রাতের গভীরে

রাতের গভীরে
– শোয়েব ইবনে শাহীন (মনস্বতাত্ত্বিক)

আমি হাঁটছি রাতের নিস্তব্ধতা অতিক্রম করে। মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাস কখনো কখনো কাঁপিয়ে তুলছে আমাকে।
কখনো বা কোন অজানা কিছু আমাকে শিউরে তুলছে। যা আমি জানি না, কী হতে পারে।
আমি শুধু জানি, আমি কেবল হাঁটছি। এর চেয়ে বেশি কিছু জানার আগ্রহ থাকলেও- সেই নিষিদ্ধ বিষয়টা আমাকে প্রায় বাধ্য করে তোলে পদযাত্রা অব্যাহত রাখতে।
রাতেল শীতল বাতাস ও কুয়াশা, অচিন্তনীয় নীরবতা আর আধো আলো-আঁধার আমাকে যেন বলছে ফিরে যেতে।
কিন’ কোথায় যাব আমি। আমার যে ফিরে যাবার উপায় নেই ! কে আমাকে বুঝবে ? কেউ কি আছে এ পৃথিবীতে তা বোঝার ?
অন্তত তা বুঝতে চাওয়ার ? হয়তো আছে, আমি সে খবর রাখি না। সেজন্য ফিরে যাই না আমি পথ থেকে। প্রতিটি প্রাণী আপন কাঙ্খিত লক্ষেই থাকে, প্রকৃতপক্ষে। হতে পারে কোন এক সময়ে মানুষ সত্যিই মানুষ এর জন্য ছিল, কিন’ বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই জিনিসটি খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। এখন আমাদের মত অনেকেই ধরতে গেলে দেশের অধিকাংশ নাগরিকই বিশ্বাস করে না, মানুষ মানুষের জন্য। সত্যিই কি মানুষ মানুষের জন্য ? কে জানে ! তবুও, কথাটা রয়ে গেছে। যা কিছু পতিত হওয়া মানুষকে অর্থহীন আশা দেয়। যার কোন মূল্য নেই। পৃথিবী সত্যিই পাল্টে গেছে, যাবে এবং …যাচ্ছে। মানুষ নিজেই নিজের মৃত্যুঘর বানাচ্ছে। কারণ, মানুষ মিথ্যা স্বপ্ন-পূরণের জন্য লোভী হয়ে উঠেছে, যা তাকে বোধশক্তিহীন করে তুলেছে। আর বোধশক্তিহীন কি পশুরাই নয় ? যার মাঝে মানবতা নেই, বরং আছে উদাসীনতা। যার মাঝে ভালবাসা নেই, আছে নিষ্ঠুরতা। যার মাঝে ভালো-মন্দের গুরুত্ব ও পার্থক্য বোঝার সামর্থ্য নেই বরং আছে অচিন্তনীয় লোভ। আর আছে ক্ষুধা। যে ক্ষুধা মিথ্যা সম্পদের, তাকে কি পশু বলা যায় না ? তবুও তাদের বেঁচে থাকার অর্থ আছে। কেননা তাদের পয়সা-সম্পত্তি আছে। খাওয়া পরার তো কোন চিন্তাই নেই। তারা কোনদিন অভুক্ত থাকে না…..সত্যিকার অভাবটা যে আসলে কি তা তারা কোনদিন বুঝতে পারে না। তদুপরি তাদের লোভ আছে। এটাই ওদের বেঁচে থাকার অর্থ। আর আমার ? আমার কি বাঁচার সত্যি কোন অর্থ বা প্রয়োজন আছে ? মনে হয় নেই। তারপরেও কেন বেঁচে আছি আমি। উত্তরটা খুব হাস্যকর ও আত্মবিরোধী-বেঁচে থাকতে হয় বলেই বেঁচে আছি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা খুব সহজসাধ্য ব্যাপার না। আমি এটা ভালকরেই জানি। আমি মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম….যার ফলাফলে সেই অভিজ্ঞতা আমাকে এখন বেঁচে থাকার জন্য বাঁচিয়ে রাখে। যারা মৃত্যুকে প্রায় চুমো দিয়েই ফেলে তারপরে ফিরে আসে, তারা মৃত্যুকে পরবর্তীতে খুব ভালবাসে। জীবনের কোন পরোয়া থাকে না তাদের। আর অনেকে খুব ভয় করতে থাকে মৃত্যুকে। তবে বাস্তব জীবনের অংক অন্যরকম। আমি বলবো, আমি বাস্তবতা জানি, সত্যি পরিপূর্ণ ভাবে কি-না এটা জানা নেই। কিন’ নিজেকে বাস্তবমুখী বলেই সুস্পষ্ট ধারণা হয়। কারণ- কিছু মিথ্যা অবলম্বনের প্রভাব আমাকে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছে ভুল কোন পথের দিকে। একাকীত্ব ধীরলয়ে আমার অনুভূতি ঘোলা করে দিয়েছে। বিষন্নতা আমাকে চূর্ণ করে ফেলেছে। অসহায়ত্ব আমাকে কঠোরতার দিকে ধাবিত করেছে। আর পৃথিবীর শুভেচ্ছা ! সেটাতো আমাকে পশু বানিয়ে ফেলেছে। যার কোন অনুভূতি কাজ করেনা, যার মানবিগ আবেগ ভোঁতা হয়ে হারিয়ে গেছে তাকে আর তখন মানুষ বলাটা শোভা পায় না। আমার এখনো চোখের সামনে প্রায়ই ভেসে ওঠে ঐ ঘটনাগুলি…আমাদের পরিবার, আমার বাবার মৃত্যু, সীমাহীন কষ্ট-অভাব, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ! সবকিছুকে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েছিলাম আমরা।

প্রায় আট বছর আগের ঘটনা। আমার বয়স তখন তেরো-চৌদ্দ হবে। আমার বাবা একজন দরিদ্র রিক্সা চালক। একটা জীর্ণ কুটির, একটা রিক্সা আর অতি স্বল্প জমি ছিল আমাদের সম্বল। পরিবারের মোট পাঁচজন সদস্য, বাবা-মা, আমি এভং আমার ছোট দুই ভাই। স্বাভাবিকভাবেই, সমাজের সিংহভাগ মানুষের চেয়ে নীচুস্তরের হেয় ও দৃষ্টিপূর্ণ ছিলাম আমরা। অনেক অনেক নীম্নবিত্ত। কাজেই আবদার করা বা কিছু আশা করা ছিল আমাদের জন্য, বিশেষ করে আমার জন্য নিষিদ্ধ। বলা যায় আশাজনক স্বপ্ন দেখাটাও হাস্যকর ছিল। কারণ, বাবা প্রায়ই বলতেন- এগুলোর চিন্তাই না করতে, যার ধুুলিও কেনার সামর্থ্য নেই আমাদের। আসলেই, দিন এনে দিন খাওয়া-র অবস’া ছিল আমাদের। আমি প্রায়ই ভাগ্যকে দোষারোপ করতাম- কেন এমন একটা পরিবারে জন্ম নিতে হলো আমাকে ? তবে আমি মেনে নিয়েছিলাম। ভাগ্যের বিরুদ্ধে যাবার শক্তি সেই একক মহান স্রষ্টা ছাড়া আর কারুরই নেই। বিস্ময়কর ও সবচেয়ে হতাশাজনক ঘটনাটা ঘটল বর্ষাকালে। আমার বাবা মারা গেলেন। আমি সেদিন স্কুল থেকে ফিরছিলাম। অতি নিম্নমানের একটা স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়তাম তখন। সেদিন হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মাঝেই স্কুলে গেলাম এবং বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ফিরলাম। যাবার সময় সব পরিসি’তি স্বাভাবিক ছিল। আজ বাবা রিক্সা নিয়ে বের হননি, বাসার খড়ের ছাদে নতুন খড় লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। মা আমার একেবারে ছোট ভাইটাকে আঙ্গিনার মাটিতে বসে দুধ পান করাচ্ছিলেন আর আমার পাঁচবছরের ছোটভাইটা পাশের বাসার ছেলেটার সাথে ক্রিকেট খেলছিল। আমি যখন কাকভেজা হয়ে ফিরে এলাম, বাসার কাছাকাছি এসে বুঝতে পারলাম সবকিছু কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। বাসা থেকে কান্নার রোল পাওয়া যাচ্ছে। বাসার সামনে ছোট আঙ্গিনাটায় অনেক লোকজন দেখা যাচ্ছে। আমার বুক ধড়ফড় করছিল। কি হয়েছে ? কান্নার আওয়াজ আসছে কেন ? আমি টলমল পায়ে ভীড় সরিয়ে গিয়ে দেখলাম আমার বাবার দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তার উপর বিলাপ করে দেহের পাশে বসে উচ্চস্বরে কাঁদছেন আমার মা। আমার সবচে ছোট ভাইটা, যার কেবল দেড় বছর বয়স, মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে। আর পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আমার মেজো ভাই। বাবা যে আসলে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, এটা মেনে নিতে কষ্ট হল আমাদের; বিশেষত আমার। কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বাবাকে ভালবাসতাম আমি। বাবা নীরবে চলে গেলেন। তার মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল হৃদপিন্ড। হঠাৎ করে এই যন্ত্রটার ক্রিয়া থেমে যাওয়ায়, বাবা চলে গেলেন পরলোকের জগতে। আমরা একটা শোচনীয় ঘোরের ভিতর দিন কাটাচ্ছিলাম। এ ঘোর হয়তো দীর্ঘদিন পর্যনত স’ায়ী হতো- কিন’ আমাদের মত দরিদ্রদের ঘোরের মাঝে দিন কাটাবার কোন উপায় নেই। অভাব আমাদের ঘোরকে ধূলিস্মাৎ করে দিল। মুছে দিল মৃত লোকটির প্রতি ভালোবাসা। বরং ঘৃণা ও রাগ জাগিয়ে তুলল তাঁর প্রতি। আমার মা, এমনকি আমি পর্যন্ত অযথা যখন-তখন মৃত লোকটাকে গালাগাল দিতাম আমাদেরকে এই কপর্দকশূন্য অবস’ায় ফেলে চলে যাবার জন্যে। কিন’ তখন বাবা কিছু শুনছিলেন না, হয়তোবা কবর থেকে জান্নাতের আরামদায়ক পরশ নিচ্ছিলেন। ক্রমে আমাদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ল। স্বাভাবিক ভাবেই, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল আমার। আমরা খুব বেশিদিন চলতে পারিনি রিক্সা আর ছোট জমি বিক্রির টাকাটা দিয়ে। অভাব আমাদের গ্রাস করে নিল অনামিশার মতো। সত্যি বলতে, তখনই আমি পৃথিবীকে ভালভাবে চিনতে শুরু করলাম। জিবীকা নির্বাহের তাগিদে আমি আর আমার মা মানুষের বাসায় কাজ করা শুরু করলাম। ঐসব বড় বড় দালান-অট্টালিকা’র বেয়াদব লোকজনের সবকিছুই হাসিমুখে সহ্য করতাম আমি। কাজ এদিক সেদিক হবার জন্য চড়-থাপ্পড় খেতাম, বাড়ীঘর পরিচ্ছন্ন করতাম, ঝাড়- দিয়ে ঝেড়ে আর মুছে দিতাম পুরো বাড়ী। বাসন পরিষ্কার করে দিতাম। গালিগালাজ-ও হাসিমুখে হজম করে যেতাম। এতদসত্ত্বেও, শুধু একটা বিষয়ই আমাকে মানুষের প্রতি, জগৎ এর প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তুলেছে। কোন এক বাড়ীর এক পুরুষ প্রায়ই আমাকে অযাচিতভাবে স্পর্শ করতো….টাকার লোভ দেখাত আমাকে। কখনো জোর করে আমার জামার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে একশত-দুইশত টাকা গুঁজে দিত। আমি অপারগ ছিলাম, কিছুই করার ছিল না আমার। নিজ ভাগ্যের কাছে আমি বন্দী যে ! বন্দী পৃথিবী এবং প্রকৃতির জালেও। আমি বাসা ছাড়তে বাধ্য হলাম যখন আমার ওপর জোড় পূর্বক ওরা পাশবিক অত্যাচার চালাল। যেদিন এটা হয়, সেদিনই আমি প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হই। জ্বরের মাঝেই সিদ্ধান্ত নিই আমি-পালিয়ে যাব। কোন শহরে গিয়ে গার্মেন্টস এ চাকরী নেবো। কাউকে কিছু না বলে প্রকৃতির হাতে নিজেকে সোপর্দ করে