মানবীয় চেতনার গভীর ও চিরন্তন আবেগ – তৈমুর খান

 9 total views

সাতটি গল্পের সংকলন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ের ‘৭ নুড়ি'( প্রথম প্রকাশ ২০২০) নামক গ্রন্থটি। গল্পের রচনাকাল ১৯৭৬-২০১৮। প্রথমদিকের তিনটি গল্প সাধু ভাষায় লেখা: ‘নবমী মহান্ত’, ‘বিদায়ী সপ্তমী’ এবং ‘মাধবীকঙ্কণ’। বাকি চারটি গল্প: ‘ছায়াতরু’, ‘তিতিক্ষা’, ‘পাড়ি’ এবং ‘পালাবদল’ চলিত বাংলায় ২০০৩ এর পরবর্তী সময়ে লেখা। সব গল্পগুলিরই প্রেক্ষাপট গ্রামবাংলার পারিবারিক জীবনের বিরহদহন, মৃত্যু ও প্রিয়জন বিয়োগ। কোথাও প্রেম এবং বাল্যজীবনের ছবিও ফুটে ওঠে। অভিমান বিচ্ছেদের আবহ তৈরি করে।

সাংবাদিক, সম্পাদক এবং শিক্ষক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় গল্পের ভেতরও মাঝে মাঝে মানব জীবনের রস আস্বাদন করেছেন। সেখানে ভাঙন, স্পন্দন, কাতরতা, ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের মূর্ছনাকে তাৎপর্যমণ্ডিত করে তুলতে চেয়েছেন। আবার মানব-মানবীর হৃদয়ের জটিল সম্পর্ককেও স্পর্শ করে দেখতে চেয়েছেন। প্রথমদিকের গল্পগুলি পড়তে পড়তে রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে। বাড়ির গৃহিণীর মায়ামমতা, বাৎসল্য প্রেম, পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের অন্বেষণ, সন্তানহীনতার দুঃখ, পালিতপুত্রের পরিণতি, জমিদারিত্ব না থাকলেও আভিজাত্যের মর্যাদা, গরিব ব্রাহ্মণের যজমানতার পেশা, নারীদের পুকুরঘাটে নানাকথা নিয়ে আলাপ-আলোচনা ইত্যাদি পুরনো দিনের কতকিছুরই না দেখা পাই। তবে পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপ হওয়া যুবক যুবতীর প্রেম ও ঘরপালিয়ে বিয়ের কথাও তিনি লিখতে ভোলেন না।

শিল্পের দিক দিয়ে গল্পগুলি মানোত্তীর্ণ কিনা সে বিচার করা বোধ হয় ঠিক হবে না। কারণ গল্পকার সে অর্থে শৈল্পিক সিদ্ধির পর্যায়ে তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে যেতে চাননি। তিনি শুধু নিয়তির পরিহাসে বেদনাঘন পারিবারিক জীবনের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেয়েছেন। মাঝে মাঝে লেখক নিজেও দার্শনিকের ভূমিকায় জীবনের নিষ্ঠুর পরিহাসকে বিচার করতে চেয়েছেন। এই জীবন ক্ষণিকের যা স্বপ্নমাত্র অথবা পদ্মপাতার টলোমলো করা জলবিন্দু। নিমেষেই তা উবে যেতে পারে এ বিষয়ে লেখক বারবার সচেতন করেছেন। তাই গল্পগুলি অপরিপক্ক এবং কাহিনিমাত্র হলেও তাতে এক মনস্বীলোকের পর্যবেক্ষণ আছে। এর বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারি না।

নবমী মহান্ত পৈতৃক পেশা বাউল গানকেই আঁকড়ে ধরে সংসারে সুখী হতে চেয়েছে। কিন্তু তার সন্তান না হওয়ায় পালিত সন্তান অনন্তকে আপন স্নেহের প্রতিমূর্তি করে তুলেছে। বাউল শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাকে নামডাক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সেই অনন্ত পালিত পিতা-মাতাকে বার্ধক্য অবস্থায় দারিদ্র্যের মধ্যে ত্যাগ করে কলকাতায় চলে গেছে। আর কোনো সম্পর্ক রাখেনি। বৃদ্ধ নবমী আবার তার পুরনো পেশাকে গ্রহণ করে জীর্ণ গলায় বাউলের সুর তুলে ভিক্ষা করেছে।

