মুক্ত গদ্য – সিলিকন ভ্যালি – শম্পা সাহা

“স্যার আমার কাল একটু অসুবিধা আছে তাই আসতে পারবো না”
“না, না, মিসেস সেন, এই উইকে একদম ছুটি দেওয়া যাবে না”
“স্যার, প্লিজ, উউ….  ওরকম করবেন না? আমার সত্যি ই ভীইইইইইইষণ দরকার। প্লিইইইইইইজ স্যার। “
মিসেস সেন একটু নীচু হয়ে কনুই দুটো টেবিলে রেখে একটু ঝুঁকে পড়লেন অনুরোধের ভঙ্গিতে, ওনার কামিজের গলার কাছের ভি কাট টা আর একটু নেমে গেলো, ধবধবে ফর্সা সিলিকন ভ্যালির কিছুটা দৃশ্যমান ক্লিভেজ সহ। 
ভীষণ অস্বস্তিতে বস, মিঃ রায়। বছর পঞ্চান্নর রায় মশাই, একেবারে গোবেচারা, ভালোমানুষ। এ সব দৃশ্যমান সৌন্দর্য তিনি মোটেই উপভোগ করছেন না, উল্টে অস্বস্তিতে ঘামতে লাগলেন। এ সময় কেউ যদি এসে পড়ে আর মান সম্মান থাকবে না অফিসে। 
মিসেস সেন কে সবাই জানে, আর কারো কথাতেই যে ওনার কিছু যায় আসে না তাও জানে। কিন্তু মিঃ রায় এর লোকের কথায় যায় আসে, ভীষণ যায় আসে। উনি বিষয়টা এড়াতে চান। 
হঠাৎই মিসেস সেনের সারা শরীর কেঁপে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে কামিজের ভেতর থেকে বাজতে থাকা ফোনটা সম্পূর্ণ হাত ঢুকিয়ে বের করে কেটে দিলেন। ব্যাপার স্যাপার দেখে রায় বাবু হতবাক না জানি আর কি কি দেখতে হবে,অবশ্য তার  আগেই আবার মিষ্টি কন্ঠ, 
“স্যার, তাহলে কাল ছুটিটা? “
“আচ্ছা, আচ্ছা, কাল আপনাকে আসতে হবে না। কিন্তু পরশু অবশ্যই আসবেন। কতগুলো রিপোর্ট জমা করতে হবে”, 
ততক্ষণে মিসেস সেন ঘর ছেড়ে বেশ খানিকটা দূরে। বছর আটচল্লিশের খুকী, মিসেস সেন মানে পামেলা সেন এই অফিসে বেশ জনপ্রিয়। এতো মিষ্টি কথা, যেমন মিষ্টি ব্যবহার তেমন চেহারা। 
দেখেই বোঝা যায় এক সময় ইমারত বেশ সুন্দর ছিল! এখনো চার ফুটের গোল আলু মার্কা চেহারা নিয়ে ও নিজেকে ষোল মনে করেন এবং এ ব্যাপারে বেশ কনফিডেন্ট। দিব্যি এভাবে ওনার মেডিকেল লিভ স্যাংকশন হয়ে যায়, যখন তখন ছুটি, কাজ না করেই বেশ একটু আদুরে ভাব। কিন্তু ওনার জন্য সব ঠিকঠাক। 
স্কুলে পরীক্ষা চলছে, সবার স্কুলে আসা বাধ্যতামূলক। সায়ন্তিকা প্রেগন্যান্ট, কিন্তু মাত্র মাস পাঁচেক, কোনো কমপ্লিকেশন নেই কিন্তু ওর খাতা দেখতে ভালো লাগছে না। চলে গেলেন হেডস্যারের গায়ের কাছে,, 
“স্যার, এবার খাতা না দিলেই নয়!  আমার বসতে উঠতে কষ্ট হচ্ছে! “
“না, না, ম্যাম, খাতা আপনাকে কম দেওয়া হয়েছে”, হেড স্যার যথেষ্ট সম্ভ্রম রেখেই বললেন। 
” স্যার, না দিলে হয় না? “, 
স্ফীত গর্ভ প্রায় স্যারের গা ঘেঁষে। বিরক্ত হয়ে মাস্টার মশাই অস্বস্থি এড়াতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। 
” আপনি এখন আসুন, আর তেমন অসুবিধা হলে একটা অ্যাপ্লিকেশন করে ছুটি নিয়ে নিন”! 
রাগে ফুঁসতে  ফুঁসতে সায়ন্তিকা এসে দাঁড়ালো যেখানে চার পাঁচজন স্যার বসে কাজ করছেন। স্ফীত গর্ভ টেবিলের উপর যেন রাখলো এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নালিশ জানালো হেড স্যারের বিরুদ্ধে। 
স্যারেরা দলবেঁধে চললেন, হেডস্যার কে সায়ন্তিকার হয়ে বলতে, এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। “ও প্রেগন্যান্ট, ও কেন খাতা দেখবে? “
কারো মনে পড়লো না যে দুদিন আগেই অন্য এক দিদিমণি, “সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়”, বলায় এরাই নিদান দিয়েছিলেন, “ছুটি নিতে”, তখন সে প্রায় সাত আট মাসের গর্ভবতী। 
সহকর্মীদের চাপের মুখে হেডস্যার বাধ্য হলেন খাতা ক্যানসেল করতে এবং ওই দিদিমণির নেওয়া সব ক্লাস নেমে এলো এক তলায়। 
অফিসে এসেই বিথীর ঘুম পায়। ঘুম পায় তো কি করবেন? সে উনি ঘুমিয়েও পড়েন, ফাইল জমতে জমতে পাহাড়। 
না এসে ভুল করে অ্যাবসেন্ট এর দিন সাইন করেন, রাম বাবুর ইমেইল শ্যাম বাবুকে পাঠিয়ে দেন। ফাইল কমপ্লিট করতে ভুলে যান প্রায়ই। অফিস ছুটির প্রায় আধ ঘন্টা আগেই বেরোন রোজ! 
যে দোষে  অন্যদের চাকরি প্রায় চলে যেতে পারে, সে দোষে উনি পান ওয়ার্নিং আর ওনার বুকের আঁচল বা ওড়ণা  সময় মতো স্লিপ করে। 
মাঝে মাঝে ঘাড় বেঁকিয়ে চোখ ছলছল ও করেন, ব্যাস! সাত গুণ মাফ! 
সারা জীবন আমরা পুরুষদের দোষারোপ করেছি, আজ ও করি! কিন্তু এদের কে কি আমরা একজন কেও আমাদের চারিপাশে দেখি না? 
যারা নিজের লাস্য, শরীরী বিভঙ্গ, সিলিকন ভ্যালির মসৃণতা কে ক্যাশ করেন। পুরুষদের কাঠগড়ায় তুললে কিন্তু এদের ও তুলতে হবে, তুলতে হবেই। নইলে সমানাধিকার কথাটা হাস্যকর শোনাবে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top