়ে মানুষ করা ,বড় করা, পড়াশোনা শেখানো এইভাবে চিৎকার করতে করতে কবিতা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলো।

অমনি কবিতার মা দেশলাই আর ধুপটা পাশে থাকা বইয়ের টেবিলের ছুড়ে দিয়ে কবিতাকে জাপটে ধরে শান্ত হও মা,শান্ত হও। লক্ষীমেয়ে আমার।আজ আবার কে কি বলল। শান্ত হও মা,শান্ত হও। কবিতাকে এইভাবে অনেকক্ষন শান্ত করতে করতে তারই ফাঁকে কবিতার মা দুতালা ব্যালকনিতে গিয়ে নিচের দিকটা মুখ বাড়িয়ে দেখে নিল।
তারপর আবার কবিতার কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে-
—- তোকে কতবার বলেছি হনহন করে সোজা ঘরে চলে আসতে কোন দিকে তাকাবি না তাও কথা শুনিস না।
—- আমি কারুর দিকে তাকায় নি মা, ও পাড়ার পল্টুরাই তো….. তার পর আবার কবিতার কান্না।
—- পল্টু নয় কবিতা,
ওই ছোকরাটার বয়স হলো কিন্তু লালসা গেল না। হারামিটা আবার পল্টু কে লেলিয়ে দিয়েছে।হারামী বলতে নিষিদ্ধ পল্লীর দালালদের হেড টিংকু। যে কিনা কবিতার মায়ের জীবন টা এক সময় নষ্ট করে দিয়েছে।

বহুদিন ধরে এই যৌনপল্লীতে কবিতার মায়ের বাস ।অনেক নোংরা ইতিহাসের সাক্ষী সে,তাই ওদের সাথে না লাগায় ভালো। সেটা কবিতার মা ভালো করেই জানতো তাই নিজেকে কিছুটা মানিয়ে নিয়ে অসহায় ভাবে-
বেশ তো এবার তো তোর উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হয়ে যাবে। ভালো কলেজ দেখে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করিস। তখন তোকে আর কেউ বিরক্ত করবে না কেমন। কবিতা বরাবরই পড়াশুনাতে খুব ভাল, মাধ্যমিকে ও নাকি স্টার পেয়েছিল। সঙ্গে চার চারটি লেটার।
—আর তোমার কি হবে মা।
তোমাকে কে দেখাশোনা করবে।তোমার মুখে কে ওষুধ তুলে দেবে বলতো ।
কবিতা জানে, যে চম্পাকে সে মা বলে, আসলে সে তার মা নয় কিন্তু তবু গোটা পৃথিবীর কাছে কবিতা প্রমাণ করতে চাই চম্পাই তার মা।

মা ডাকে যে কতটা তৃপ্তি তা চম্পা এখন বেশ বোঝে। তাছাড়া মাতৃত্বের স্বাদ যে কতটা মিষ্টি তা একজন মা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। তার সাথে সে এও বোঝে যে মা হলে কতটা দায়িত্ব ঘাড়ে চাপে,কতটা লড়াই দিনের-পর-দিন বাড়ে।

লড়াইটা বেশ জীবনের প্রথম থেকেই চম্পার ভালোই ছিল দশ বছরে বাপ- মা মরা মেয়ে টি যখন গ্রামের মোড়ল দের বাড়িতে বাধা কাজে ঢুকলো তখন থেকেই জীবনের লড়াই শুরু। দু’মুঠো ভাতের জন্য দিনরাত পরিশ্রম। বৌমণি দের হাজার হাজার ফরমাশ। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই সবই তাকে হজম করতে হতো।অবশ্য তখনও অব্দি জীবনটা ঠিকই ছিল।
কিন্তু পাখির বাসা টা ভেঙে পড়ল সামান্য একটু বিশ্বাস আর ভালোবাসার ঝড়ে। ঐ যে ওদের গ্রামে বেড়াতে আসা শহরের ছেলে টিঙ্কুর প্রেমে পড়ে বিয়ে, পরে বিক্রি হয়ে মাথা গোঁজার স্থান যৌনপল্লী। সে তো আরও কঠিনতর লড়াই। তাই লড়াইটা চম্পা খুব কাছ থেকে দেখেছে এখনো লড়াই চলছে তবে নিজেকে নিয়ে নয় কবিতাকে নিয়ে। কবিতার জন্য তার খুব ভয় হয়,যৌনপল্লীর বড় বড় মাথারা ওর ওপর নজর রেখেছে যে।হবেই না বা কেন কবিতা যে রূপে পূর্ণিমার চাঁদ তাই কবিতা কে আড়াল রেখে বড় প্রাচীর হয়ে থাকতে চাই চম্পা।
মা ডাকের মর্যাদা দিতে হবে যে তাকে।

কবিতার কথা ভাবতে ভাবতে চম্পা যখন পুরোপুরি অন্যমনস্ক ঠিক সেই সময়ে
— ও মা কি হলো !কোথায় যে হারিয়ে যাও?
— না রে, হারিয়ে যাবো কেন।
— শোন কবিতা তোকে আমাকে গোটা পৃথিবীর কাছে মা প্রমাণ করতে হবে না ।শুধু তোকে মা হতে হবে খুব ভালো মা,মিষ্টি মা,কিরে পারবি না।
—- ধুর কি যে সব বল!
এই ভাবেই মা-মেয়ে তে দুজনে হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ল ঠিক যেমন ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া ধূপকাঠি আর দেশলাই টি এলোমেলোভাবে টেবিলে পড়ে আছে।

আর ঐ দিকে পাশের ঘর থেকে আসা ঠাকুরকে দেওয়া ধুনোর ধোঁয়ায় গোটাবাড়ির সাথে যেন চম্পা আর কবিতা মিলিয়ে গেল।
———————–*****———————

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top