দিয়ে মাত্র কয়েক শত টাকা নিয়ে আমি যাত্রা করলাম অজানার দিকে। এরপরের দিনগুলি…আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো সত্যিকার পৃথিবী এবং এর মানুষের সাথে। আমার বাঁচার তখনও একটা অর্থ ছিল- আমার একটা পরিবার আছে। ছোট কিন’ উন্নত-জনবহুল একটা শহরে আমি চলে আসলাম। আমার চারদিক অচেনা। কোথাও কেউ নেই। আপনজন ও ভালবাসার অভাবে চরিত্র নরম থেকে কঠিন হল আমার। তখনকার কাটানো দিনগুলি এতো ভয়ংকর ও এতটাই বাস্তব যে, আমি অন্তরস’ল হতে চাইনা কোন নারী এরকম পরিসি’তির সম্মুখীন হোক কখনো। আমি বাস্তবকে ভালকরে চিনতে পারিনি তখনও। চিনতে পারলাম ধীরে ধীরে প্রকৃতির নিষ্ঠুর উপহাস, নীরব অত্যাচারে। যা মানুষকে পশুতে পরিণত করে।

আমার থাকার আশ্রয় ছিল না। প্রথম রাত- আমি জেগে কাটালাম রাস্তায়, অত্যন্ত ভয়ের সাথে। আমার মন তখন পৃথিবীর/প্রকৃতির সীমাহীন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বারবার আমায় বলছিল আবার বাসায় ফেরত চলে যেত। কিন’ আমি ফিরে যেয়ে মুখ দেখাব কি করে ? আমার গর্ভে যে একটা জারজ সন্তান লালিত হচ্ছে ! এ সন্তানের প্রতি আমার মায়া তো দূরে থাক্‌, তীব্র-তীক্ষ্ণ একটা ঘৃণা ও রাগ চলে আসল। মনে হলো যে আমি পেটটাকে চিরে মাংসপিন্ডটা আগুনে ছুড়ে মারি ! তবে তা করলাম না আমি। কারণ তখনও আমার বেঁচে থাকার অর্থ ছিল। আমার পরিবার, আমার ভবিষ্যৎ, পরিবারের ভবিষ্যৎ। একমুঠো শান্তি। তবে আমার ভাগ্যে সত্যিই ‘শান্তি’ কথাটা লেখা ছিলনা, নেই। আমি কোথাও কাজ পেলাম না। বরং উল্টো মানুষের তীব্র গালিগালাজ, কটু দৃষ্টি আর কথোপকথন আমাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়ে দিল। আমার অন্তর মরে গিয়েছিল। রাতের পর রাত রাস্তায় কাটাতে লাগলাম আমি। টাকা জমাতে শুরু করলাম। আমার তখন উদ্দেশ্য ছিল এ নবজাতককে শেষ করে দেয়া। একসময় অ্যাবরশান করালাম আমি। আমার শরীর ও মন উভয়টাই ভেঙ্গে গিয়েছিল পুরোপুরি। ভিক্ষা করে আসলেই কোন লাভ হচ্ছিল না আমার, বরং মনে হচ্ছিল এর চেয়ে বেশি দরকার। টাকার প্রয়োজন। অর্থ এমন এক ধ্বংসাত্মক জিনিস, যা মানুষকে প্রতাপশালী করে তোলে। সর্বনাশা অর্থ-বিত্ত ! কিছু ময়লা কাগজের নোট। এর জন্যই মানুষ নিজ ভূমিকে আপন হাতে ধ্বংস করছে…এমনকি নিজ পরিবারকেও বাদ রাখছে না। এই টাকা-পয়সা’র কারণেই আমার জীবনের গতি, চলার ধারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। যেটার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, ওটাই আমাকে করতে হল একদা। কারণ ভাগ্যের উপর কারও হাত নেই। ভাগ্য যেদিক নিয়ে যায় সেদিকই যেতে হবে। কেউ পালাতে পারবে না ভাগ্যের বাঁধন থেকে। কারও সে ক্ষমতাই নেই। আমার নিজস্ব ইচ্ছার পূর্ণ বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার শিকারে আমাকে বাধ্য হতে হল পতিতায় পরিণত হতে। যে কাজটাই আমার বর্তমান জীবন। তবুও এটাকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করি আমি। আমার করার কিছু নেই। আমি যদিও বেশ কিছু অর্থের মালিক এখন, কিন’ সে অর্থ থাকাটাই বেকার-অর্থহীন। যত ভাল কিছুই করিনা কেন আমি, সবাই তো জানবে সত্যটা। ঘৃণিত সত্য। নোংরা, মর্যাদাহীন এক নিষ্ঠুর সত্য। কিছুকাল আগ পর্যন্তও বেঁচে থাকার সত্যিকার অর্থ ছিল আমার। এখন নেই। আমি একটা ব্রোথেলে চাকরি পেয়েছিলাম। আমার শরীর, মন, স্বপ্ন- তাবৎ ওরা হিংস্র শ্বাপদের মত ছিঁড়ে-কুঁড়ে খাচ্ছিল। আমি মানতে পারছিলাম না তারপরেও বাধ্য হয়েছি বেঁচে থাকার জন্য। আমার পরিবারের জন্য। কিন’ আমার পরিবার বর্জন করলো আমাকে। ঘৃণা দিয়ে, অভিশাপ দিয়ে। কারণ তারা ইতিমধ্যে সত্যটা জেনে গেছিল। ‘খবর বাতাসে উড়ে’ – কথাটা যে মিথ্যা নয় সেদিন আমি ভালকরে উপলব্ধি করলাম। আমার উপার্জিত টাকা গ্রহণ করলেন না মা। সেদিনটা আমার ক্ষুদ্র কষ্টময় বাস্তব জীবনের চরম দুঃসহনীয় দিন ছিল। মৃত্যুকে ডেকেছিলাম আমি আমায় গ্রাস করতে। আমার কোন চিহ্ন থাকবে না পৃথিবীতে, থাকবে না কোন স্মৃতি। আমাকে মনে রাখার মত আর আছেটাই বা কে ! আমি বিষ খেয়ে ফেললাম। খাওয়ার পর আমার কন্ঠনালী, সর্বশরীর অর্ন্তদাহে যেন পুড়ে যাচ্ছিল। সমগ্র স্বত্তা,মন,দেহ চিৎকার করে বলছিল যে, “ আমি বেঁচে থাকতে চাই।” কেন আমি করলাম ভুলটা। হয়তো তখন রহস্যময় জগৎের দয়াশীল ও সর্ব রহস্যময় সৃষ্টিকর্তা আমার ডাক শুনেছিলেন। আমি রাস্তায় অচেতন অবস’ায় পড়েছিলাম, একজন দয়ার্দ্র মানুষ আমার চিকিৎসার ব্যবস’া নেন। এমার্জেন্সীতে নেয়া হয় আমাকে। সুস’ হয়ে উঠি আমি। মৃত্যুকে আমি চিনেছিলাম। ওটা যে কতটা নিষ্ঠুর আর ভয়াবহ তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমাকে দিয়ে এবং রোগীদেরকে দেখে। যদি আপনি মৃত্যুর ভয়াবহতা দেখতে চান, চলে যান সরকারী হাসপাতালের কোন একটিতে, একটি রাত সেখানে রোগীদের পাশে কাটান। সেখানে রোগীদের প্রয়োজন মাফিক অর্থ নেই বলে চিকিৎসার অভাবে, নিষ্ঠুর মৃত্যুর ভয়াবাহ শিতারে পরিণত হচ্ছে নিরীহ-দরিদ্র মানুষগুলো। অসহায়ের মত কাঁদছে তারা, সমগ্র চেতনা ভয়ে যেন কেঁপে ওঠে সেই কান্না এবং বিলাপের শোকার্ত আওয়াজে। আমার এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকার কোন অর্থ নেই, তরপরেও বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আমি বাঁচতে চাইনা, আবার এখন মৃত্যুকেও ভয় পাই। নিজের ইচ্ছেয় খারাপ পথে নেমেছি যে। আমার অনুভূতিগুলিকে, আমার মানবিক আবেগ গুলোকে, আমার দেহ তথা আমার সমগ্র স্বত্তাকে ওরা হত্যা করেছে। মানুষ এবং বিশেষতঃ পুরুষেরা। ওদেরকেও ঠিক দোষ দেয়া যায় না, কারণ তারা কেবল অর্থের তাগিদেই এসব কাজ করছে। তারা মনে করে আমরা শুধু এসব কাজের জন্যই সৃষ্টি হয়েছি। দোষ দিতে হয় প্রতাপশালী হায়েনা’দের, তাঁদের নির্দেশে তৈরী ধ্বংসকারী উন্নত প্রযুক্তিকে এবং কিছু ময়লা অর্থহীন কাগজকে। সবাই যার যার মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আমাদের মনের খবর জানতে চায়না। আগে মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হতো, এক