লেখক

Tasnim Fahatema : বুক রিভিউঃ অণুগল্পের একশো এক শয্যা
লেখকঃআনোয়ার রশীদ সাগর
প্রকাশকঃএবং মানুষ প্রকাশনী
প্রচ্ছদঃকাব্য করিম
ধরণঃঅণুগল্পের সংকলন
প্রকাশকালঃঅমর একুশে গ্রন্থমেলা,ফেব্রুয়ারি ২০২১
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ২২০
মূল্যঃ৩৫০.০০ টাকা

বইয়ের লেখক আনোয়ার রশীদ সাগর,একাধারে কবি,গল্পকার,ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক।তাঁর এই পরিচয়ের সাথে ১০১ টা অণুগল্প নিয়ে প্রকাশিত “অণুগল্পের একশো এক শয্যা”নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।বাংলাদেশের সাহিত্যে অনেক লেখক অণুগল্পের ওপর বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু আনোয়ার রশীদ সাগরের রচিত ” অণুগল্পের একশো এক শয্যা”বইটিই প্রথম,যেখানে সর্ব্বোচ্চ ১০১ টি অণুগল্প সংকলিত হয়েছে। অনবদ্য সরস ও সাবলীল ভাষা আর চমৎকার বিষয় নিয়েই লেখক বইটির প্রতিটি গল্প রচনা করেছেন।আনোয়ার রশীদ সাগর গল্পগ্রন্থ,উপন্যাস,কবিতাগ্রন্থ এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন কিন্তু “অণুগল্পের একশো এক শয্যা” বইয়ের গল্পগুলো একেবারেই অন্যরকম,অন্যস্বাদের। আলাদা জীবন,আলাদা গল্পের ধরণ-বইটি নিশ্চিতভাবেই পাঠক-মন জয় করবে।

অণুগল্পের এই বইটি পড়তে গেলে পাঠককে সর্বপ্রথমে জানতে হবে অণুগল্প কি।

অণুগল্প বা ফ্ল্যাশফিকশন সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় শাখা।সাহিত্যের আঙিনায় এই নবতর শাখাটি ভিন্নমাত্রা সৃষ্টি করেছে।বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম অণুগল্প লেখেন বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়।
অণুগল্প আকারে ছোট হলেও,এর ঝাঁঝ বেশ তীব্র।অণুগল্পে সম্পূর্ণভাবে কিছু বলে দেয়া হয় না,তবে ইঙ্গিত দেয়া হয়।অণুগল্পের প্রতিটি শব্দ এক-একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গস্বরূপ এবং অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত।আবহাওয়া ও পরিবেশের সাথে মানানসই একটি সাহিত্যকর্ম যা আপনার শরীরে আমেজ আনবে।অণুগল্পের আয়তন,ঘনত্ব ধোঁয়াশাপূর্ণ হলেও যেন অস্তিত্বমান।অণুগল্প পড়ে আপনি একটি তীব্র শূণ্যতায় চলে যাবেন,যেখান থেকে বের হতে আপনার সময় লাগবে।এর সূক্ষ্মমোচড়,পাঠকের মনের নরম জায়গায় ক্রিয়া করে ঠিকই এলোমেলো করে দিবে।সাধারণত অণুগল্পের শেষ লাইনটা হয় ম্যাজিকের মতো,হয়তো আপনি স্বাভাবিক ভাবে পড়তে পড়তে চলে যাচ্ছেন আর লাস্ট ম্যাজিক্যাল লাইনে গিয়ে হঠাৎ একটা ধাক্কা খাবেন যেটা আপনার গল্পটি পড়ার নজরই পাল্টে দিবে আর যার রেশ আপনার মস্তিষ্কে অনেক্ষণ থেকে যাবে।

একটি বই পড়তে গেলে মুগ্ধ হওয়াটা যেমন স্বাভাবিক তেমনি কিছু বিষয় পড়ে পাঠকের ভ্রু কুচকে যেতেই পারে।”অণুগল্পের একশো এক শয্যা” বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে,লেখক যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন সেখানে নান্দনিকতার ছোঁয়া লাগেনি যার ফলে পাঠককে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতে পারে।

