শিরদাঁড়া

শিরদাঁড়া
নন্দা মুখার্জী
“দূর থেকে তার ছায়া দেখতে পেলাম, আমার দিকেই সে এগিয়ে আসছে”। অনেকগুলো বছর তার সাথে ছাড়াছাড়ি থাকলেও অন্ধকারের ভিতর তাকে দেখতে পেয়েও আমার তাকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হয়নি।একটু একটু করে সে আমার দিকে এগিয়ে আসছে আর ছায়াটা স্পষ্ট হচ্ছে।সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত আমি ফিরে যাচ্ছি আমার ফেলে আসা অতীতে।
  ভালোবেসে সুমনকে বিয়ে করেছিলাম।সেও আমায় খুব ভালবাসতো।অন্তত তখন আমি তাই জানতাম।দুবাড়ির থেকে আমাদের বিয়েটা মেনেও নিয়েছিল। সুমনকে বিয়ে করার দুমাস পর আমি বুঝতে পারি যে সুমনকে আমি ভালবাসতাম আর যে সুমনকে আমি বিয়ে করেছি দুটো মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা।প্রেম করার সময় আমি সুমনের বাইরের চেহারাটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। বেশিক্ষণ সময় যেহেতু তার সাথে বিয়ের আগে কাটাইনি তাই তার ভেতরের চেহারাটা আমি বুঝতেই পারিনি।বুঝতে পারলাম দ্বিতীয় মাসে মাইনে পাওয়ার পর। 
  আমি একটা ম্যালটিন্যশনাল কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি করি।প্রথম মাসে মাইনে পাওয়ার পর অফিস থেকেই বাপের বাড়িতে গিয়ে মায়ের হাতে যে টাকাটা দিতাম সেটা দিয়ে আসি।কারণ বাবা অনেকদিন আগেই রিটায়ার করেছেন।কোন পেনশনও নেই।এককালীন যা সামান্য কিছু টাকা পেয়েছিলেন বছর খানেক ওই জমানো টাকাতেই টুকটাক করে তিনজনে চালিয়ে নিয়েছি।তারপর আমার এই চাকরি পাওয়া।এরপর থেকে আমার টাকাতেই সংসার চলত।যেহেতু আমাদের পরিবারের আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম সেহেতু এই মুহূর্তে আমি বিয়ে করতে রাজি ছিলাম না। সে কারণটা আমি সুমনকে জানিয়েছিলাম।সুমন আমাকে বলেছিল,
— ধুর পাগলী, এটা কোনো সমস্যা?তুমি যেমন মাকে টাকা দাও ঠিক সেরকমই দেবে।সেক্ষেত্রে আমি কোনদিনও তোমায় বাঁধা দেবোনা।আমার ভালো লেগেছিলো সুমনের কথা শুনে।তাই আমিও বিয়েতে রাজী হয়ে গেলাম।
 প্রথম মাসে মাকে টাকা দিয়ে এসে আমি শ্বাশুড়ির হাতে কিছু টাকা সংসারের পিছনে খরচ করার জন্য হাতে ধরিয়ে দিই। যদিও তিনি বারবার বলেন এসব ব্যাপারে তাকে না জড়াতে।আমি যেন তার ছেলের হাতেই টাকাটা দিই।কিন্তু আমি রাজি হই না।কারণ সুমন ভালো চাকরি করে;সে ক্ষেত্রে শ্বাশুড়ি মায়ের সব সময় ছেলের কাছ থেকে টাকা চেয়ে কিছু কেনার থেকে তার হাতে যদি টাকা থাকে তিনি নিজেই সেটা তার ইচ্ছামত খরচ করতে পারবেন।আমি জোর করে তার হাতে টাকা রেখে আসি।কিন্তু দ্বিতীয় মাসে আমাকে অবাক করে দিয়ে মাইনে হওয়ার দিন আমি যখন অফিস থেকে বেরোচ্ছি দেখি সুমন দাঁড়িয়ে আছে।আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল,
—তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম তাই ভাবলাম একসাথে বাড়ি ফিরবো।আমি তখন তাকে বললাম,
— কিন্তু আমি তো আগে মায়ের কাছে যাবো মায়ের হাতে সংসার খরচের টাকাটা দিতে। সুমন আমাকে বলল,
— আরে আজকেই দিতে হবে কেন?তুমি কাল অফিসের পথে দিয়ে এসো। তখনও আমি বুঝতে পারিনি সুমনের আসল উদ্দেশ্য কি?আমি তার সাথে বাড়ি ফিরে আসলাম। মাকে ফোন করে বলে দিলাম কাল অফিসের পথে বাড়িতে যাবো। সেদিন রাতে আমাকে আদর করতে করতে সুমন আমাকে বলল,তার একজনের কাছে বেশ কিছু টাকা লোন আছে।সেই টাকাটা তাকে দিতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সুমনের কাছে কোন টাকা পয়সা নেই।আমি যদি কোনভাবে সুমনকে সাহায্য করতে পারি তাহলে তার খুব উপকার হয়।আমি তার কাছে জানতে চাইলাম,
—কত টাকা?
সে বলল,
—হাজার পঞ্চাশেক।
আমি তাকে জানালাম এই মুহূর্তে আমার কাছে অত টাকা হবে না।তবে কিছু দিয়ে সাহায্য করতে পারি।সুমন আপাতত তাতেই রাজি হল। আমি সুমনের হাতে পরদিন ব্যাংক থেকে তুলে এনে হাজার দশেক টাকা দিলাম।কিন্তু এইপর প্রতিদিনই সুমন কোন না কোন কাজের বাহানা দিয়ে আমার কাছ থেকে টাকা নিতে শুরু করলো।প্রথমদিকে ব্যাপারটা একদম বুঝতে পারিনি।কিন্তু দিন যত এগোতে লাগলো সে আমার বাপের বাড়িতে টাকা দেওয়া নিয়েও আমাকে টোনটিং  করা থেকে শুরু করে নানান ছুতোয় আমার কাছ থেকে নানান ভাবে টাকা আদায় করতে থাকে।একদিন আমি তার প্রতিবাদ করায় সে আমাকে জানায়,
— থাকবে এখানে, খাবে এখানে, অসুখ বিসুখ হলে দেখবো আমি, খরচ করবো আমি আর টাকা দেওয়ার বেলায় বাপের বাড়ি?
— কিন্তু আমি তো শুধু তোমার বাড়িতেই থাকি।আমি মায়ের হাতে যে টাকাটা ধরিয়ে দিই একজন মানুষের খাওয়া, থাকার বিনিময়ে এর থেকে বেশি লাগেনা।তাছাড়া অফিসে যাওয়ার আগে রান্নাটা করেই বেরোই কারণ রাধুনির হাতের রান্না তো তোমার আবার মুখে রোচে না।তবে কোন অবস্থাতেই বাপের বাড়িতে টাকা দেওয়া আমি বন্ধ করবো না।আমি তাদের একমাত্র সন্তান।অনেক কষ্টে তারা আমাকে এই জায়গাটায় দাঁড় করিয়েছেন।আর বেনিফিটটা শুধু এ বাড়ির লোকেরা পাবেন আর আমার বাবা-মা অর্থের অভাবে কষ্ট করবেন এটা আমি কিছুতেই মেনে নেবো না।এতে যদি তোমার সমস্যা হয় অনায়াসে তুমি আমায় ডিভোর্স দিয়ে দিতে পারো।
 অশান্তির সূত্রপাত সেই শুরু। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমার শ্বাশুড়ি মা সম্পূর্ণভাবে আমার পক্ষে থেকে ছেলের সাথে অনেক সময় ঝামেলায় জড়িয়ে গেছেন। নিত্য অশান্তি আর তিক্ততার মাঝেও আমি কখনোই বাপের বাড়িতে টাকা দেওয়া বন্ধ করিনি।নিজের শিরদাঁড়াটা সোজাই রেখেছি।এইভাবে এক বছর পর যেদিন সুমন আমার গায়ে হাত তোলে তার পরদিন বাবার দেওয়ার গয়নাগাটি নিয়ে আমি  সুমনের সামনে থেকে ও বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসি। ছ’মাস পর উকিল এর মাধ্যমে ডিভোর্সের চিঠি পাঠাই।তারপরে সুমন বেশ কয়েকবার আমাকে ফোন করার চেষ্টা করে।কিন্তু আমি ফোন ধরি না।ডিভোর্সটা পেতে আমার খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।আমি বাবা মায়ের কাছে এসে সময়ের সাথে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।কিছুটা সফলতা অর্জনও করি।কিন্তু কখনো কখনো একাকী মনের মধ্যে বিয়ের আগের স্মৃতি গুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।কারণ বিয়ের পরে সুমনের সাথে সত্যিই আমার কোন সুখস্মৃতি নেই।
  এইভাবে বছর ছয়েক কেটে যায়।এক বছরের ব্যবধানে বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে ফেলি।আগে চলে যান বাবা তারপর মা।আমি খুব একা হয়ে পড়ি।যেটুকু সময় অফিসে থাকি সেই সময়টুকুই সবকিছু ভুলে থাকি।অফিস থেকে বাড়ি ফিরে ফাঁকা ঘরে মা,বাবার স্মৃতিগুলি আমায় যেন ঘিরে ধরে। একদিন অফিস থেকে ফিরে অন্ধকার বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম।হঠাৎ দেখি সুমন এগিয়ে আসছে।সুমনকে দেখতে পেয়ে সত্যি বলতে কি আমি একটুও খুশি হতে পারিনি।শেষে গেটের কাছে এসে দাঁড়ালে আমি গেটের তালা  খুলে দিতে বাধ্য হই। ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে! সুমন আমাকে সবকিছু ভুলে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করে।এমনকি হাত দুটি ধরে কাঁদো কাঁদো হয়ে ফিরে যাওয়ার জন্যও অনুরোধ করতে থাকে।কিন্তু সুমনের এই অভিনয় সেদিন আমি ধরে ফেলি।যেহেতু বাবা মা বেঁচে নেই সে যদি আমাকে আবার তার বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে তাহলে  মাইনের পুরো টাকাটা তার থাকবে। কিন্তু আমি আমার শিরদাঁড়াটাকে সোজা রেখে সেদিনও সুমনকে ফিরিয়ে দিই এবং তাকে ভালভাবে বুঝিয়ে দিই আমার মৃত্যুর পর আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি একটি বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাবে এবং আমি তার সমস্ত রকম ব্যবস্থা করেই রেখেছি। সুমন মাথা নিচু করে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
 না সেদিন আমার একটুও কষ্ট হয়নি।আমার চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসেনি।ছেলেবেলায় বাবা শিখিয়েছিলেন শিরদাঁড়া সোজা রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচতে।আমি আজও সেই ভাবেই বেঁচে আছি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top