লালনের আব্বা

শম্পা সাহা

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 31 total views

#লালনের_আব্বা
#শম্পা_সাহা

লালন পড়াশোনায় বেশ ভালোই , অন্তত মন্দ না। ওর বাবা মা স্বপ্ন দেখতো ছেলে পড়াশোনা করে চাকরি পাবে, তখন ওদের আর আলু সেদ্ধ, ডাল ভাত খেতে হবে না। রোজ মাছ খাবে! ছাপার শাড়ি তালি দিয়ে কেন পড়বে?তার ছেলে যে চাকরি করে। প্রতি দিন পাট ভাঙা, অন্তত মাড় দেওয়া শাড়ি তো পড়তে পাবে! এখন তো মাড় সকালে নুন দিয়ে ঢক করে খেয়ে ফেলে হামিদা বিবি, মানে লালনের মা।

ঈদের দিন এখন শুধু সেমাই আর মাঝে মাঝে একটু মুরগি। বড় খাসি ও হয়, তবে সব কিছুরই তো দাম বাড়ছে। বখরিদে চেয়ে থাকতে হয় কুরবানীর পর কখন পাড়ার বড় মানুষ সাকিল মিঞার বাড়ির থেকে কালো প্লাস্টিকে করে তাদের বাড়িতে আসবে একটু গোস্ত।

কিন্তু তখন আর তা হবে না, হামিদা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে তখন তাদের নিজেদের বাড়িতেই বড় খাসীর কুরবানী হবে, আর পাড়ায় সবার বাড়িতেই যাবে সেই উৎসবের উপঢৌকন।

লালনের আব্বা, সেই কোন রাত থাকতে বেড়োয়। যখন খালেদ শেখ, মুজিবুর আলীর বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন, সেই সময় উঠে উনুনে আঁচ দেয় হামিদা। চা চড়িয়ে দেয়, সঙ্গে বাসী রুটি।

ফজরের নামাজ সেরে লালনের আব্বা ওই রুটি চা খেয়ে বেড়িয়ে যায়, তখনো মোরগগুলোও ঘাড় গুঁজে পাখার মধ্যে, নিশ্চিন্ত ঘুমে।

ক্রিং, ক্রিং, ক্রিং, সাইকেলের ঘন্টি দুবার বাজিয়ে লালনের আব্বা পাকানো খবরের কাগজটা ছুঁড়ে মারে লোকের বাড়ির দরজায়। ঠক্ করে আওয়াজ হয়। নির্ভুল টিপে সেই রোল করা কাগজ সারা বিশ্বের খবর নিয়ে পৌঁছে যায় প্রতি জনের বাড়ি বাড়ি।

সেদিনও সময় মতোই বেড়িয়ে ছিল। বেড়োবার আগে দেখে এসেছে, লালন লাল বাল্ব জ্বেলে পড়তে বসেছে। আনন্দে ভরা বুক নিয়ে বের হয় লালনের আব্বা। শান্তি! লালন বড় হলে আর চিন্তা নেই!

ওকি! সবে রাস্তার মোড়টা পার হয়ে স্টেশনে যাবার শর্টকাটটা ধরেছে, স্টেশনেই তো কাগজ আসবে লাট হয়ে, তারপর ভাগ হয়ে যাবে, সব ফেরিওয়ালা দের মধ্যে।

কিন্তু রাস্তার ধারে কে যেন পড়ে আছে না? চিন্তিত লালনের আব্বা সাইকেল থামায়। সাইকেলের আলোটা ফেলে, একি এতো একটা মেয়ে, ধীরে ধীরে কাছে এগোয় লালনের আব্বা! তার লালনেরই বয়সী হবে!

ছেঁড়াখোঁড়া জামা, আর সারা মুখময় কালশিটে আর আঁচড়ের দাগ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না কি হয়েছে। সে এখন কি করবে? এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে যে। হাতটা নেয় মেয়েটার নাকের কাছে, নাঃ! শ্বাস চলছে।

পেছনে একটা সাইকেলের ঘন্টি শুনে পেছন ঘুরে দেখে একটা লোক। লালনের আব্বা তাড়াতাড়ি উঠে লোকটাকে থামায়, “একটু দাঁড়ান না, দেখেন এখানে একটা বাচ্চা মেইকে কারা যেন সর্বনাশ কইরি ফেলি রেইখি গ্যাছে! ”

লোকটা কাছে এগিয়ে আসে, নীচু হয়ে মৃদু আলোয় সবটা বুঝে দৌড়ে উঠে সাইকেল নিয়ে পালায়।লালনের আব্বা চ্যাঁচায়, “ও দাদা,দাদা,একটু দাঁড়ান”, কিন্তু কে শোনে কার কথা?

যেতে যেতে শুনতে পায় লোকটার গলা, ” বাঁচতে চাইলে পালাও! “, মানে? এই বাচ্চা মেইটা মইরি যাইচ্ছি, আর আমি পালাবো? “, কখনো না, মেয়েটা যে আমার লালনের বয়সী!

লালনের আব্বা আসেপাশে তাকায়, খোঁজে একটা ভ্যান রিক্সা, যাতে করে মেয়েটাকে একটু ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে। পরে যা হবে দেখা যাবে!কিন্তু এখনো সমাজ সংসার যে জেগে ওঠে নি। লালনের আব্বা বসে থাকে সূর্য ওঠার অপেক্ষায়।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *