মুড়িয়ালী – শম্পা সাহা

বদমায়েশিতে যে আমি একনম্বর সে তো স্বীকার করি দুহাজার বার। কিন্তু সেই সময় দুষ্টুমির ছলে কখনো কখনো অন্যায় ও করে ফেলতাম। তখন অবশ্য এতো কিছু মনে হতো না, তাহলে তো করতামই না, কিন্তু এখন মনে হয়।

সেই সময় মহালয়া, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবসে খুব ফিস্টের চল ছিল, আমরা বলতাম ফিস্টি।ডিম ভাত ই বেশি, মাঝে মাঝে মাংস ভাত, মানে ঐ মুরগির মাংস। তখন বোধহয় তিরিশ টাকা কেজি টেজি হবে। সে ফিস্টি তে আমাদের পালের গোদা ছিল বড়কা দা।

তখনো কোলকাতা এতো আমার আমার, তোমার তোমার হয়ে যায় নি। বরকা দা আমাদের ঐ ভাড়াটে বাড়ির যত উঠতি বয়সের মেয়ে, তা প্রায় গোটা আটেক তো হবেই তাদের পাড়াতুতো গার্জিয়ান বড়কা দা। সে রাত জেগে, হোল নাইট ঠাকুর দেখা হোক বা পাড়ার ভাসানে ট্যাম্পো করে বাবুঘাটে যাওয়া ই হোক। এক, দুই, তিন করে বড়কা দা গুনে গুনে তুলতো গাড়ি তে, আবার বাড়ি পৌঁছে যার যার ঘরে।

ঠাকুর দেখতে গেলেও সেই বড়কা দা গোনা গুনতি করে মেয়ে ব্যটেলিয়ন নিয়ে রওনা দিতো। তার সময়ের নড়চড় হবার উপায় নেই। দেখা গেলো টুনটু পিসি কানের দুলের গুঁজি গুঁজতে গুঁজতে চেচাচ্ছে, ” বড়কা একটু দাঁড়া”, মমতা দি শেষ পাউডার টা বুলিয়ে নিচ্ছে কুটুদির চোখ আয়না করে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয়। বেবী দি হয়তো শাড়ির প্লিট তখনো হাত দিয়ে টানটান করেই যাচ্ছে। ব্যস, চলল ঠাকুর দেখার গ্রুপ।

আমাদের মহালয়ার ফিস্টি তেও বড়কা দা হেড। প্রত্যেকে দশ টাকা ভাগে। তখন অবশ্য একটু বড় ঐ নাইন টাইন হবে। সেও কি সহজে পাওয়া যায়, ঘরে রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করে সে টাকা আদায় করে ফিস্টি। বক্স বাজছে তারস্বরে সারা রাত পাড়ার লোকের ঘুমের সাড়ে সর্বনাশ করে, “পিয়া তু অব তো আযা…. “,

রান্না হতে ঢের দেরি, যার যার বাড়িতে রাতের খাওয়া শেষ করে তবে তো ফিস্টি তে এসেছি, অতো তাড়া কিসে? এদিকে আমাদের চুনোপুঁটী দের কাজ নেই, তাবলে চুপ করে ভালোমানুষ সেজে বসে থাকবো ওটি হচ্ছে না। সামনের পুকুর থেকে গুচ্ছের পানা তুলে মুড়িয়ালী বুড়ির বারান্দায়। কেন যে বেছে বেছে ওখানেই দিতাম জানি না। তবে বুড়ি আগে মুড়ি ভেজে বেচতো তাই ঐ নাম। আর ওনার বাচ্চা কাচ্চা ছিল না, সে জন্য কিনা জানি না, তবে বাচ্চা দেখলেই তেড়ে গাল পড়তেন, “পোড়ার মুখো, ওলাউঠো, নির্বংশ”, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই জন্য ই হয়তো উনিই তাক। সকালে উঠে যা গাল দেবেন ঝাঁটা নিয়ে তেড়ে তেড়ে, ভাবলেই হেসে গড়িয়ে পড়তাম। আর হতো ও তাই।

তার পর যে সব বড়লোক বাড়িতে কলিংবেল ছিল, কারণ সালটা 1990-95,তখন কলিং বেল নৈব নৈব চ, সব বাজাতাম, সারা রাত। এই চূড়ান্ত অসভ্যতা চলতো যতক্ষণ না রান্না হতো ততক্ষণ।

তখন ভাবতাম, মজা, এখন ভাবি ভীষণ অন্যায় করেছি, কিন্তু এখন তো আর তারা কেউ নেই। থাকলে নিশ্চয়ই ক্ষমা চাইতাম। যাক গে, তাদের হয়ে না হয় আপনারাই ক্ষমা করে দিন।

shampa-saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top