শেষ শ্রাবণে বৃষ্টিবন্দি

শেষ শ্রাবণে বৃষ্টিবন্দি // মারিয়া নূর

৫.

খাবারের টেবিলে এসে বসলো আফরা। জোহরা খাতুন পরোটা আর কীসের যেন একটা তরকারি এনে টেবিলে রাখলেন। আফরা তরকারি বাটির দিকে চোখ বুলালো। কাঁচা পেঁপে নাকি লাউয়ের তরকারি আফরা বুঝতে পারলো না। তরকারি দিয়ে পরোটা খাওয়া ব্যাপারটা আফরার অত্যন্ত অপছন্দ। সে তরকারির দিকে নাক মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। জোহরা খাতুন চেয়ার টেনে আফরার সামনে বসলেন। জগ থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে তিনবারে গ্লাসের পানিটুকু শেষ করলেন।

‘মা আমি তরকারি খাবো না রাখো এগুলো। ‘

জোহরা খাতুন উঠে গিয়ে চা বানিয়ে আনলেন। আফরা কিঞ্চিৎ চমকাল।

‘কী ব্যাপার মা আজ কিছু না বলে চুপচাপ চা নিয়ে আসলে!’
জোহরা খাতুন কিছুটা থতমত খেয়ে বললেন,

‘না না কিছু না। তুই চা দিয়ে খা পরোটা। ‘

প্রায় দশ মিনিট পরে জোহরা খাতুন আবারও বললেন,

‘তোর শীলা আন্টি আছে না! সে আজকে কল দিয়েছিল।’

‘বেশ ভালো। তো কল দিয়ে কী বললো তোমাকে? ‘

আফরা পরোটা মুখে পুরে বললো। জোহরা খাতুন একটু নড়েচড়ে বসলেন।

‘তার চেনাজানা একটা ছেলে আছে। ছেলেটা নাকি ভীষণ ভালো। নিজস্ব বাড়িঘর আছে,ব্যবসা আছে। তুই আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস আফরা?’

‘হুম। ‘
আফরা জবাব দিলো।

‘হুম হুম কী করছিস। এইবার অনন্ত আপত্তি করিসনা বিয়েতে। ‘
বলতে বলতেই জোহরা খাতুন ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আফরা পরোটা খানা টেবিলে রেখে বললো,

‘মা দয়া করে কেঁদে কেঁদে আমার মন নরম করার মোটেই চেষ্টা করবে না।’

তিতলি রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে উঁকি দিলো। আফরার সেদিকে চোখ পড়তেই সে দৌড়ে আবারও রান্নাঘরে ঢুকে পড়লো। এই মেয়েটি তাদের সবার থেকে এভাবে আড়ালে থাকে কেন আফরা বুঝে না তবে সে সারাক্ষণই তাদের থেকে লুকিয়ে বেড়ায়।
আফরা টেবিল ছেড়ে উঠে পড়তেই দেখলো সিঁড়ি বেয়ে আরহান নেমে আসছে। আফরা আর না দাঁড়িয়ে আরহানের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
জোহরা খাতুনের চোখে জল দেখে আরহান ধারণা করে নিলো এতক্ষণ এখানে কী হয়েছে। আরহান কিছু না বলে চুপচাপ টেবিলে বসে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ পর বললো,

‘মা কাঁদাকাটি করে কী হবে বলো তো! আর তুমি সারাক্ষণ এভাবে বিয়ে বিয়ে না করলেও পারো। মেয়েটার বয়স বাইশে এসেছে সবেমাত্র বিয়ে করার এখনো অনেক সময় আছে। ‘

জোহরা খাতুন চোখ মুছে টেবিল থেকে উঠতে নিলে আরহান বাঁধা দিয়ে বললো,

‘মা আরেকটি কথা শুনো, একটা টিউশনি পেয়েছি। ভাবছি কাল থেকে যাবো। বিকেলে সময় পেলে আজকেও যেতে পারি।’

জোহরা খাতুন ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকালেন।

‘এতোকিছু কখন হলো?’

‘গতকালকে। ‘

জোহরা খাতুন ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস নিক্ষেপ করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।

.
তিতলি এতক্ষণে দরজার আড়ালে লুকিয়ে তাদের কথা শুনছিল। জোহরা খাতুনকে দেখতেই সরে পড়লো। রান্নাঘরে ঢুকে জোহরা খাতুন তিতলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে কর্কশ গলায় বলে উঠলেন,

‘এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন! কাজগুলো কী ভূতে এসে করে দিয়ে যাবে? ‘

তিতলি কিছু বললো না সে মনে মনে ভাবলো যদি সত্যিই তার কাজগুলো কোনো ভূত এসে করে দিয়ে যেতো তাহলে মন্দ হতো না। কিন্তু, ছোটকালে সে তার মায়ের কাছে গল্পে শুনেছিল ভূতেরা মানুষের ঘাড় মটকে খায়। তাহলে এরা নিশ্চয় তার কোনো সাহায্য করবে না। করলেও করতে পারে। কারণ মানুষের মাঝে যেমন ভালো খারাপ দু’ধরনের মানুষ আছে তাহলে নিশ্চয় ভূতের মাঝে ভালো খারাপ আছে। এক দল হলো ভালো ভূত আরেক দল হলো খারাপ ভূত। ইশ! তিতলি যদি ভালো ভূতের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারতো তাহলে তার সব কাজ সেই ভূতকে দিয়ে করিয়ে নিতো। মাঝে মাঝে সেও করতো। সব কাজ ভূতকে দিয়ে করালে ভূত কষ্ট পেতে পারে। কেউ কষ্ট পাক তিতলি তা চায় না। জোহরা খাতুনের ডাকে তিতলি ভাবনা জগত থেকে বেরিয়ে এলো,

‘এভাবে দাঁড়িয়ে কী আকাশ পাতাল ভাবছিস। যা টেবিলের উপর খাবার রেখে আসছি খেয়ে নে।’

জোহরা খাতুন এবারেও পূর্বের স্বরে কথা বললেন।
তিতলি এক পা দুই পা করে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো। আরহান ততক্ষণে চলে গিয়েছে। তিতিলি চেয়ারে উঠে বসলো। টেবিলের এক কোনায় দেখলো লাউয়ের তরকারি পড়ে আছে যা জোহরা খাতুন সকালেই রান্না করেছিলেন। তিতলির লাউ অনেক পছন্দ। সে গপাগপ করে মিনিটের মধ্যেই সবগুলো তরকারি খেয়ে নিলো। জোহরা নামের মানুষটিকে তিতলির বেশ ভালো লাগে। মানুষটি খিটখিটে মেজাজের হলেও তার মনটা যে নরম তা তিতলি আন্দাজ করতে পারে। তবে বাহিরের দিক থেকে খিটখিটে হলেও তিনি তার ছেলেমেয়েদের সাথে কখনো উঁচু গলায় কথা বলেননি। তিনি যে তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত তা তিতলি বুঝতে পারে। সেই সাথে তিতলি এটাও জানে আফরা কেন বারবার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। কিছুদিন আগে তিতলি দরজার বাইরে থেকে শুনেছিল আফরা কার সাথে যেন কথা বলছিল। তিতলি বুঝতে পেরেছিল যার সাথে কথা বলেছে মানুষটি ছেলে। এর পিছনের ঘটনা তদন্ত করার তিতলির খুব ইচ্ছা। তিতলির খুব ইচ্ছা ছিল সে বড়ো হয়ে পুলিশ হবে কিন্তু, ভাগ্য তার সহায়ক ছিল না। গরিবদের বুঝি কখনো শখ করতে নেই! আসলেই গরিবদের শখ আহ্লাদ শোভা পায় না। তিতলি শ্বাসের সাথে হতাশা নিক্ষেপ করলো।

আরহান বটতলী এসে দাঁড়াল। তার পিছনে মস্ত বড়ো এক বটগাছ। এই গাছের কারণেই সম্ভবত এ জায়গার নাম বটতলী রাখা হয়েছে আবার অন্য কারণেও হতে পারে আরহান ঠিক জানে না। মোবাইলটা বের করে আরহান একবার সময়টা দেখে নিলো। চারটে বাজতে খুব একটা বেশি নেয়। আরহান আজ পড়াতে যাওয়ার মনস্থির করলো। চীতল সকালে সেই ভদ্র মহিলার সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছিল। ভদ্র মহিলার বোনের ছেলেকে পড়াতে হবে।
আরহান হাঁটতে লাগলো। ভদ্র মহিলার ঘরে পৌঁছাতে তার সময় লাগলো পনেরো মিনিটের মতো। বেল বাজাতেই একটি কমবয়সী মেয়ে দরজা খুলে দিলো। আরহান বাইরে থেকে ঘরে একটু উঁকি দিয়ে দেখলো। মেয়েটি একপলক আরহানের দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় ডাক দিলো,

‘খালাম্মা কে আইসে দেখেন। ‘

রুম দেখে এক মহিলা বের হয়ে এলেন। ফর্সা গায়ের রঙ,কোঁকড়ানো চুল। মোটা দেহের অধিকারী হওয়ায় আস্তে আস্তে হেঁটে আরহানের দিকে এগিয়ে এলেন।

‘আরহান না তোমার নাম? ‘

‘জ্বি। ‘
আরহান সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে জবাব দিলো।

‘ঘরে এসো।’

আরহান জুতা খুলে ঘরে প্রবেশ করলো। এদিক ওদিক তাকিয়ে পুরো ঘরটা একবার দেখলো। বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ভেতর আসলে বোঝা যায় ঘরটা বেশ ঘর। এই রুমে বড়ো বড়ো চারটি সোফা সুসজ্জিতভাবে সাজানো আছে। মাথার উপর বিশাল বড়ো ঝাড়বাতি, যা পুরো ঘরে হলুদ আলো ছড়াচ্ছে। আরহানের পিছন থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। ফিরে তাকাতেই দেখলো ছোট একটি ছেলে। গায়ের রঙ ফর্সা, মাথায় ব্রাউন রঙের ছোট ছোট চুল। চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন ধূসর রঙের চোখের মনি থেকে আলো ঠিকরে বেড়িয়ে এসে পড়ছে। চেহারায় দেখে যে কেউ নিসন্দেহে বলতে পারবে ছেলেটি বাংলাদেশী নয়। এটিই সম্ভবত ভদ্র মহিলার বোনের ছেলে। ছোট ছেলেটি আরহানের দিকে তাকাতেই আরহান মিষ্টি হাসি বিনিময় করলো তার বিপরীতে ছোট ছেলেটি ‘থ’ মেরেই আরহানের দিকে তাকিয়ে রইল।

‘নাম কী তোমার? ‘

আরহান প্রশ্ন করলো।

‘আ’ম অর্ক। হু আর ইউ?’
ছেলেটির ভাষায় বিদেশীদের মতো উচ্চারণভঙ্গী স্পষ্ট লক্ষ করা যায়। ভদ্র মহিলাটি এগিয়ে আসলেন। আরহান অনেক আগেই জেনেছে ভদ্র মহিলাটির নাম সাফরিনা জুলিয়াৎ। তাই ভদ্র মহিলাটিকে তার ডাক নাম অর্থাৎ সাফরিনা নামেই ডাকা যায়।

‘সে লন্ডন থেকে এসেছে এক মাস হলো। বাংলা কথা এখানে বলতে শেখেনি তবে আমরা খুব শীঘ্রই তাকে বাংলায় পারদর্শী করে তুলবো। ‘

সাফরিনা জুলিয়াৎ কথাটি বলে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। তিনি ভেবেছিলেন সবাই তার কথায় হাসবে কিন্তু রুমে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ব্যতিত অন্য কারো মুখে হাসির আভাসও পাওয়া গেলো না। তিনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাসি বন্ধ করে আরহানের উদ্দেশ্য কিছু একটা বলতে চাইলেন। কিন্তু তার আগেই দরজা খোলার শব্দে তিনি দরজার দিকে ফিরে তাকালেন। তাকাল আরহানও। ছিপছিপে গড়নের একটি মেয়ে প্রবেশ করলো। সোনালী রঙের চুলগুলো কাঁধ পছন্দ ছড়িয়ে রয়েছে। চোখগুলো ধূসর রঙের। গায়ের রঙটা একটু চাপা। সাফরিনা জুলিয়াৎ হনহন করে এগিয়ে গেলেন,

‘এইতো সেই ছেলেটি যাকে অর্কের জন্য ঠিক করেছিলাম।’

মেয়েটি মুখে চওড়া একটি হাসি দিয়ে বললো,

‘হাই আ’ম রেইন। অর্কের মা।’

মেয়েটি ভাঙা ভাঙা গলায় বাংলা বললো। বুঝা গেল সেও বাংলায় পারদর্শী না। ছেলেটির মা বলতে এতক্ষণ আরহানের মস্তিষ্কে যে চেহারাটি ভাসছিল মেয়েটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। দেখে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব নয় সে এক সন্তানের মা।
(চলবে)

গল্প পাবেন রবিবার ও বুধবার।

কেউ কপি করবেন না তবে চাইলে শেয়ার করতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top