নলিনী ‘বিদায়ী সপ্তমী’ গল্পের নিয়তির বলি আর একটি চরিত্র। বিধবা মায়ের কন্যা। ধনী গোবিন্দলালের বাড়িতে কাজকর্ম করেই তার মা কুমুদিনী দিন পাঠ করতেন। দয়ালু গোবিন্দলাল যথাযথ সাহায্য করতেন। কিন্তু দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্যেই সপ্তমীর দিন কালাজ্বরে মৃত্যুবরণ করল। নলিনীর সাত বছরের ভাই ভবানীর কান্না এবং মা কুমুদিনীর পাগলিনী বেশ প্রতিবেশীদেরও অশ্রুসিক্ত করল। মর্মন্তুদ গল্পটি যেকোনো পাঠককেই স্পর্শ করবে।

‘মাধবীকঙ্কণ’ গল্পে ধনী উপেনদাস এর পুত্র পতিতপাবনের সঙ্গে দীন সতীপতির কন্যা মাধবীর বাল্যপ্রেম নিয়ে গ্রাম্যজীবনের কানাকানি গল্পটির মূল উপজীব্য। এসব কথা উপেনদাসের কানে গেলে সতীপতিকে ডেকে তাকে সাবধান করে দিলে তার জীবনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। পথিমধ্যেই তিনি মারা যান। পরবর্তী জীবনে নানা কষ্টের মধ্যেও মাধবী নিজেকে সংযত করে রাখে এবং শেষে মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটে।

‘ছায়াতরু’ গল্পটিতে লেখোকের ব্যক্তিজীবনের ছয়াপথ ঘটলেও ঘটতে পারে। কর্মজীবনের অবসান্তে যে নিঃসঙ্গতা এবং সন্তান-সন্ততির জন্য ভাবনা ও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্ত লড়াই তার পরিচয় পাওয়া যায়। গৃহকর্তা হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করা যে কত কঠিন তা আমরাও উপলব্ধি করতে পারি। ভগ্নিপতির অকাল মৃত্যুর শূন্যতা অতীত স্মৃতি চারণা কতটা ব্যথাতুর গল্পের নায়ক সুকান্ত আমাদেরও বুঝিয়ে দেন।

‘তিতিক্ষা’য় সুখেন বাবুর অধ্যাপকীয় জীবনে দাম্পত্য সুখ জোটেনি। ‘পূরবী’ নামে একটি গল্প লিখে পত্রিকার সম্পাদিকা পূরবী সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সম্পর্ক সুখেন বাবুর স্ত্রী পরমার বিচ্ছেদের কারণ হয়। নর-নারীর হৃদয়ের জটিল সম্পর্ক যে শিক্ষা ও বৈভবকেও দূরে সরিয়ে দেয় গল্পে তারই দেখা পাই।

‘পাড়ি’ গল্পে বাঁচার আকুতি নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে হেরে যায়। স্বামীহারা চাকুরিরতা সুদীপার মৃত্যু ঘটে ক্যান্সারে। ইহজীবন থেকে পর জীবনে পদার্পণে যে যন্ত্রণাময় পথ অতিক্রম করতে হয় তাকে তা অশ্রুসজল করে পাঠকদেরও।
‘পালাবদল’ গল্পে ফেসবুকে আলাপ হয় শিল্পীর সঙ্গে সঞ্জয়ের। ঘর পালিয়ে তারা বিয়েও করে। অন্যদিকে শিল্পীর ভাই ধীমানের সঙ্গেও একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু মেয়েটি তাকে ত্যাগ করে অন্যত্র বিয়ে করে। ধীমান অবশেষে বাবা-মার কাছে তার স্বীকারোক্তি দেয়।

প্রতিটি গল্পের মধ্যেই এক উপন্যাসের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বিস্তৃত পটভূমিকে লেখক যেন সংক্ষিপ্ত আকারে পরিবেশন করেছেন। অমোঘ নিয়তির নিষ্করুণ নির্দেশ গল্পগুলিতে ফুটে উঠেছে। লিখন রীতিতে সেই প্রাচীন গল্পকথনের পথটিই লেখক অবলম্বন করেছেন। তবুও গল্পগুলি জীবনের মানবীয় চেতনার গভীর ও চিরন্তন আবেগকেই তুলে এনেছে। যা কখনোই আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

# ৭ নুড়ি: অমিতাভ মুখোপাধ্যায়, সুপত্র প্রকাশন, পাণ্ডুয়া, হুগলি। দাম: ৫০ টাকা।

 

.

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *