লাউশাক – মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

 

[post-views]

শাক অলা মাইনুল আজো লাউশাক নিয়ে বেরিয়েছে ।ফনফনে টসটসে শাকের ডগায় শিশিরে জবজব।খুবই নাজুক ।শরীরটাও কেঁপে কেঁপে ওঠে ।জীবনের পরতে পরতে পরতে জমে থাকা দুঃখ গুলো সরে গিয়েও ফিরে আসে ।মানুষের লোভটাও এই শাকের প্রতি ।

এক হাজার টাকা কেজি লাউ বীজ।জমিতে ধান করার যে কী— ধকল।সব ধানী জমি আধিয়ারের কাছে বন্ধক ।ধানের চারা থেকে ধান পাকা, পাকা ধান মাড়াই থেকে চাল পর্যন্ত নানান ফ্যাকরা ।দুই মনী জমিতে আট দশ মন এখন ব্যাপার না ।কিন্তু দেদার হাইব্রিড বীজ,হরমোন, কীটনাশক, সার,সেচ,কামলা খরচের জমিদারী হালের সাথে মাইনুলরা পেরে উঠলে তো।এখন ধান ছেড়ে লাউ ,শসা, কুমড়া।

আজকাল বৌ ঝিরা এত সকালে উঠতে চায়না।ধানের পেছনে লেগে থাকেই কখন?অথচ চাচি জেঠি,নানী দাদিরা দোয়েলটার সাথে ঘুম ভাঙ্গত ।সারা উঠোনে ঝাঁট দিতো ।পানি ছিটিয়ে দিত ।ধান মাড়াই,উড়ানো, ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে শরীরের রক্ত কণাগুলো পানি করে ফেলত।
নানা দাদারা দুই গ্রাস পান্তা, শুকনো মরিচ ভেঙে তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে গরু ছাগল, লাঙল জোয়াল নিয়ে বেরিয়ে যেত ।সারাদিন ক্ষেতে  পড়ে থেকে চাষবাসের পাঠ ছিল সাধনা ।
আর এখন রাতের ডিশ লাইনে এত সব স্বর্গীয় কাহিনী, পোশাকের বাহার,পাত্র পাত্রীর শরীরে সৌন্দর্যের ডামাডোল দেখতে দেখতে রাত পার।সকালে ক্ষেতে  যাবে কখন?
দেখে আর আফসোস করে ।বড়লোকী স্বপ্নের আঁচ অনুভব করে ।

মনে মনে এবছর লাউশাক বেচার পর একটা ফ্রিজ কেনার আশা। থেকে  থেকে থিরথিরে কাঁপন বুকের ভেতর।
জবানালী পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলে—–বাজারের মাইনষেরে  খাওয়াইলে লাব নাই।ট্যাহা ছাড়া নিতাম না।
এক মুডা বিশ ট্যাহা ।
আরে বিশ ট্যাহা, মিশ ট্যাহা  বুঝিনা।আমার তিন মুডা লাগবো।বাড়িত মেমান আছে।
তিনটা বানডেল নিয়ে জবানালী বলে—-বাজার থাইককা ফিরার সময় দেহা কইরা যাইছ।
খাঁচাটা মাথায় তোলার আগেই হুরু জ্যাডা  বলে—আমরা কী দুষ করছি।দে আমারেও দুই মুডা।
এভাবে কেউ দুই,কেউ তিন,কেউ এক মুঠো শাকের বান্ডেল নিয়ে রেডি।
কিন্তু সবারই এক কথা—-ট্যাহাডা পরে নিছ।
শেষে একটা বান্ডেল পড়েছিল।ওটা নিয়ে হেলুর বাপ বললো–আমার পকেডঅ দশ ট্যাহা নগদ আছে।আমি বাহি নেইনা।  ।সহাইল্লা বেলা বাহি নেওন ঠিক না ।
মাইনুলের হাতপা কামড়াচ্ছে।দশ টাকার আধময়লা নোটটা নিয়ে বিড়ির মতো প্যাঁচাতে থাকে।যারা নিয়ে গেছে তারা টাকা এত সহজে দেয়ার লোক না ।
ঠোঁট উল্টে নিজের ওপর রাগ করে —ক্যান যে কারো মুখের  ওপরে কথা বলার সাহসটা সে পেলো না ।

