শোগাৎসু – পর্ব-২ – শম্পা সাহা

 [post-views]

সেদিনটা আজও মনে করতে পারে আকি । সকাল থেকেই সারা গ্রামে যেন ঘন অবসাদ, চাপচাপ! প্রতিমুহূর্তে গত কয়েকদিন ধরেই বেতারে বর্ষিত হচ্ছে জেনারেল তোজোর অগ্নিগর্ভ ভাষণ। খবরের কাগজে প্রচার, কিভাবে মিত্রশক্তি ধ্বংস করতে চাইছে জাপানের আত্মসম্মান তীব্র ঔপনিবেশিক মানসিকতায়!
 
  ঠিক সকাল এগারোটা, একটা সামরিক ট্রাক এসে থামল শিরাকাওয়াতে। তখন বরফ পড়া শুরু হয়েছে, আকাশে সূর্যের মুখ দেখা যায় না। ঘন কুয়াশা যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতো ভেজাতে লাগলো সারা পৃথিবী! গ্রামের পথ, ঘাট, ধানক্ষেত, সব নদী নালা, সোনালী আল্পস, সুন্দর গোলাপী চেরি ফুলেরা যার মাথায় সাদা তুলোর মতো বরফ, ছেড়ে কিশি চলল যুদ্ধে। দাই আর আই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে, 
 
  “বাবা, কবে ফিরবে ?”, কবে ফিরবে তা কি কিশি নিজেও জানে !তবে দুই ভাইবোন আজকে বাবার গলা ধরে ঝুলতে পারছে না, আজ তাদের প্রিয় বাবা আর কিমোনো পরে নেই ,আজ যে তাদের বাবার গায়ে জলপাই রঙের সামরিক পোশাক, লাগেজও রেডি। ঘন ঘন ট্রাক থেকে হুইশল দিচ্ছে। বাক্স, প্যাঁটরা উঠোনে রেখে কিশি গিয়ে দাঁড়ালো আকির সামনে। 
 
    আকি কোনো কথা বলতে পারলো না। কে ভেবেছিল এ দিন আসবে?কে ভেবেছিল পৃথিবী এমন ভাবে তোলপাড় হবে ? কে ভেবেছিল এভাবে তার সুখের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যাবে? কিশি আকির মুখ নিজের দিকে ফেরায়, সারারাত কেঁদে কেঁদে  বেচারী চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। বাচ্চারা ঘুরঘুর করছে তাদের দাদুর কাছে । ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে, এক সৈনিক হাক দেয়, “একটু তাড়াতাড়ি”। 
 
   কিশি একটা গভীর চুমু আঁকে আকির কপালে। আকি চেপে ধরে কিশিকে, ছাড়বে না ,ছাড়তে পারবে না, কিছুতেই না! কিভাবে ছাড়বে ওকে? ওকে ছাড়া যে আকি অসম্পূর্ণ!জোর করে আকির হাত ছাড়িয়ে চলে যায় কিশি। বাইরে ভারী গাড়ি স্টার্ট হাওয়ার আওয়াজ। আকি ভেঙে পড়ে কান্নায় ! ছোট্ট দাই আর আই দাদু কে প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে, “বাবা কবে ফিরবে, দাদু? “, বৃদ্ধ কি বলবে ,সে নিজেই জানেনা যে তার ছেলে কবে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কি না?
 
   এরপর যুদ্ধের খবর যা আসতে লাগল তা মোটেই আশাপ্রদ নয়। ক্রমশ মিত্র শক্তির হাতে অক্ষশক্তির পরাজয়, একের পর এক । এখন আর গোরো মাঠে যেতে পারে না । দাই, আই আর আকি তিন জন কোনো রকমে ফসলটুকু তোলার চেষ্টা করে । তবে তাওবা কতটুকু? যুদ্ধের বাজার একেবারে আগুন! কোনরকমে  আধপেটা  খেয়ে দিন গুজরান, জুকেরি এদিক-ওদিক মেরামতের অভাবে জল পড়ে, বরফ গলে গলে। ছেলেমেয়েগুলোর শীতের পোশাক শতছিন্ন। চাষের জমি বরফে ঢাকা। কে সরাবে বরফ?  তার মধ্যে জানা গেল হিরোশিমা নাগাসাকি পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ! উফ কী বিভৎস সে খবর ! কান্নার রোল উঠল জাপানের ঘরে ঘরে! যে দু একটা খবরের কাগজ আসতো তাতে দেশবাসীর ছবি দেখে ডুকরে কেঁদে উঠত আকির মন! ভাত রাঁধতে গিয়ে ভাত পুড়িয়ে ফেলতো, সুপে নুন কম! ছেলে মেয়েরা যেন কেমন অভাগা, অনাথ ! গোরো আরও বৃদ্ধ হয়ে, ধু্ঁকতে থাকে মৃত্যুর অপেক্ষায় । এই এক চিত্র সারা গ্রামময়।শুধু বৈধব্যের কান্নার রোল, স্বজন হারানোর হাহাকার ,আর অনাথ সন্তানের সারি। কিন্তু দিন থেমে থাকে না সে চলে আপন খেয়ালে।
 
  ছেলে মেয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে ।এখন দাই মাঠের দেখভাল করে ,সে আঠাশ বছরের প্রায় যুবক । আইও বাইশ, দাদার  কাজে সাহায্য করে সেও। বৃদ্ধ গোরো মারা গেছেন বহু দিন । তবে আকি কিন্তু আশা ছাড়েনি কিশির। ও জানে কিশি ওর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, 
 
   “ওয়াতাশি ওয়া,আনাতো  ও আসতেই মাসু। মোদোত্তে কিমাসু। ওয়াতাশি ও মাত্তেতে কুদাসাই”, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি ফিরে আসবো। অপেক্ষা করো আমার জন্য “
কিন্তু আর কতদিন, কত দীর্ঘ এ অপেক্ষা!
 
 
 গত দীর্ঘ তেইশ বছরের অপেক্ষা! তার মধ্যে বদল এসেছে অনেক! আজ চুলে রুপোলী রেখা, অযত্নে শরীর ক্লান্ত বিধ্বস্ত ! আকি তবু প্রতি রাতে খোলা আকাশের নিচে বসে কিছুক্ষণের জন্য, বসন্তের হাওয়ায় চেরি ফুলের মিষ্টি গন্ধে।দু-একটা পাপড়ি উড়ে এসে পড়ে আকির মাথায়, যেন মনে হয় কিশি তার আদরের স্পর্শ পাঠিয়েছে এই পাপড়ির সঙ্গে! প্রচণ্ড শীতের রাতে যখন সবাই কম্বলের তলায় ,পাত্রে আগুন জ্বেলে গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন ও ছোট্ট জানালার ফাঁকে আঙুলে স্পর্শ করে সেই গুঁড়ো বরফ, কি জানি কিশি, তার প্রিয় কিশি কি অবস্থায় আছে? যে যাই বলুক ও কোনোদিনই মানবে না কিশি  নেই ,ও অপেক্ষা করে যাবে আজীবন ।
 
    ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে জাপান নিজের মেরুদন্ড শক্ত করতে উদ্যোগী । প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সবকিছুতে জাপান দূরত্ব গতি ধরে ফেলেছে। যে কোনো মূল্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপমানের শোধ নিতেই হবে। আর হিরোশিমা-নাগাসাকির ক্ষতি তা কি আগামী একশো বছরেও জাপান পারবে পূরণ করতে ?
 
   দাই এর পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ে ওদের অবস্থা এখন বেশ ভালো। জুকেরি একেবারে পাকাপোক্ত ,গোলাভরা ধান । এখন প্রায়ই সুশি, টেমপান, ইয়াকিতোরি রান্নার বায়না করে দাই আর আই। সন্তানদের বায়না  কি করে ফেলে? যত্নে  রেঁধে দেয়, ওদের তৃপ্তি ভরা মুখ দেখে খুশিতে  চোখ ছল ছল করে ওঠে,ইস যদি কিশিটা থাকতো ,দীর্ঘশ্বাস পরে আকির!
 
    ছেলে মেয়েরা সব বোঝে ,এখন আর ওদের রাইস বল আর মিলে সুপ খেয়ে থাকতে হয় না । আকিকে আর শতছিন্ন কিমনো তালি দিয়ে পড়ে দিন কাটাতে হয় না। তবে কিশির যাবার পর আর কোনো দিনও আকি নতুন বছরের উৎসব শোগোৎসুতে অংশগ্রহণ করেনি । ও কিশি আর নিজের জন্য এক জোড়া কিমোনো নিজের হাতে বানিয়েছে ,যদি কোনদিন কিশি ফেরে দুজনে ওই পোশাকে প্যাগোডাতে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের চরণে ড্যানডেলিওন আর উকুই ফুলের ভেট চড়াবে না হলে যেন ওর সমাধিতেই ওরা এই দুটো দিয়ে দেয়।
 
 
ক্রমশঃ
শম্পা সাহা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top