মুক্তি

 215 total views

#মুক্তি
#শম্পা_সাহা

মুক্তিদি আমাদের বাড়ি রান্না করছে তা বহু বছর।কত বছর ঠিক বলতে পারবো না।কারণ বিয়ে হয়ে আসা থেকে বা বলা ভালো বিয়ের আগেও যে কবার এ বাড়িতে এসেছি মুক্তিদির হাসিমুখ আর সুস্বাদু রান্না কোনোটাই আমার বাদ যায় নি।

আসলে আমাদের বিয়েটা প্রেমের।তাই বিয়ের আগে থেকেই আমার এ বাড়িতে যাতায়াত।আমার কর্তা আবার চাকরি সূত্রে বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা।তাই মাঝে সাঝে আসলে তখন কাকিমা থুরি মায়ের ঘাড়ে চড়াও হতাম এক রকম মুক্তিদির হাতের রান্না খাবো বলেই।

প্রথম যেদিন উনি আমাকে মাকে দেখাতে এনেছিলেন, তখন মনে আছে মুক্তিদি একগাল হেসে বলেছিল,”ও মা!এ বুঝি টুবাইয়ের বৌ!”ব‍্যস,আমি তো মোটেই লজ্জা পাবার মেয়ে নই!যে মেয়ে বিয়ের আগেই শ্বশুরবাড়ির যায় শাশুড়িকে দেখা দিতে সে আর যাই হোক লজ্জাবতী লতা নয় মোটেই।

আমি প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেললাম, গোলগাল ফর্সা ছোটখাটো চেহারার মুক্তিদিকে।দিদির রান্নার হাতটাও ছিল তোফা!কোনোদিন মনে হয়নি লোকের বাড়ির রান্না করছে।সব সময় এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে রান্না করতো,মাঝে মাঝে আমিই বকা খেতাম মুক্তিদির কাছে।

মুক্তিদি কপালে গোল বড় একটা সিঁদুরের টিপ পড়তো।যেন সকালের সূর্য উঠেছে ।মজা করে সে কথা বললে,সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতের শাখা মাথায় ঠেকিয়ে বলতো,এ নিয়ে কি ঠাট্টা করে বৌমা?

হ‍্যাঁ, আমার শাশুড়ি মা আমাকে নাম ধরে ডাকলেও মুক্তিদির আমি ছিলাম বৌমা!আমি যতই আধুনিকা হই না কেন ,দিদির মুখের সেকেলে বৌমা ডাকটা লাগতো বেশ।

আসলে বিয়ের পর কর্তা তো আমাকে রেখে তার কাজের জায়গায়।আর শাশুড়ি মা বেশ রাশভারী।আধুনিকা,ভালো মানুষ কিন্তু সব সময় নিজের চারিপাশে এক গাম্ভীর্যের গন্ডি টেনে রাখতেন। আসলে শশুর মশাই মারা যাবার পর ছেলেকে একাই মানুষ করেছেন।তাই বোধহয় গাম্ভীর্যটা ওনার স্বতঃসিদ্ধ।

তাই আমার যত ভাব ওই মুক্তিদির সঙ্গে।দিদিও যেন নিজের বাড়ির কাজটুকু সেরে আমাদের বাড়ি আসতে পারলে বাঁচে।সক্কাল সক্কাল বর কে খাইয়ে কাজে পাঠিয়ে,ছেলের ইস্কুলের ভাত রেঁধে আমাদের বাড়ি আসতো।তারপর রান্নার ছলে আমাদের অসম বন্ধুত্ব চলতো আপন তালে।

দিদিকে কোনোদিন মনে হয়নি পর।সব সময় আমাকে কেমন আগলে আগলে রাখতেন।আর আমার যাবতীয় বিচ্ছিরি আবদারের রক্ষাকত্রী ছিল দিদিই।মাঝে মাঝে শাশুড়ি মা বোনের বাড়ি বা বাপের বাড়ি গেলে দিদি রাতেও থাকতো আমার কাছে।আর তখন বাঙাল বাড়ির মেয়ের সুঁটকি খাবার শখকে প্রশয় দেওয়া এবং শাশুড়িকে সে কথা বেমালুম চেপে যাওয়া।এ যেন দিদিই পারতো।

এমনকি বেখেয়ালে কাপ বা কাঁচের গ্লাস ভেঙে ফেললে মামনি মানে আমার শাশুড়ি মা যখন গম্ভীর গলায় ঠাকুর ঘর থেকে হাঁক পারতেন,”কি ভাঙলো রে মুক্তি?”,দিদি অবললীলায় বলে দিত,”ওই কাকিমা কাপটা আমার হাত লেগে পড়ে গেল”!ব‍্যস আমার ভাগের বকা সব মুক্তিদি হাসিমুখে শুনে যেত।আমার ভীষণ খারাপ লাগতো,ভাবতাম সত্যি টা বলে দিই ,কিন্তু দিদি বলতো,”যে বলে”!মানে বললে আমাদের বন্ধুত্ব শেষ।

এভাবে থাকতে থাকতেই কবে যেন আমাদের রান্নার দিদি আমার নিজের দিদি হয়ে গেছে।আমার কর্তা মানে মুক্তিদির টুবাই আসলে তো আর কথাই নেই, দিদি সদা ব‍্যস্ত কি রাঁধবে আর কি খাওয়াবে!এমনকি মেনুটাও দিদি নিজেই ফ্রিজ দেখে ঠিক করতো।বলা বাহুল্য অভিযোগের কোনো জায়গা কোনোদিন পাইনি।

