শোয়াটাই কি সব? শম্পা সাহা

#শোয়া_টাই_কি_সব?
#শম্পা_সাহা

বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগেই যখন বড় বোন তেরো আর ছোটোটা দশ।মিনু কাকিমা হাসপাতালের আয়া।নাইট ডিউটি, ডে ডিউটি আর মেয়েরা ফুল গেঁথে সংসার চলেছে ওই না চললে নয় তাই।

পুরোনো ভাড়ার বাড়ি,ভাড়া বাড়তে বাড়তে সেই আড়াইশোতে এসে ঠেকেছে।তারপর বাড়িওয়ালা কেস ঠোকে।তাই ভাড়া এখন জমা পড়ে রেন্ট কন্ট্রোল অফিসে।বাড়ির নয় ঘর ভাড়াটের মধ‍্যে সবাই নিজের নিজের ব‍্যবস্থা করে উঠে গেছে।মাত্র দুই ঘরই বাকি ,সোনাদিরা আর নীলু মাসীরা।নীলু মাসী একা মানুষ দুচার বাড়ি কাজ করে।আর সোনা মনারা এখন বড় হওয়াতে ওরাও পাশের ব‍্যাগ কারখানায় ঢুকেছে।

বাড়িওয়ালা কবেই এ বাড়ি প্রোমোটারের হাতে দিয়ে দিত কিন্তু অনেকগুলো শরিক বলে কেউই শেষ পর্যন্ত রাজী হয়নি।তাই এখনো মাথা গোঁজার জায়গাটুকু ওদের আছে।

মিনু কাকিমা যখন সোনাদির বয়স পার হয়ে যায় তখন বড় মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতেই পারেনি।ভাববে কি যাদের পরণের পোশাক আর পেটের ভাত জোটাতেই নাভিশ্বাস ওঠে তাদের আবার বিয়ে,আবার ঘর সংসার!সোনাদি কিন্তু দেখতে খারাপ ছিল না কালোকোলো গোলগাল।এত কষ্টের মধ্যেও কেমন একটা লাবন্য ঘিরে রাখতো ওর মুখের চারিপাশ।

পাড়ার দুয়েকটা ছেলে একটু প্রেম ট্রেম করতে চেয়েছিল কিন্তু সোনাদি পাত্তা দেয়নি।সোনাদি জানে গরীবের কালো মেয়ের বিয়ে হয় না তার উপরে আবার ওদের মত হত দরিদ্রের।এছাড়া সোনাদি মিনু কাকিমার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসার টেনেছে।কাকিমা যখন হাসপাতালে তখন রাস্তার কল থেকে জল তোলা,বাজার করা ,রান্না করা এমনকি বোনকে ঠিক সময়ে রেঁধে বেড়ে খাইয়ে স্কুলেও পাঠিয়েছে।

সোনাদির পড়াশোনা সিক্স পর্যন্ত।তবে মনাদির যেন পড়াশোনা হয় এটা প্রাণপন সবাই চেয়েছিল।কিন্তু মনাদির যে কিছুতেই পড়তে ভালো লাগে না।তাই ঠেনেটুনে এইট পাশ।তখন এইট পাশ মানেই পড়ালেখা জানা।তখনো পড়াশোনা এতটা খেলো হয়ে যায়নি।

এইটটা কোনোরকমে পাশ করে মনাদি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল।সেও যাবে ব‍্যাগ কারখানায়, সেও রোজগার করবে,সেও মা দিদির পাশে দাঁড়াবে।

পাড়ায় সবাই মিনু কাকিমা আর সোনাদি, মনাদিকে দজ্জাল বলতো,বলতো ঝগরুটে।ওরা তিনজন মেয়ে থাকতো।কোনো আত্মীয় স্বজনকেও কখনো আসতে দেখিনি।তখন ভাবতাম ওরা সত‍্যিই ঝগরুটে এখন ভাবি ,না ,ওরাও আর সবার মতই ছিল।তবে নিজেদের বাঁচাতে ওই ঝগরুটে ওদের হতে হয়েছিল।এমনকি কারোর সঙ্গে মারামারি করতেও ওরা দুইবোন পিছপা নয়।কিন্তু এমনিতে খুব ভালো, মিশুকে, হাসিখুশী, পরিশ্রমী।