আবার অন্য দিক দিয়ে এভাবে বিবেচনা করা যায়,এই শব্দগুলোই বইটিকে জীবন্ততা প্রদান করেছে এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবন-কাহিনী তুলে ধরতে অতি সাবলীল ভাষা ব্যবহার করাটা অনিবার্য ছিলো।
ভালো-খারাপ সবকিছু মিলিয়ে বইটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।কখনো হাসিয়েছে,কখনো আবেগকে ভারাক্রান্ত করেছে,কখনো কিছুটা রোমান্টিক আবার কখনো আমাকে জীবনকে আলাদা আঙ্গিকে দেখতে শিখিয়েছে।
বইটিতে অন্তর্ভূক্ত আমার পছন্দের কয়েকটি অণুগল্প নিয়ে আমি একটি রিভিউ দিতে চাই।

১|শিক্ষাঃ৷একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রেক্ষাপটে লেখা “শিক্ষা” গল্পটিতে কিশোর মফিজের পরিবারে বিপত্নীক বৃদ্ধ দাদু সলিম উদ্দিন সবচেয়ে অবহেলার পাত্র।এক্ষেত্রে মফিজের বাবা রফিক সাহেব ও নির্বাকের ভূমিকা পালন করে যান।মফিজের মা কবিতা খাতুন জীর্ণ থালা-বাসনে সলিম উদ্দিনকে নিয়মিত খেতে দেয় এবং একদিন সলিম উদ্দিন রাগ করে খাবারের নির্দিষ্ট থালা-বাসন ভেঙে ফেললে নাতি মফিজ তাকে লাঠি নিয়ে মারতে উদ্যত হয় এবং বলে, “বুড়া থালা-বাসনগুলো ভাঙল কেন?………….দাদু আমি তোমার এই পুরাতন থালা-বাসনগুলো রাইখি দিতাম,আমার আম্মু-আব্বু বুড়ো হলে,এই থালা-বাসনে খেতে দিতাম;”
গল্পটির শেষ লাইন আমাদেরকে মেসেজ দিচ্ছে,আমরা আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মা কে অবহেলা করে যাই,কিন্তু আমরা ভেবে দেখিনা ভবিষ্যতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা আমাদের থেকে এই আচরণ শিখছে এবং তারা আমাদের বৃদ্ধ বয়সে একই রকম ব্যবহার ফিরিয়ে দিবে।”

২|ভাইরাস করোনাঃ যুগোপযোগী একটি রচনা।সারা পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাস যখন মারাত্মক ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে তখন রমজান ইতালী থেকে শ্বশুরবাড়ি আসে।প্রবাসী জামাইকে দেশে ফিরে পেয়ে রমজানের শ্বশুরবাড়ির লোক উৎসবে মেতে ওঠে।রমজান একজন কোভিড পেশেন্ট এবং অসচেতনা এবং নির্বুদ্ধিতার কারণে কিভাবে তার স্ত্রী মিথিলা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য করোনা ভাইরাসের স্বীকার হয় এবং মৃত্যুবরণ করে,সেটি গল্পে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন লেখক।ধর্মান্ধ গ্রামবাসী এবং হুজুর ও তাদের ভুল ধারণার জন্য বাঁচতে পারে না।গ্রাম শ্মশান হয়ে যায়।তখন সব ধর্ম মিলেমিশে একাকার হয়।জীবন বাঁচানোর তাগিদই মুখ্য হয়ে ওঠে।

৩|অপরিচিতাঃ মা-বাবাহীন লাবণী ওরফে সুন্দরী নামের একজন মেয়ের জীবনকাহিনীই এই গল্পের মূল উপজীব্য।কে-কারা একটি কন্যাশিশুকে রাস্তায় ফেলে গেলে কাজের মহিলা মাবিয়া শিশুটিকে কোলে তুলে নেয় এবং লালন পালন করতে থাকে।শিশুকন্যাটিই লাবণী,যাকে তার পালিত বাবা আফান আলী পরবর্তীতে মাবিয়ার অগোচরে টাকার জন্য ঢাকায় বিক্রি করে দেয়।ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ফুটফুটে লাবণী পতিতালয়ে পৌঁছায়।এখান থেকেই সুন্দরীর জীবন শুরু।তারপর ঘটনাচক্রে সুন্দরী একসময় গোয়ালন্দে বিক্রি হয়ে যায় তারপর ঘটনাপ্রবাহে আলমডাঙ্গা পতিতালয়ে এসে থাকতে শুরু করে।সেখানে তার পরিচয় হয় কুমুদিনী এবং সন্ত্রাসী মন্টুর সাথে।কুমুদিনীকে সুন্দরী মা বলে ডাকতো।একসময় আলমডাঙ্গা পতিতালয় তুলে দেয়া হলে সুন্দরী মন্টুকে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং দুজন ঘর বাঁধে।তখন ছিলে যৌথবাহিনী যুগ এবং মন্টু একজন ফেরারি আসামী।গল্পের ক্লাইম্যাক্সে যৌথবাহিনী দ্বারা সুন্দরী ও মন্টু নিহত হয়।এভাবেই সুন্দরীর জীবনাবসান ঘটে।

৪|প্রমোশনঃ গল্পটি পড়ে আমি বেশ মজা পেয়েছি।এএসআই টিপু নামের একজন অসৎ পুলিশ অফিসার রোকন ও লায়লা নামের দুজন তরুণ-তরুণীকে মিথ্যা মামলায় আটক করে।এএসআইটিপু,জহুর সাংবাদিক এবং লায়লা ও রোকনের থানায় বসে থাকা একটি দৃশ্য নিয়ে গল্পটি রচিত।জহুর সাংবাদিক লায়লার পক্ষ নিয়ে এএসআইকে বলে,”আপনার ও তো মেয়ে কলেজে পড়ে।খোঁজ নিয়ে দেখেন তার ও বন্ধু আছে,আড্ডা দেয়।এএসআই টিপু তখন উত্তর দেন,”আমার মাইয়া হলে ক্রসফায়ারে দিমু।আমার মাইয়া বোরকা পইরা থাকে,কোনো ছাওয়ালের বাবার ক্ষমতা নাই,আমার মাইয়ার সাথে গল্প কইরবি।”
মজার ঘটনাটি ঘটে শেষে যখন এএসআই টিপুর বাড়ি থেকে ফোন আসে যে তার মেয়ে ও একজন ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে।

৫|যেতে যেতেঃ মাত্র ৭৭ শব্দের একটি গল্প।গল্পটি পড়ে আমার শুধু একটা কথায় মনে হয়েছে,কি অপূর্ব!ঢাকাগামী ট্রেনের একটি বগিতে কথক ও তার প্রাক্তন প্রেমিকা রাখির দেখা।দুজন শুধু কিছুমাত্র দূরে বসে থাকলেও তাদের ভেতর যেনো শত মাইল,শত জন্মের দূরত্ব।রাখির স্বামী যখন রাখির পাশে এসে বসলো,কথক তখন রাখির দিকে তাকাতে পারলো,রাখির চেনা চোখদুটো ও তখন অপরিচিত মনে হতে থাকলো।

৬|জনতা বেশ্যাঃ “সে যেন দেখতে পাচ্ছে,আগে ভোট হতো দিনে,আর এখন;জনতার পেটের ভবিষ্যৎ সন্তানেরা ভোট দেয় রাতে”। আমি মুগ্ধ হয়েছি গল্পটি পড়ে।এখানে জনতা একজন বেশ্যা নারী হলেও জনতা যেনো দেশের ” জনতার” ই প্রতিনিধি।যে জনতার পিতৃহীন সন্তানেরা ভোটের নামে রাতের আঁধারে গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করছে আর জনতারা শুধু বেশ্যার পরিচয় পাচ্ছে।

বইয়ের প্রতিটি গল্পই দারুণ।বইটি পড়লে আপনারা বুঝতে পারবেন।বড় পরিসরে আলোচনা করতে গেলে সব গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করাই অনিবার্য হয়ে উঠবে।

বই হৃদয়ের খোরাক।যে বই আমাদের সুসভ্য করেছে,সেই বইবিমুখ জাতি কখনো উন্নতিসাধন করতে পারে না।আদিমকাল থেকে বই বিনোদনের মাধ্যম।এর সাথে সাথে বই সুরুচির পরিচায়ক।তাই আশা করি আনোয়ার রশীদ সাগরের “অণুগল্পের একশো এক শয্যা” বইটি বেশ ভালোভাবেই পাঠক মনে জায়গা করে নিবে।পাশাপাশি লেখক এর পরবর্তী বইগুলো আরো সুন্দর শব্দ চয়নের মাধ্যমে পাঠককে আরো নতুন কিছু উপহার দেবেন বলে আশা করি।

বুক রিভিউ ঃ Tasnim Fahatema

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top