ধরণের ছেলে মানুষী অভিমান কাজ করত-মানুষদের উপর। কারো কি মন নেই ? কারো কি জানার ইচ্ছে হয়না কেন এপথে এলাম আমরা ? নাহ্‌, প্রায় সবারই মন মরে গেছে। মনকে কালো মেঘের মত গ্রাস করে নিয়েছে কিছু অর্থহীন ময়লা কাগজ, কিছু শুকনো মাটি আর পাথর এবং কিছু সুন্দরী ললনা। মানবিক আবেগ বোধহয় আর কারও মাঝে নেই। ভালোবাসা ? সেটাও স্বার্থের জন্য। উপকার ? সেটাও তো স্বার্থেরই খাতিরে। আসলে সবই স্বার্থের জন্য। কাজেই পরবর্তীতে আমি মেনে নিলাম ব্যাপারটা। ধীরলয়ে আমার ভিতর থেকেও সকল মানবিক আবেগ উবে গেল। নির্দয়, কর্তব্য বিমুখ, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী এক জন’তে পরিণত হয়ে উঠলাম। যার কাজ ডাক পড়লে নগ্ন হয়ে নিজেকে প্রদর্শন করা এবং বিছানায় যাওয়া। আমার অনুভূতি শূন্য হয়ে গেল। আমার আর কিছুতেই কিছু আসে যায় না। যেভাবে জীবন চলছে আমি এখন মানিয়ে নিতে পারব। ব্রোথেল মাসে তিন দিন বন্ধ থাকে। এই দিন তিনটিতে আমি অতিরিক্ত উপার্জনের আশায় গভীর রাতে রাজপথ দিয়ে পায়দল যাত্রা চালাই। আমার বর্তমানে যথেষ্ট অর্থ আছে, ছোট একটা বাড়ীও আছে। শুন্য বাড়ি। তবুও কেন এই তিনদিন চুপচাপ বসে কেন সময় কাটাই না আমি ? শুধু কি অর্থের জন্য ? না। কার জন্য আমি উপার্জন করি ? আমার আপন কেউ নেই। আর আমি তো বললাম, আমার সব অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। কাজেই ‘লোভ’ জিনিসটাও আর নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই রাতের গভীরে কঠোর ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির ভয়াবহতায় স্বেচ্ছায় নিজেকে বিলিয়ে দেই ? এর উত্তর আমার জানা নেই। এটা আমার কাছে নেশায় পরিণত হয়ে গেছে। যে কাজটাকে এখনো ঘৃণা করি অথচ সেটার জন্যই স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দিই নিজেকে, খুব হাস্যকর শোনায়, না ? স্ববিরোধী কথাবার্তা ! প্রকৃতির যুদ্ধে হেরে গেছি আমি। কারণ আমার কোনরুপ সামর্থ্যই ছিল না খারাপকে জয় করার। আর পনের বছরের নিষ্পাপ এক মেয়ের কতটুকুই বা ক্ষমতা থাকত, আপনারাই বলুন ?

নীরবতা খান খান করে দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডেকে উঠল। যদিও আমার ভয়েরও অনুভূতি নেই, কিন’ তারপরেও চমকে উঠলাম আমি। আমি হাঁটছি। পাশে ফুটপাতে শুয়ে আছে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ। সমাজের পরিভাষায় যাদেরকে ‘ভিক্ষুক’ বলা হয়। তুষারপাতের মত বৃষ্টি ঝরছে আকাশ থেকে। ঠান্ডা জল ও বাতাস আমাকে বেশ কাঁপিয়ে তুলছে। অতর্কিত ভাবে কেউ একজন আমার উপর হামলা চালাল। টেনে নিয়ে গেল একটা সরু গলিতে। নেকড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাকে নিয়ে। গভীর আঁধার। অনামিশা। প্রকৃতি আমাকে আবারো টেনে নিয়ে গেল বাস্তবতার নিষ্ঠুর উন্মাদনাতে, তারপর আমাকে ছেড়া কাগজের মতো নিক্ষেপ করল রাতের গভীরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top