এতক্ষণ তা ই দেখছিলেন   সানু মামা। ওনাকে মাইনুল দেখে এসেছে ছোটবেলা থেকেই ।লোকটার বয়স মনে হচ্ছে স্থির হয়ে আছে ।ত্রিশ বছর হয়ে গেলো সানু মামা একই রকমের দেহ নিয়ে বেঁচে আছেন ।
সমাজে সমবয়সীরা পাশ কেটে  চলছে।  হয়তো ঝিয়ের জামাই,না হয় পুতের নাতির কাঁধে হাতে ভর করে ।অন্যদিকে সানু মামা  রাস্তায়  সকাল বেলার সময়টা পূর্ণ নিঃশ্বাস নিতে নিতে কাটে ।নানা ধরনের ব্যায়াম দেখে এলাকার ডাক্তার ছদরুল সাহেবকেও লজ্জিত করে ।কেননা ছদরুল সাহেব নিজে ডাক্তারী করেন, কিন্তু ব্যায়াম করেন না।ঘুম ভাঙ্গে বেলা দশটার দিকে ।
নাস্তা সেরে পোশাক পালটে গাড়িতে ওঠেন । হাসপাতালে ডিউটি করে করে রাত হয়।কত ধরনের হিসেব নিকেশ তাকে করতে হয়।শুয়ে বসে দিনযাপন মানেই  মেদ, কোলেস্টেরল ।মাথার চুলগুলো গেছে ইন্টার্ণীতেই।চাকরি গরম গরম।পোস্টিং ,বিয়ে ,গ্যাদা বাচ্চা —‘সব গরম গরম ।পেট বেড়ে চাড়ি,ঘাড় গলা থুতনির নীচে চর্বির উৎসবে যেন প্রতিদিনই নবায়ন হচ্ছে ।
ছদরুল সাহেবও সানু মামার পিঠে চাপড়ান—-মামা, আপনে আর বুড়া হইয়েন না।

সানু মামার খাবার  তালিকায়  প্রতিদিন একপোয়া শাক,
একটা ডিম,এক বাটি ডাল কমন ।
বিড়ি সিগারেট ,পাতা পুতা,বাংলা টাংলা ধারেকাছে নেই ।অষ্টম শ্রেণি থেকেই শরীরটা ভালো রকম ফিট ।ভালো হা- ডু -ডু খেলতেন ।এম পি সাহেবের ম্যাডেলটা এখনো হাতড়ান।
কীরে মাইনুল, শাকের টাকা সবাই মেরে দিলো?
না –মামু।মারতোনা।একটু দেরীতে দিব ।ঘুরাইব আরকি ।
আস্থার জায়গাটা বেশ রপ্ত করেছে মাইনুল।
ফিরিজ কিনবি নাকি?
হ মামু।কিন্ত আপ্নে কই হুনছেন?
চেরাগ আলীর পুতেরা কইছে ।আরে খবরটা কি পাতলা?বিরাট খবর।লাউশাক বেইচ্চা ফিরিজ কিনবি ।
কিনমু তো।এহনতো শাকের ম্যালা ট্যাহা বাকি ।কবে দিব তাও কয়না।কিছু ট্যাহা জমাইছিলাম।
আইচছা, কিনলে নারায়ণের শো-রুম থাইককা আনবি তার আগে  আমার লগে  যোগাযোগে করিস।

সানু মামা ফোনটা রিসিভ করার কাজে ব্যস্ত ।
চলে গেছেন।
মাইনুলের হাতপা ঝিম ঝিম করে ।বাড়িতে ফিরেও ভাল্লাগেনা ।মিনিমাম আরো ছ’সাত হাজার টাকা লাগবে ।
সন্ধ্যার দিকে দরজার কাছে চেয়ার পেতে কৈ জাল বুনছে ।পারিবারিক এই শ্রমটুকু সে ই দেয়।একটু কষ্ট করলে জালটা হয়ে যায়।মাসে তিনটা জাল।
বউটা সিমের বিচি ভেজে দিয়েছে ।
একটা পিকাপ এসে থামলো ।
দুতিনটা ছোকরা নেমে মাইনুলের খোঁজ করে ।
সানু মামা ফ্রিজ পাঠিয়েছে ।
কিন্তু আমি তো ফিরিজের দোকানেই যাই নাই ।
ঠিক আছে,  ফোনে কথা কন।
ছেলেটা মোবাইল দিলো ।ওপাশ থেকে সানু মামার কন্ঠ —-হ্যালো –আমি সানু ।ফিরিজডা পাঠাইলাম ।
কিন্তু মামা —এত ট্যাহা কেমনে দিমু?
দেওন লাগবো না ।এইডা তোমার উপহার ।
উপহার !
হ।ওই যে কইছিলাম না—তোমার ছেলে যদি জেলার মইদ্যে ফাস্ট অয় তাইলে তোমারে  একটা উপহার কিন্যা দিমু ।—-
সারা শরীর ঘামছে মাইনুলের ।
সানু মামা আস্তা একটা ডাহাইত ।মাইনষে লাউশাকের ট্যাহাও বাকি ফালায়।আর সানু মামা ——।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top