শাউরি

 4 total views

#শাউরি
#শম্পা_সাহা

উনোনের পাড়ে বসে দরদর করে ঘামছে বাতাসী। মাঝে মাঝে একটু আঁচল ঘুরিয়ে বাতাস করছে।

মদন এই সময়টা ঠেকে কাটায়। একটু পেটে না পড়লে যেন চোখে আঁধার দেখে ওর মরদ।আর তখন যেন সব ঝাল তোলে বাতাসীর ওপর।

উহ্! ভাত দেবার ভাতার নয় কিল মারবার গোঁসাই। আগে আগে মদন চড় চাপড়টা মারলে চুপচাপ হজম করতো এখন বাতাসীও হাত তোলে। গেঁজেল, মাতালটার শরীলে আর কিচ্ছুটি নেই। যেন হাড়ের ওপর চামড়া! তাও তেজ দেখো!

এক একদিন মনে হয়, দেয় বঁটিখানা জানোয়ার টার গলায় বসিয়ে। যা ভ্যান চালিয়ে রোজগার করে সব ই তো ওই বাংলার ঠেকে ফুরিয়ে আসে! তার আবার কত তেজ!

“মদনের বাতাসীর পেটের আগুন, মনের আগুন, শরীলের আগুন মেটাবার মুরোদ নেই, এদিকে কিলিয়ে সোয়ামী সাজতে আসে! “, গলা ফাটায় বাতাসী।

তবে শাউরি বুড়ির জন্য বড় দরদ ওর। এ যেন এক অদ্ভুত কথা। তবু এই অদ্ভুত টাই ওদের কাছে সত্যি। শাউরিকে বুকে আগলে আগলে রাখে বাতাসী। সেও তো ওকে আগলে আগলে রাখতো। যখন মাত্তর ষোলো বছরে ও মদনের বৌ হয়ে আসে।

ওর বাপ মধু হালদার তিন তিনটে মেয়ের বাপ হয়ে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল ওকে ঘাড় থেকে নামাতে। সেই ইস্তক মদনের গা জোয়ারীর হাত থেকে তো শাউরিই বাঁচিয়েছে!

যখন মদনের বাপ মরে তখন মদন কোলে। তারপর থেকে মদনের মা মাধবী চেয়ে চিন্তে, গতর খাটিয়ে ছেলে মানুষ করেছে। যা চেহারার জৌলুস ছিল, চাইলেই আর একটা বিয়ে করতে পারতো। দেখতে এখনো যা সুন্দরী ছেলের বৌ আসার পর ও, বাতাসী বুঝতে পারে তার শাউরি তার বয়সে কেমন ছিল!

কিন্তু মাধবী ও পথ মারায় নি। একা মেয়ে মানুষ পেয়ে অনেক শিয়াল, নেকড়ে খাঁমচাতে,হামলাতে চেয়েছিল কিন্তু মাধবীর এক কথা, ” অন্য বেটা ছেলে কি মদনের বাপ হবে? সে হবে আমার মরদ! মদন আমার রাস্তায় গড়াগড়ি যাবে! ”

সেই মদন যখন মায়ের গায়ে হাত তোলে নেশার পয়সার জন্য, বাতাসীর সহ্য হয় না। ” আমরা মেয়ে ছেলে বলে পারলুম রে, তোরা হলে তো অন্য মেয়ে মানুষ খাবলাখাবলি করতিস!”

বাতাসী বোঝে, কি কষ্ট। রাত্তিরে যখন শরীলটা দাহ দাহ করে আর শয়তান টা মদ খেয়ে নিস্তেজ, মনে হয় গলায় পা তুলে দেয়। পারে না! তবে শরীলের জ্বালাও তো বড় জ্বালা!

কিন্তু ও যায় না কারো কাছে। তার” শাউরি যদি দুবছর ঘর করেই একা থাকতে পারে, সে কেন পারবে না। তবু তো মদনকে ঘুমের ঘোরে পুরো না হলেও এট্টু আধটু পায়, শাউরি তো তাও পায়নি।” ভাবে বাতাসী।

হাঁড়িতে ভাত ফুটছে টগবগ করে। সকালে চান করতে গিয়ে গামছা পেতে কটা চারাপোনা, আর দুটো লাল কাঁকড়া পেয়েছিল। তার টক আছে, “গরম ভাত দি ভাল ই লাগবে! ” ভাবে বাতাসী।

হঠাৎই উঠোনের ঝাপ খুলে যায়। মদন এতো তাড়াতাড়ি যে। “নিশ্চয়ই কারো সাথে বাওয়াল করিছে, নইলে তো এতো তাড়াতাড়ি আসার ও লোক না। ”

উঠোনে দাঁড়ানো সাইকেলটা দেখেই ক্ষেপে ওঠে মদন, ” ওই বুড়ো মদ্দ টা আবার এইছে? ” তেড়ে যায় মায়ের ঘরের দিকে। দমদম লাথি মারে মায়ের ঘরের দরজায়।

“বের হ শালা, বের হ ! বুড়ো বয়সে খুব রস? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন! ” দরজা টা খুলতেই হুড়কো হাতে তেড়ে যায়, সেই লোকটার কাছে, যে লোকটা কাঁচুমাচু মুখে এইমাত্র বেরোলো বাতাসীর শাউরির ঘর থেকে।

বাতাসী হাতের কাছে বঁটিটা পেয়ে ওটাই হাতে নিয়ে তেড়ে যায়, “খপরদার বলছি, ভরত কাকারে কিছু বলবা না! ওনার জন্যি গুষ্টি সুদ্ধু লোক উপোস করি থাকবে না? যাও ভরত কা তুমি বাড়ি যাও, আমি ওরে দেখতেছি! ”

প্রৌঢ়, অকৃতদার ভরত ধীরে ধীরে লজ্জিত মুখে সাইকেল নিয়ে বের হয় বাইরে। মাধবী কুঁকড়ে গুটিয়ে বসে থাকে ঘরের এক কোণে। শুনতে পায় বাতাসীর চিৎকার, “কিসের সোয়ামী,কিসের ছেইলি? বেশ করিছি, শাউরির ঘরে লোক ঢুকিয়িছি। ওনার জেবন নাই শুধু তোর জেবন ? আমাদের জেবন নাই শুধু তোদের জেবন, তাই না রে? ”

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *