শেষ বিকেলের আলো – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

[post-views]

বর্ষা শুরু হয়েছে. আজ আর  হাঁটতে যাওয়া হবে না. প্রৌঢ় রাজেন বারান্দায় একা বসে আছে. একটু আগেও পাড়ার ছেলেরা সামনের মাঠে খেলছিল. এখন শুধুই বৃষ্টির শব্দ. শব্দও এক এক সময় কথা বলে. মনে মনে নানা ছবি আঁকে.
রাজেন ভাবছিল,   যৌথ সংসারটা কিভাবে ভেঙে গেলো. বাবা, মা, আরও প্রিয়জন একে একে চলে গেলো. সংসারে স্বার্থের সম্পর্ক বেশী দিন টেঁকে না. অনেকেই বদলে গেলো. কেউ কাছে থেকেও পর হয়ে গেলো. আত্মীয় স্বজনরাও ইদানীং  খোঁজ খবর রাখে না . চিঠি লেখা উঠে গেলো. হাতে এলো মোবাইল ফোন. সম্পর্কের শিকড়টা আরও আলগা হয়ে গেল. রক্তের সম্পর্ক ভেঙে গেলে কষ্ট হয় বৈ কী.
— চুপ করে বসে আছো যে,  কী সব ভাবছো? আনমনা  রাজেন পেছন ফিরে দেখলো স্ত্রীকে.
এই আরতির সঙ্গে প্রায় সাতাশ বছর ঘর সংসার হয়ে গেলো রাজেনের . হ্যাঁ এই একটা সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত হাজার সমস্যা নিয়েও  থেকে যায়. স্বামী -স্ত্রী. আজকাল আবার এই সম্পর্কেও ফাটল ধরছে. নানা তুচ্ছ কারণে শুধু দেয়া নেয়ার হিসেব কষে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে. মাঝে আবার পথের কাঁটা হয়ে যাওয়ার জন্য নিজের সন্তানকেই কেউ কেউ সরিয়ে দিচ্ছে.
খবরের কাগজের পাতায় এখন শুধুই রাজনৈতিক  চুলোচুলির সংবাদ নয়তো খুনোখুনির. নয়তো ব্যাংকের সুদ কমে যাওয়ার বিবরণ. উন্নয়নের খবর নেই বললেই চলে.
টি ভি সিরিয়াল গুলিতেও শুধু ভাঙ্গনের গল্প. পরকীয়া প্রেমের ছড়াছড়ি.
রাজেনদের বৈঠকী আড্ডায় এসব নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়. রাজেনের তা ভালো লাগেনা. রাজেনের মনে হয় এসবের পেছনে আছে পারিবারিক শিক্ষার অভাব. সহমর্মিতার দৈন্য.
রাজেনের অবশ্য একটা কাজ বাকী আছে. একমাত্র ছেলের একটা পাকা কাজ হয়ে গেলেই  তাকে সংসারী করে দেওয়া. তাহলেই তার ছুটি. রাজেনের বাবার অবশ্য সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নি.
প্রিয় বন্ধু অজয় সেদিন বলছিলো, -ছেলেকে নিয়ে এতো ভেবো না রাজেন. পড়াশোনায় ভালো. কাজ একটা ঠিকই পেয়ে যাবে. কিন্তু ওই যে সংসারী করে দিলেই তোমার দায় শেষ হবে না.   আর এক সম্পর্কের টানা -পোড়েন শুরু হবে. এখন আবার ফ্ল্যাট কালচার চলছে. শিকড় কাটার লোকের তো এখন অভাব নেই.
রাজেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, কপালে যা লেখা আছে তাই হবে. কুশিক্ষা তো আমরা দিই নি. কারও কোন ক্ষতিও আমরা করি নি.
এখন সন্ধ্যা নেমেছে. পাখীদের কলরব থেমে গেছে. কে যেন রাস্তার আলোটাও জ্বেলে দিয়েছে. বাড়িতে শাঁখের আওয়াজ শোনা গেল. আরতি এবার ঠাকুরকে খাবার দেবে. প্রদীপ জ্বেলে সবার মঙ্গল কামনা করবে. এটাই নিত্য রীতি.
রাজেন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো. প্রেসার-এর ওষুধ খেতে হবে.একটা গল্পের বইয়ের  কিছু প্রুফ দেখা বাকী. সেটা শেষ হলে ছাপতে যাবে. একটা মানসিক শান্তি পাওয়া যাবে. কিছু জরুরী লেখাও বাকী.
এমন সময় ছেলে রঞ্জন সামনে এসে দাঁড়ালো.
-কীরে কিছু বলবি?
বাবা, আবার একটা সরকারি চাকরির পরীক্ষার বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে. কালই অনলাইনে আবেদন করবো. দুশো দশ টাকা পরীক্ষার ফী লাগবে.
দেখো,  ‘এবার আমি ঠিক  একটা সুখবর তোমাকে দিতে পারবো. ‘
রাজেন আবার  একটা আশার আলো দেখতে পেলো.
শেষ বিকেলের আলো ll

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top