শুভক্ষণ – নুজহাত ইসলাম নৌশিন

– 

[post-views]

মাথার দুপাশের শিরা দপদপ করছেটেনশনে নয় বিরক্তিতে আর ঘৃণায়ছয়ত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় যদি এসব কথা হেয়ালির মতো কেউ বলে যায়  তখন মাথার শিরা, উপশিরা সব কিছু দপদপ করা স্বাভাবিক। 

     নোরা খিলখিল করে হেসেই যাচ্ছেআশ্চর্যএই কথা গুলো বলার পর আমার সামনে বসে হাসতে পারছেআর কত সহজেই কথা গুলো বলে যাচ্ছেআমি যে রেগে যাচ্ছি তা কি একটুও বুঝতে পারছে নাহয়তো না কিংবা বুঝলেও ইচ্ছে করেই বলছেসব দোষ আমারইকেন যে কাছের মানুষ ভেবে বিশ্বাস করে বলতে গিয়েছিলাম, কাছের মানুষ গুলোই খুব সুন্দর করে নিঁখুত ভাবে পিঠ পিছনে ছুরি মারেএখন যেমন আমার হলো। 

      হেই গার্ল, হোয়াই সো সিরিয়াস? জাস্ট ফান এটা

আচ্ছা  নোরার গালে যদি ঠাস করে একটা চড় দিতে পারতামকেমন হতোআমার নাম ব্যবহার করে ঠিক আমার সাথে যার  ঝামেলা তাকে ভড়কে দিচ্ছেএবং  তার প্রতিক্রিয়া কি হলো তা আমায় জানাচ্ছেকি লজ্জা  আর কি ভয়াবহ  গ্লানিআমি সব জেনে শুনেও কিছু  করতে পারছি না।  হায়আমি জেনে  শুনে করেছি বিষপানতাছাড়া আর কি বলবো।  নোরা যাওয়ার আগে আরেক দফা হেসে বললদেখেছিস আমি কত ক্রিয়েটিভ !তোর কথার স্টাইল  এমন ভাবে কপি করেছি আর তোর তথ্য এমন ভাবে ব্যবহার করেছি ছেলেটা ভেবেই নিয়েছে এটা তুইএকদম পিওর তুইহা হা হা…. 

     নোরা চলে যাওয়ার পর ওর হাসি যেন দেয়ালে দেয়ালে ঠোকর খেয়ে আমায় ব্যঙ্গ করছেশূন্য  বাসা আরো শূন্য  লাগছেবাসার সবাই আজ কই যেন গ্যালোতীব্র  মাথা ব্যথায় সব গুলিয়ে যাচ্ছেএ্যালসেট পাঁচ মিলিগ্রাম খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলামঘুমে চোখ বন্ধ  হয়ে আসছে আর ছবির মতো ভুল গুলো চেতনায় দোল খাচ্ছেঢং ঢং ঢং…. 

  আজ থেকে  এক বছর নয় মাস আগে  ঘটনার শুরুযা সোজা ভাবা হয় তা আসলে কখনোই সোজাসাপ্টা হয় নাওই সন্ধ্যাটা আমার জীবনে  একটা অভিশপ্ত সন্ধ্যাই ছিলোনয়তো একটা মিথ্যা সম্পর্ক কেনো বছরের ওপর বয়ে বেড়াচ্ছিকি হলে কি হতো জানি  না, কিন্তু  যা হওয়ার তাই হয়েছে এবং  শেষটা খুব  বাজে ভাবে হয়েছেঘুম ভেঙে যাওয়ার পর মাথাটা ধরে আছে, জানালা দিয়ে  তাকিয়ে দেখি ঝুম ঝুম বৃষ্টির ধারাযখন ঘুমিয়েছিলাম তখন বোধহয় রোদ ছিলো আর তাপমাত্রা কত যেন ছিলো – 

ফোনটা বেজেই যাচ্ছেধরবো না ভেবেও ধরলাম ।  ফোনের ওপাশ থেকে  মায়ের উদ্বেগ মাখা গলা – “ কিরে, কখন  থেকে ফোন করছিধরছিস না কেনোদুপুরে খেয়েছিসআমাদের  ফিরতে ফিরতে রাত হবে…. টু টু টুযাহ্, নেটওয়ার্ক  চলে গেছে আর ঠিক তার পরই চোখ ঝলসিয়ে একটা বাজ পড়ার আওয়াজ। 

    মন কেন আজ চঞ্চলগুনগুন করে কফি চট করে বানিয়ে  বারান্দায় চলে এলামযা হবার হয়েছেএরকম  ঝুম বৃষ্টিতে  মন খারাপ করে থাকা  অন্যায়এ্যালসেট এর ঘোর কাটতে শুরু করেছে, কফিটা শেষ  করার আগেই  আমাকে গুরুত্বপূর্ণ  কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  

   রিডিং রুমে টেবিলের উপর ফল কাটার ছুরিটা দিয়ে  আপেল কাটতে কাটতে সিদ্ধান্ত নেওয়া  শেষ  করে এক টুকরো  আপেল মুখে দিলামবৃষ্টি  আরো জোরেশোরে নামছেআচ্ছা সাব্বির ভাই  কে একটা ফোন দিলে কেমন হয়দিবো কি দিবো না ভাবতে ভাবতে আঙুল ডায়লে চলে গেলো

হ্যালো, নিতু

সাব্বির ভাই  একটা কথা ছিলো– 

নিতু তুমি  দশ মিনিট পরে কল দাও। 

  সাব্বির  ভাই  এর দশ মিনিট  পরে  কল দাও এর মানেআমি কিছুক্ষণ পর আসছি!’ আজ এই বৃষ্টিতে কি আসবেআমার ভয়াবহ মন খারাপের দিনগুলোতে এই ছাব্বিশ বছরের তরুণ খুব  সাবলীল ভাবে পাশে ছিলোতারপর  যখন আমার দুঃখ দিন কেটে  গেলো উনি আস্তে আস্তে সরে গেছেনআমি কিছু  বুঝার আগেই।  আর বুঝতে বুঝতে আমার তিন বছর লেগে গেলো! মাই গুডনেস

   সিদ্ধান্ত  এক এখন  কার্যকর হবে।  আমি আলমারি  খুলে কালোনীল শাড়িটা নিলাম । 

চোখে কাজল দিবো কিহ্যাঁ কিংবা  নাহ্যাঁ কিংবা না।  হ্যাঁ জয়যুক্ত  হয়েছে।  হালকা করে একটু  কাজল টেনে দিলাম । 

  সিদ্ধান্ত  দুই  রান্না  ঘরে গিয়ে সাব্বির  ভাইয়ের পছন্দ  খিচুড়ি সাথে  বেগুন  ভাজাবেশিক্ষণ  লাগবে নাওয়ানটুথ্রী… 

  কলিং  বেল বাজচ্ছে নাকি হৃদপিণ্ডে হাতুড়ি  পিটছে  কেউএখন সিদ্ধান্ত  তিন কার্যকর হবে।  আমি  স্বাভাবিক  ভাবে  দরজা খোলার চেষ্টা  করছি, কিন্তু  হাত পার্কিনসন রোগীদের মত কাঁপছে। 

 ইশ্,সাব্বির  ভাই  তুমি  যে  একেবারে  কাক ভেজা হয়ে গেছো। 

না ভিজেই বা উপায় কি, নিয়তি যে– 

মানে

মানে কিছু  না, সামনে তখন রোগী ছিলো তাই কথা বলতে অস্বস্তি লাগছিলোকি বলবে জানি

আবার সেই  বুক ধুকপুক, ধ্যাত এখন কি একটা বাজ পড়তে পারে না কাছেপিঠেচট করে কথাটা বলে ফেলতাম। 

 “কিসের যেন পোড়া পোড়া গন্ধ লাগছে

এইরেআমি দৌড়ে রান্নাঘরে যাওয়ার আগে বললামসারাজীবন আমার পোড়া খিচুড়ি খেতে পারবেন  সাব্বির ভাই?  

বৃষ্টি  একবার কমে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে ঝরছেআজ কি সব বৃষ্টি  হয়ে যাবে নাকি?  

আমি পোড়া খিচুড়ি  নামিয়ে  এসে দেখলাম সাব্বির ভাই মাথা চুলকাচ্ছেলোকটা এমন কেনোআমায় দেখেই বললসারাজীবন পোড়া খিচুড়ি খাওয়ার কথা কি যেন বলছিলে

হায় আল্লাহডাক্তারগুলো এমন বেকুব হয় কেনোসরাসরিই বলতে হবে মনে হচ্ছেসাব্বির ভাই  আপনাকে আমার ভীষণ রকম দরকার । 

কেনো?  

ধ্যাতমাথামোটা নাকি, না বুঝেও না বুঝার ভান করছেবৃষ্টির শব্দে আমার কথা আড়াল হয়ে যাচ্ছে  – আমি কানের কাছে মুখ নিয়ে  বললাম , কেন দরকার  বুঝেন নাঘরে একটা ডাক্তার  থাকলে অসুখবিসুখে কত সুবিধা ! আমার কান্না  পেয়ে যাচ্ছে , লোকটা যাচ্ছে তাই রকমের

  নিতু বুঝলে আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম , আমার কোয়ার্টারে রান্নার কেউ  নাই, কেউ  যদি  এমন বৃষ্টি  – বাদলায় আজকের মতো পোড়া খিচুড়ি খাওয়ায় মন্দ  হয় না । 

বাইরে  বৃষ্টির তোড় কমে এলকোথা থেকে  এক ঝলক রোদ  এসে হাজিরআর পৃথিবীর সেই  আদিম  মানব- মানবী।  দুজনে মুখোমুখি  গভীর দুখে দুখি। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top