মেধাস্বত্ব অধিকার – সৌম্য ঘোষ

 

[printfriendly]

 

[post-views]

 

 

[smbtoolbar]

 

সাহিত্য যে নেশার পাশাপাশি একটা অর্থকরী পেশা হতে পারে, এটা দু-একজন ভাগ্যবান কবি-সাহিত্যিক ছাড়া অন্যরা ভাবতেই পারেননি। অন্য একটি পেশার পাশে সাহিত্যচর্চা তাদের কাছে একটি সৌখিন নান্দনিকতা বিশেষ, যা অর্থমূল্যহীন, কিন্তু সমাজে কদর বাড়াতে সক্ষম। ফলে, তাদের সাহিত্যচর্চায় পেশাদারিত্ব সূচিত হয়নি। একটি কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস লিখে তারা তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। তারপর তা প্রকাশককে বিনাশর্তে বিনাচুক্তিতে প্রকাশ করতে দিয়ে নিজেই ধন্য হন।

অধিকাংশ প্রকাশকও এই সুযোগ নিয়ে খুশি। ব্যতিক্রম শুধু সেই সব লেখক, যাদের কাছে নানাবিধ প্রতাপের কারণে প্রকাশকরা দায়বদ্ধ। বিদেশবাসী, দেশীধনী থেকে শুরু করে প্রতাপশালী আমলারা এই গোত্রভুক্ত। ফলে না রচনায়, না প্রকাশনায় পেশাদারিত্ব সূচিত হচ্ছে বা বিকশিত হচ্ছে।

প্রকাশকরা গুটিকয়েক জনপ্রিয় লেখক, বিদেশি চালু বইয়ের অনুমোদিত-বা-অননুমোদিত সংস্করণ/ মুদ্রণ কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের সহায়ক চালু গ্রন্থাদি ছেপেই তুষ্ট ও লাভবান। সৃজনশীল প্রকাশকদের অনেকেই বইয়ের জন্যে ব্যাংকঋণ নিয়ে কিছু বই ছেপে বাকিটা অধিকতর লাভজনক কোনো ব্যবসায় লগ্নী করতে তৎপর। ফলে সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক থাকলেও পেশাদারিত্ব নেই।

এর মূল কারণ প্রকাশক নয়; লেখক, যিনি তার সৃষ্টিসত্তার বহু মাত্রিক মূল্য সম্পর্কে অসচেতন। নিজের সৃষ্টির রচনাগত, নীতিগত, সংহতিগত, নন্দনগত ও বাণিজ্যগত মালিকানা যে তার, এই বোধ আমাদের প্রায় ৯০% সাহিত্যস্রষ্টার বোধগম্য নয়। তার সৃষ্টিশীল রচনাটি যে সৃষ্টিপণ্য বা শিল্পপণ্য বা নন্দনপণ্য হতে পারে, তা তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাবতে পারেন কিনা সন্দেহ।

ফলে একটি সমাজে মেধাস্বত্ব বিষয়ক ধারণার জন্যে যে প্রাথমিক সচেতনতা প্রয়োজন, তা আমাদের স্বাক্ষর সমাজেও প্রায় অনুপস্থিত। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে আমাদের সমাজে জ্ঞানের নবায়ন যেমন হবে না, তেমনি অর্থকরী সফলতাও বিঘ্নিত হবে।

 

আরো একটি কথা প্রণিধানযোগ্য। সাহিত্যস্রষ্টাদের ক্ষেত্রে তাদের সৃষ্টকর্মের মালিকানা, তাদের নৈতিক ও আর্থিক পরিপ্রেক্ষিতটাই প্রথম বিবেচনা নয়, বরং মুখ্য বিবেচনা হচ্ছে রচনাটি মৌলিকতার বিচারে তার সৃষ্টি কিনা। একজন লেখক অন্যের রচনা সচেতন বা অচেতনভাবে অনুকরণ করেই এই পাইরেসি তাস্কর্য করতে পারেন। অনুবাদ বা অনুসরণের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো ভয়ঙ্কর।

পাবলিক ডোমেন বা মেধাস্বত্বহীন সৃষ্টি নিয়ে কোনো তর্ক নেই। কিন্তু মেধাস্বত্বাধীন রচনার ক্ষেত্রে মূল লেখকের বা প্রকাশকের বা মেধাস্বত্বের অধিকারীর অনুমতি ছাড়া অনুবাদ গোঁড়াতেই পাইরেসির নামান্তর।  এই তাস্কর্য চলছে অবিরাম। এই দায় মূলত সংশ্লিষ্ট লেখক বা অনুবাদক বা অভিযোজনকারী বা অন্যরূপ সাহিত্যস্রষ্টার।

জমি বা হীরের মুকুট যেমন একটি সম্পদ, তেমনি নিজের বোধ-বুদ্ধি-কল্পনা-মেধাও সমান মূল্যবান সম্পদ। এই চেতনাই একজন মৌলিক ও সদাচারী সাহিত্যস্রষ্টার মেধাস্বত্ব বিষয়ক আসল সচেতনতা। প্রথমটি বিচ্ছেদ্য হলেও দ্বিতীয়টি শতভাগ অচ্ছেদ্য। জমি বা হীরের মুকুট অন্যকে প্রদান করা যায় বা বিক্রি করা যায়, কিন্তু নিজের সৃষ্টিশীলতা নিকটতম পুত্রকন্যাকেও হস্তান্তর করা যায় না।

এই বোধ একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজে সঞ্চারিত হওয়ার কথা নয়। জাপান ও অন্যান্য উন্নত দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে শৈশবের পাঠ্য পুস্তকেই এই সত্যটি নীতিবাক্য হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের মেধাবী শিশুসাহিত্যিকরা এই নিয়ে গল্প-কবিতা-ছড়া লিখতে পারেন।

তবে তার আগে তাকে কপিরাইট আইনের পাঠ নিতে হবে। কপিরাইট আইন নিজের নিত্যনৈমিত্তিক পাঠ্যবস্তু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আর এর সুযোগ করে দিতে হবে কপিরাইট অফিস বা বাংলা একাডেমি বা লেখক সংগঠন বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা অনুরূপ কোনো উপযুক্ত সংস্থাকে।

সারা বৎসর পর্যায়ক্রমে কপিরাইট বিষয়ক সেমিনার বা আলোচনা-চক্র চালু রাখতে হবে সকল বয়সী লেখকদের মধ্যে। এই বোধ সঞ্চারিত করতে হবে যে মেধাস্বত্বহীন সৃষ্টি যেমন বৈধ সৃষ্টি নয়, তেমনি মেধাস্বত্ববোধহীন রচয়িতাও বৈধস্রষ্টা নয়।

এই বোধ লেখককে মর্যাদা দান, আত্মসম্মানসম্পন্ন ও স্বাবলম্বী করে তুলবে। লেখক তখন নিজের মৌলিক সৃষ্টিকে নান্দনিক সৃষ্টি থেকে শুরু করে ব্যবসাসফল পণ্য হিসেবেও বিবেচনা করতে শিখবেন।

তখন সংশ্লিষ্ট লেখকের লেখায় পেশাদারিত্ব আসবে।

তাত্ত্বিকভাবে দেশে-বিদেশে মেধাস্বত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে তিনিটি পর্যায়কেই মুখ্য মনে করা হয়:
( ১.) যথাযথ আইন ,
(২.) যথাযথ আইনী প্রতিষ্ঠান ,ও

(৩.) আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

আমাদের দেশে তিনটিই আছে, কিন্তু ‘যথাযথ’ কিনা বিবেচ্য। আইন তখনি যথাযথ হয়, যখন তা সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত ও সময়ানুগ হয়। প্রতিষ্ঠান বা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে নি:সন্দেহে। কিন্তু যা সর্বাধিক প্রয়োজন তা হলো আমাদের সাহিত্যস্রষ্টা, প্রকাশক, বিক্রেতা, ক্রেতা ও পাঠকপাঠিকার মধ্যে মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সহজ সরল বোধগম্য ধারণা ও সচেতনতা। আমরা তিনটি পর্যায়ের পূর্ব-স্তরে অর্থাৎ এই প্রারম্ভিক সচেতনতার মধ্যেই আছি।

তাই বলবো, মেধাস্বত্ববান জাতি মানে সমাজের সব মানুষের মাঝে মেধাস্বত্বের সহজপাঠের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তার। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বমানুষ যদি মেধাস্বত্ব নিয়ে সৃষ্টিশীল হতে থাকে, আমরা কি পিছিয়ে পড়বো? না,  আমরাও এগিয়ে যাবো।।

সৌম্য ঘোষ

লেখক :—  অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ । চুঁচুড়া। হুগলী ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top