যখন সোনাদির বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে ,ভারী গিন্নীদের মত চেহারা হঠাৎই সোনাদি আর মিনুকাকিমা দুজনেরই ইচ্ছে হল মনাদির বিয়ে দেবার।মা আর বড় মেয়ে কারোরই তো সংসার করা হয়ে ওঠেনি ঠিকঠাক।তাই মনাদির জন্য ওরা সংসার খুঁজতে চেয়েছে।ততদিনে তিনজনে মিলে বেশ কিছু টাকাও জমিয়ে ফেলেছে।

মনাদিও কালো ,গোলগাল,কিন্তু ওদের দুইবোনের চেহারাতেই কি যেন আছে,বেশ ভালো লাগে।তবে ওই যে কালো!বেশ খুঁজে পেতে এক পাত্র পাওয়া গেল ।সব একেবারে মাপেমাপ খাপেখাপ।যেমন বয়স,তেমন চেহারা, রোজগারও মন্দ নয়।যেদিন বিয়ের পাকা কথা হলো মিনু কাকিমা আমাদের সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিল।সবাইকে মানে পাশাপাশি সাত আট ঘর।যারা ওই এক কলপাড়ে জল তুলতো।

বিয়েও হয়ে গেল,আমরা নেমন্তন্ন খেলুম,মনাদি খুব কেঁদেটেদে চোখের কাজল ধেবড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল।সোনাদি মন খারাপ করে এক সপ্তাহ কারখানা থেকে ছুটি নিল।আর মিনু কাকিমা তো রোগাই হয়ে গেল।

মাস দুয়েক পর সবাই খুব ছিছিক্কার করছে!কি?না মনাদি শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছে।আর নিয়ে এসেছে কে?সোনাদি আর মিনু কাকিমা নিজে।

তখন বড়রা চাপা গলায় ফিসফিস করে বলেছিল অনেক কিছু ,কিন্তু তখন বুঝিনি।মনাদি আর শ্বশুরবাড়ি যায়নি । তবে ও যেতে চেয়েছিল, এতো টাকা খরচ করে বিয়ে দিলে,লোকে কি বলবে এসব ভেবেটেবে।কিন্তু মিনু কাকিমা বা সোনাদি কেউ রাজী হয়নি।

পরে বড় হয়ে মায়ের কাছে শুনি।মনাদির বর নাকি শারীরিক ভাবে অক্ষম।বৌভাতের পর কয়েকরাত তো মনাদি কে এড়িয়ে এড়িয়ে চলেছে।পরে সোনাদি দ্বিরাগমনে আসলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করে সব জানতে পারে।

কাকিমা আর সোনাদি প্রথমে মনাদি কে দিয়ে জামাইকে ডাক্তার দেখাতে বলে,তাতে জামাই রাজী না হওয়ায় ওরা শাশুড়ি আর বড় শালী দুজনেই কথা বলে এ বিষয়ে জামাইয়ের সঙ্গে।তাতে উল্টে জামাই আর তার বাড়ির লোকেরা মনাদিকেই দশকথা শুনিয়ে দেয়।

এসব জানতে পেরে মিনু কাকিমা আর সোনাদি গিয়ে নিজেরাই ব‍্যাগ গুছিয়ে ছোট মেয়েকে নিয়ে আসে এই বলে,
“শুতেই যখন পাবি না তো এদের বাড়ির ঝি হবার জন‍্য পড়ে থাকবি নাকি?বাড়ি চল।খেটে খাবি তাও ভালো।লোকের বাড়ি বিনি মাইনের চাকর হবার জন্য এসেছিস নাকি?”

ছেলের মাকে সোজা জানিয়ে আসে,”পঙ্গু ছেলে বিয়ে দিতে লজ্জা করে না?খেতে পাচ্ছিল না নাকি আমার মেয়ে যে এখানে খাটবে খাবে?”

মনাদির শাশুড়ি মা কি একটা যেন বলতে যাচ্ছিল, মিনু কাকিমা বাজখাই গলায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে এসেছে,”শুতেই যখন পারবে না ,তো ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন কেন?”
তবু একবার মিনমিন করে মনাদির শাশুড়ি বলেছিল,”শোয়াটাই কি সব?”
“শোয়াই যদি সব না হয় তো আপনি বিয়ে করে বাচ্চা দিয়েছেন কেন?ধূপধুনো দিয়ে বরকে পুজো করলেই তো পারতেন!যত্তসব!কই রে আয়!”
বলে গটগট করে মনাদির হাত ধরে টানতে টানতে রিক্সায় ওঠে মিনু কাকিমা।আর পেছন পেছন ঢাউস দুই ব‍্যাগ হাতে সোনাদি!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *