শেষ শ্রাবণে বৃষ্টিবন্দি // মারিয়া নূর

শেষ শ্রাবণে বৃষ্টিবন্দি

শেষ শ্রাবণে বৃষ্টিবন্দি // মারিয়া নূর

৩.
বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন ইকরাম হোসেন,হাতে জলন্ত সিগারেট। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো বাতাসের মিশে যাচ্ছে। ইকরাম হোসেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলেন রুমে জোহরা খাতুন এসেছেন কিনা। তিনি জোহরা খাতুনকে বলেছিলেন দশটা বাজে রুমে আসতে জরুরি কথা আছে। কিন্তু, এখন এগারোটা পনেরো বাজতে চললো অথচ তার কোনো দেখা নাই। জোহরা খাতুন সময়ের প্রতি ভীষণ বেখেয়ালি। কোনো কাজ সময়মতো করতে পারেন না। আজও এমনটা হয়েছে আর নাহয় তিনি ভুলে গিয়েছেন আসার কথা। ইদানিং জোহরা খাতুন সবকিছু ভুলে যান। গতকাল ইকরাম হোসেন গোসল করতে যাওয়ার আগে জোহরা খাতুনকে বলে গিয়েছিলেন শার্টটা ইস্ত্রি করে রাখতে। কিন্তু, এসে দেখলেন শার্ট একজায়গায় পড়ে রয়েছে আর জোহরা খাতুন বারান্দায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছেন। আবার দুপুর বেলা তিনি জোহরা খাতুনকে বললেন এক গ্লাস পানি আনতে। জোহরা খাতুন অবশ্যই রান্নাঘরে গিয়েছিল কিন্তু, দশমিনিট পর ফেরত এলেন হাতে একটা লবনের বাটি নিয়ে।
দরজায় টোকা পড়লো। ইকরাম হোসেন হাতের সিগারেটটা নিচে ফেলে রুমে প্রবেশ করলেন। তিনি ভেবেছিলেন জোহরা খাতুন এসেছে কিন্তু না, তিতলি চা নিয়ে এসেছে। তিতলি তাদের বাসায় দুই বছর যাবত কাজ করছে। বয়স চোদ্দ কিংবা পনেরো। তিতলির আসল নাম কমলা। কমলা নামটা ইকরাম হোসেনের মোটেই পছন্দ হয়নি তাই তিনিই তাকে এ নাম দিয়েছিলেন, তিতলি! তিতলি যখন তাদের বাসায় এসেছিল তখন তার গায়ের রঙ ছিল সম্পূর্ণ কালো এখন গায়ের রঙ কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। ইকরাম হোসেনের থেকে মেয়েটাকে ভীষণ ভালো লাগে। কেমন শান্ত চাহনি, ভদ্র কথাবার্তা সবমিলিয়ে মেয়েটা ইকরাম হোসেনের মন্দ মনে হয় না।
তিতলি চায়ের কাপ টেবিলের উপর রেখে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। ইকরাম হোসেন ভেবেছিলেন তিতলিকে বলবেন জোহরা খাতুনকে একটু ডেকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিতলি এতোটাই দ্রুত চলে গেল যে তিনি সে সুযোগটা পেলেন না। টেবিলের উপর থেকে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আবারও বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। এ কয়েকদিন তার চা খাওয়ার অভ্যাসটা অনেক বেড়েছে। দিনে চার থেকে পাঁচ কাপ চা একাই খেয়ে ফেলেন তাও যেন তিনি চা খেয়ে তৃপ্তি পান না। ইকরাম হোসেন ঘড়িতে আরেকবার চোখ বুলালেন। ঘড়ি কাটা এতক্ষণে ত্রিশ এ এসে পৌঁছে গিয়েছে। তার মেজাজটা এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। ইকরাম হোসেন রুম থেকে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন কিন্তু, পিছু ফিরলেন না। তিনি জানেন এটা জোহরা খাতুন। তাদের ত্রিশ বছরের সংসার জীবনে তারা একে অপরের পায়ের শব্দের সাথে পরিচিত।
জোহরা খাতুন ইকরাম হোসেনের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

‘কিছু বলবে বলেছিলে না!’

ইকরাম হোসেনের জরুরি কথা বলার ইচ্ছাটা এমুহূর্তে চলে গিয়েছে। আর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করাটা ইকরাম হোসেন পছন্দ করেন না।
‘না,কিছু বলবো না। ‘

‘তাহলে দশটা বাজে আসতে বলেছিলে কেন?’

‘তারমানে তোমার মনে ছিল যে আমি দশটা বাজে আসতে বলেছিলাম। ‘

‘মনে ছিল কিন্তু, সময় হয়নি।’

ইকরাম হোসেন আর কথা বাড়ালেন না, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

‘চা কে বানিয়ে দিলো তোমাকে? ‘

‘তিতলি’

‘মেয়েটার চা অত্যন্ত বাজে হয় তুমি দিনে চার পাঁচবার কীভাবে যে এই চা খাও!’

জোহরা খাতুন তিতলিকে দেখতে পারেন না।তিতলির সাথে তার কী সমস্যা সেটা ইকরাম হোসেন বুঝে উঠতে পারেন না তবে তিতলির সব কাজে ভুল ধরা জোহরা খাতুনের নিত্যদিনের অভ্যাস।

‘তুমি আমাকে কী বলার জন্য ডেকেছিলে এখানো বললে না।’

‘এখন বলার ইচ্ছে নাই জোহরা।’

‘কেন? ‘

‘এতো প্রশ্ন করো না। ইচ্ছে নেই যেহেতু বলেছি তারমানে আসলেই ইচ্ছে নেই সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না।’

জোহরা খাতুন মুখ বিকৃত করে উল্টো দিকে হাঁটা ধরলেন। না বললে নেই। আরেকবার বলার জন্য ডাক দিলেও তিনি তখন যাবেন না।

৪.
সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে। আরহান মোবাইলে সময়টা দেখে নিলো। সকাল দশটা। এখন তার উঠে যাওয়া উচিত। আরহান ঘরের স্যান্ডেল পরে বাথরুমে দিকে এগিয়ে গেলো। বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে তারপর বাথরুম থেকে বের হলো।
আরহান পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করলো। ব্যাগে আছে একশত টাকা। একশত টাকা দিয়ে তার বড়োজোর একদিন চলবে। কয়েকদিন হয়েছে তার বাবা তাকে টাকা দিতে কার্পণ্য করেন,বারবার প্রশ্ন করেন টাকা কেন লাগবে। এমন করার পিছনের কারণটা অবশ্যই আরহানের জানা আছে। তিনি ভাবেন এমনটা করলে আরহান টাকার জন্য হলেও বাধ্য হয়ে ব্যবসার দায়িত্ব কাঁধে নিবে। কিন্তু আরহান বহুবার বহুরকমে ইকরাম হোসেনকে স্পষ্ট বুঝিয়েন সে ব্যবসা করতে চায় না। আরহান সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে টিউশন করাবে। সিদ্ধান্তটা সে গতকালই নিয়েছে। টাকা ছাড়া তার দিন চালানোটা ভীষণ কষ্টকর। আর এই টাকার জন্যই তার টিউশন করতে হবে এছাড়া টাকা ইনকাম করার অন্য কোনো পথ আরহানের মাথায় আসছেনা। তার বাবা-মা মূলত কী চায় তা সে বুঝতে পারেনা। তারা চায় সে কাজ করুক। কিন্তু তাকে কাজ করতে দেখলে তারাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে পাছে সে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। আরহান মেধা শ্রম ভিত্তিক কাজ করতে বেশি পছন্দ করে যদিও এটি ঠিক যে সব ধরনের শ্রমেই কষ্ট আছে। আমরা জানি শ্রম দুই ধরনের যথাঃ মেধা শ্রম ও কায়িক শ্রম। তবে আরহানের দৃষ্টিতে শ্রম তিন প্রকার। মেধা শ্রম, কায়িক শ্রম ও উভয় শ্রম। উভয় শ্রমের সে নিজস্ব একটা সংজ্ঞাও তৈরি করেছে, যে শ্রম মেধা শ্রম ও কায়িক শ্রম দুটির সমন্বয়ে গঠিত তাকে বলা হয় উভয় শ্রম। এর উদাহরণ হলো ছাত্র পড়ানো। আরহান আজ থেকে তিনবছর আগে একটি ছাত্র পড়াতো। ছাত্রের নাম ছিল টিটু। তাকে যখন পড়ানোর সময় হতো তখনই সে পুরো ঘরে দৌড়াদৌড়ি করতো,সোফার পিছনে লুকিয়ে থাকতো,বাথরুম গিয়ে দিন শেষ করে দিতো। আর এই ছাত্রের পিছনে আরহানের থেকেও সারাদিন দৌড়াতে হতো পুরো ঘরময়। আর এতে তার মেধা শ্রম ও কায়িক শ্রম উভয় অপচয় হতো। মূলত এ ছাত্র পড়াতে গিয়েই সে এই শ্রম আবিস্কার করে। আরহানের ভেবে দেখলো সে শ্রম নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে এসেছে তাই আপাতত সে এই চিন্তা বাদ দিলো। কিছুদিন আগে তার এক বন্ধু তাকে একটা টিউশনির কথা বলেছিল। এখন টিউশনিটা আছে কিনা জিজ্ঞেস করতে হবে। আরহান ভাবলো এমুহূর্তে কল দিয়ে টিউশনির কথা জিজ্ঞেস করলে মন্দ হয় না। আরহান তার মোবাইল খুঁজে নাম্বারটা বের করলো। নাম্বারটা সেভ করা চীতল নাম দিয়ে। এই অদ্ভুত নামটার অর্থ কী আরহান জানে না। চীতলকে একবার জিনিস করেছিল তখন সে বলেছিল সেও জানেনা। এই নামের অর্থ সম্ভবত চীতলের বাবা-মা জানবে আবার এমনটাও হতে পারে যে তারাও এই নামের অর্থ জানে না। অনেকে আবার নামের অর্থ ছাড়াই কোনো ঘটনার উপর ভিত্তি করে নাম রাখে। যেমন তার এক বান্ধবীর ঘটনাটা বলা যায়। সে যেদিন জন্ম হয় সেদিন তাদের ঘরের চালের উপর একটা পাখি সারাদিন বসে ছিল তাই তার উপর ভিত্তি করে তার নাম রাখা হয় পাখি। আবার এমন একটা ঘটনা আরহানের পরিবারের মধ্যেও আছে
আরহানের মা একবার বলেছিল তিনি যখন জন্ম হোন তখন জোহরের আজান দিচ্ছিল। সবাই নামাজ পড়তে যাবেন ঠিক সে সময় তিনি পৃথিবীতে আসেন একারণে তার নামকরণ করা হয় জোহরা। সেই হিসেবে দেখা গেলে চীতলের জন্ম হওয়ার সময় নিশ্চয় চীতলের মা চিতল মাছ খেতে বসেছিলেন একারণে তার নাম রাখা হয় চীতল। তবে আরহানের কাছে নামটা উদ্ভট মনে হয় কারণ চীতলের সাথে তার নামটা যায় না। চীতল নামটা মুখে নিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠে হ্যাংলা পাতলা,খাটো কোনো লোকের চেহারা। যার মেজাজ হবে খিটখিটে এবং তার সামনের দাঁত দুটো বেরিয়ে থাকবে। তবে চীতল সম্পূর্ণ এর বিপরীত। সে সুঠাম দেহের অধিকারী এবং সুদর্শন বটে। তাই আরহানের মনে হয় তার জন্য পাত্রী খুঁজতে গেলে মেয়ে নিশ্চয় তার নাম শুনেই তার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে নিবে। আরহানের মাথায় এলো এমুহূর্তে তার বোন তার সামনে থাকলে নিশ্চয় বলতো, নাম দিয়ে কাউকে বিচার করা মোটেই ঠিক না ভাই!
আরহানের মস্তিষ্ক নাড়া দিলো। সে আবারও নাম নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে এসেছে। আরহান চীতলকে কল দিলো। রিং বাজছে। আরহান আকাশের দিকে তাকালো। মেঘগুলো সরে গিয়েছে এবার সূর্যটা পুরো দেখা যাচ্ছে।
(চলবে)

কেউ কপি করবেন না তবে চাইলে শেয়ার করতে পারেন।

স্টিকার ইমোজি কমেন্ট করবেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top