আমার প্রেগন্যান্সি, আমার আতুর তোলা সবেই যেন মুক্তিদি সবার আগে।ওরই যেন সব দায়।ওই যেন আমার মা।আমার বর মানে সুশোভন কেও টাকা দেওয়া ছাড়া তেমন কিছু করতে হয়নি।এমনকি আমাকে বাপের বাড়ি পাঠাতে এ বাড়ির সবার আপত্তি ছিল।আসলে আমি গ্ৰামের মেয়ে।তাই যদি আমাদের গ্ৰামের বাড়িতে ভালো ডাক্তার টাক্তার না পাওয়া যায়!তাই ! এ বাড়িতে রাখার ব‍্যাপারেও দিদির উৎসাহই ছিল সবচেয়ে বেশি!

মামনি যখন বললেন,”আমি বাবা ওসব পারবো না”,তখন দিদিই এগিয়ে এসেছিল,”ও তুমি কিচ্ছু ভেবো না সব আমি করে দেবো!আমার দুই বোনের আতুর তো আমিই তুলেছি”!ব‍্যস রয়ে গেলাম এ বাড়িতে।

আমার বাবানকে নার্সিং হোম থেকে নিয়ে বাড়ি আসা থেকে বাবানের একুশ বছর বয়স পর্যন্ত মা ,ঠাম্মি আর মুক্তি পি এই তিনজনই ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।নিজের মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবার পর মুক্তিদির ছেলের ঘরেও বৌ এলো।দিদির বর মারা গেল। দিদি বিধবা হলে বলেছিলাম,”দিদি,তুমি আমাদের বাড়ি এসে থাকোনা কেন?”জানতাম বৌমার সঙ্গে দিদির খুব একটা বনিবনা হয় না।তবু দিদি আসেনি।বলতো,”না গো বৌমা, তাহলে ছোট বাচ্চা নিয়ে আমার বৌমা সামলাতে পারবে না”!

অবাক হতাম একজন মানুষের মধ্যে সবার জন্য এত যত্ন ,এত ভালোবাসা, এত মায়া আসে কি করে?যে বৌমা এক বেলা খেতে দিতে চায় না দিদির তার জন‍্য ও এত টান!দিদি অবশ্য বলতো,”রক্তের টান!”কিন্তু আমি বুঝতাম ভালোবাসা টা আসলে দিদির স্বভাব।কারণ আমরাতো দিদির রক্তের সম্পর্কের কেউ নই,মাস গেলে সামান্য কটা টাকা!ওই দিয়ে কি এতখানি ভালোবাসা পাওয়া যায় ? আসলে ভালোবাসা তো কেনা যায় না!যে পায় সে তার ভাগ‍্যগুণে পায় আর যে দেয় সে তার স্বভাবগুণে দেয়!এতো ঝড় ঝাপটা ,সুখে দুঃখে আমাদের যেন বাড়ির মেয়েই হয়ে উঠেছিল মুক্তিদি।

মামনি তখন ঠাকুর ঘরে,বাবান কলেজে যাবে,আমি ওর খাবার রেডি করে দিচ্ছি,মনটা বেশ খুশি খুশি ,কর্তা আজ বাড়ি আসবেন।হঠাৎ দিদি রান্না ঘর থেকে বেরোতে গেল,বাবানের জন‍্য মাছভাজাটা প্লেটে নিয়ে।বেরোতে গিয়ে চোখের সামনে দেখলাম হঠাৎই পড়েগেল মাটিতে।হাতের প্লেট ছিটকে মেঝেতে।

আমি দৌড়ে ধরে তুলতে গেলাম,জল টল ছিল বোধহয় ,পা পিছলে গেছে!কাছে গিয়ে দেখি চোখ বোজা,”দিদি,দিদি ও মুক্তিদি ,মুক্তিদি..”আমি ডেকেই চলেছি!বাবান তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে বোতল থেকে চোখেমুখে জল ছিটাতে লাগলো,মামনি দৌড়ে এলো ঠাকুর ঘর থেকে!কিন্তু না ,মুক্তিদি আর চোখ খোলেনি!

মুক্তিদি তার ছেলেকে আর ছেলের বৌকে মুক্তি দিয়ে গেল মায়ের ঝামেলা বইবার হাত থেকে, আর আমাদের মুক্তি দিয়ে গেল এক বিনি সুতোয় বাঁধা সম্পর্কের হাত থেকে যে মুক্তি আমরা কোনোদিন কোনোদিন চাইনি।

এই রকম বহু মুক্তিদি এই পৃথিবীর আনাচেকানাচে পরকে ভালোবেসে আপন করে নিজেকে উজাড় করে দেয়।তারা।নিজের ছেলের পাতে সেদ্ধ ভাত দিয়েও দিনের পর দিন অন‍্যের ছেলের জন‍্য ভালোমন্দ রেঁধে সামনে ধরতে পারে ভালোবেসে পরম মমতায়।এই সম্পর্ক গুলোর থেকে আমরা মুক্তি চাইনা ,বরং বাঁধা পড়তে চাই এই সম্পর্ক গুলোতে আজীবন!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *