রাগ

#রাগ
#শম্পা_সাহা

হঠাৎই বৃষ্টিটা ঝুপ করে নেমে গেল।বুঝতেই পারিনি এভাবে নাকাল হতে হবে।

আমার বরাবরের অভ‍্যেস শনি রবিবার, মানে যে যে শনিবার ছুটি পাই,ব‍্যাঙ্কের হিসাব মত সেকেন্ড আর ফোর্থ,আর রবিবার বাঁধা।সকাল এগারোটার মধ‍্যে খেয়ে দেয়ে বেড়িয়ে পড়ি।কোনোদিন কলেজ স্ট্রীট ,এলোমেলো ঘুরে ,বই কিনে সেটি হাতে নিয়ে বসি কফি হাউসের একেবারে বাঁদিকের শেষের টেবিলটায়।ফ‍্যান নেই তাই ওই টেবিলে কেউ বসতে চায় না।আমার দখলে থাকে গোটা টেবিল সারা দুপুর,সন্ধ্যা।

কোল্ড কফি আর চিকেন স‍্যান্ড উইচ নিয়ে কাটিয়ে দিই ঘন্টার পর ঘন্টা।প্রথম প্রথম আসতাম স্বাগতাকে খুঁজতে।কবে যেন খোঁজ টাই নেশা হয়ে গেল!

কোনো কোনোদিন আবার গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি কোলাঘাটের দিকে।সংসার আমায় বাঁধতে পারেনি কারণ স্বাগতাকে আমি বাঁধতে পারিনি।তাই অফিস ছাড়া ছুটির দিনে বাড়িতে আমার দম আটকে আসে।মা আগে বিয়ের কথা বলতো।স্বাগতাকে রাগের বশে অনেক খারাপ কথাও বলতো,আমি প্রতিবাদ করিনি।কারণ আমি কষ্ট পেলে প্রতিবাদ করতে পারিনা।মা ভাবতো আমিও বোধহয় মায়ের মতোই স্বাগতাকে ঘেণ্ণা করি তাই মা যখন ওর নামে আবোলতাবোল বলে যেত আমি চুপ ।কারণ মা আমার চোখ পড়তে পারে না।

স্বাগতা পারতো ।ও ঠিক আমার তাকানো দেখেই বুঝে যেত আমার দুঃখ,কষ্ট,যন্ত্রনা, সব সব।বলতো আমার চোখ নাকি সব বলে দেয়।ও পড়তে পারে।কিন্তু কই মা তো পারে না।তাই মা ওকে খারাপ কথা বললে আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়।

প্রথম যখন স্বাগতা আমাদের সাত বছরের সম্পর্ক ভেঙে হঠাৎ বিয়ে করে নিল,সবাই অবাক।কিন্তু আমি অবাক হইনি,আমি যে ওকে চিনি।আমাকে কষ্ট দিতে গিয়ে পাগলীটা নিজেকে এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি কষ্ট দেবে।কিন্তু ওর অভিমান যে ভারী।বিশেষ করে আমার ওপর।

সেই কোন ছোট থেকে আমি আর স্বাগতা বন্ধু।সে বন্ধুত্ব কবে যেন নির্ভরশীলতা থেকে প্রেমে পৌঁছলো আমরা কেউই বুঝিনি।আমার আবার বড্ড মেজাজ।রেগে গেলে যাচ্ছেতাই বলতাম।আর ছিল অধিকার বোধ।

ছেলেরা বুঝি এমনি হয়?তাই কোনো ছেলের সঙ্গে ওকে কথা বলতে দেখলেই মাথায় রক্ত চড়ে যেত।আচ্ছা বলুন তো,যাকে ভালোবাসি তাকে কি হারাবার ভয় থাকবে না?সেই ভয়ে আমি কাঁটা হয়ে থাকতাম।

আর ও ছিল জেদি,গোঁয়ার, এক রোখা।আসলে আমরা ছিলাম একে অপরের জেরক্স কপি।ও যেভাবে ভাবতো আমিও ঠিক একই ভাবে।তাই তো ওকে মেলামেশা নিয়ে কিছু বললে ওর সাফ কথা,”কেন,আমাকে বিশ্বাস করিস না?” একবার রাগে বলে বসলাম,”না,করি না!” ব‍্যস!ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল।যাবার সময় বলে গেল,”যে সম্পর্কে বিশ্বাস নেই, সে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই!”

মাত্র ছয় মাসের মধ‍্যে ওর কোথায় যেন একটা বিয়ে হয়ে গেল।আন্দামান না কোথায়।তারপর থেকেই আমি এভাবে ওকে খুঁজি!কফি হাউসের কোল্ড কফি ওর প্রিয়,জয় গোস্বামীর “পাগলী তোমার সঙ্গে” ওর প্রিয়।তাই আজও ওকে আমি ওকে খুঁজে বেরাই আমাদের সেই হেঁটে চলা রাস্তায়, সেই পার্কে,সেই বইয়ের পাতায়।

জানি পাবো না কোনোদিন!তবু যদি একবার দেখা পাই!না না ,বিশ্বাস করুন পেতে চাইবো না।কারণ নতুন করে চাইবো কি? ও তো আমার মধ‍্যেই আছে।এক সঙ্গে থাকলেই বুঝি পাওয়া হয়? ভুল।দূরে থাকলেও মনে মনে তো আমরা একসাথেই থাকি!

তাইতো এই বৃষ্টি মাথায় হাঁটছি।কলেজস্ট্রিটের বইয়ের দোকান দুপাশে রেখে ভিজছি আমরা।আমার পাশে স্বাগতাও আছে,যদিও কেউ ওকে দেখতে পায় না।তবু ভয় ,ওর যদি ঠান্ডা লেগে যায়!ওর যে অসময়ের বৃষ্টিতে ঠান্ডা লাগে।কিন্তু আসলে তো স্বাগতা নেই।সত‍্যি রক্ত মাংসের স্বাগতা যে দূরে অনেকেই দূরে।আমার নাগালের বাইরে!

তাহলে কেন খুঁজছি?ক্ষমা চাইবো বলে,বলবো,”রাগ করিস না সোনা, আমার ভুল হয়ে গেছে।আমি আর কক্ষণো তোকে সন্দেহ করবো না!”তাতে যদি পাগলীটার রাগ পড়ে!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top