সচেতনতা মূলক ছোটগল্প – বিষণ্ণ বিকেলের মেঘ – রুকাইয়া খাতুন (রিমি)

[post-views]                                     [printfriendly]

==================================

ভোর রাত থকে বৃষ্টি  হচ্ছে। সারারাত  বিদ্যুৎ  ছিল না।  এই  বৃষ্টির মধ্যে  মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাইনি, তাই আজ  ফজরের নামাজ  পরতে দেরি একটু  দেরি  হয়েছে।

নামাজ  শেষ করে পড়তে বসেছি….  একটু পর বাইরে থেকে  বাবার  গলা…. মা নিতু  কি করছো? পরতে  বসেছি  বাবা, জানো  বাবা? আজান শুনতে পাইনি, তাই  ঘুম  থেকে  উঠতে  একটু দেরি হয়েছে।  মাঝে মধ্যে  এ রকম হয়  মা, এটা কোন ব্যাপার  নয় মা, তুমি মন দিয়ে পড়াশুনা কর  এখন। ঠিক আছে বাবা।

           নিতু  মা-বাবার একমাত্র  মেয়ে,  রূপেগুনে,  আচার  ব্যাবহারে অতুলনীয়। এছাড়া নিতু ধার্মিক ও পরর্দাশালী  মেয়েও বটে, তাই   গ্রামের সকলের নয়নের মনি সে।

         এদিকে নিতুর মা  তার পছন্দের নাস্তা   তৈরি করে নিতুকে ডাকছে… মা নিতু নাস্তা  দিয়েছি  টেবিলে, খেতে আয়।
হ্যাঁ মা  আসছি।
মা বাবার একমাত্র  সন্তান নিতু,  তাই ওকে ঘিরেই সব।

সকালের নাস্তা শেষ করে নিতু বারান্দায়  দাড়িয়ে আকাশ দেখছে। এখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি  হচ্ছে । আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন।  আকাশের দিকে তাকিয়ে  নিতু কি যেন একটা ভাবল,তারপর রুমে  এসে আবার পড়তে বসল।

      নিতুর স্বপ্ন সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। মা বাববাও স্বপ্ন  তাদের মেয়ে একদিন অনেক বড় ডাক্তার  হবে। নিতু অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী,  পড়াশোনায় খুবই ভাল। এবার দশম শ্রেণীতে। নিতুদের স্কুল তিন  দিনের জন্য ছুটি, কিসের যেন একটা বন্ধ।

কিন্তু  ওর প্রাইভেট  বন্ধ  নেই।আজ বিকেলবেলা  প্রাইভেট আছে,নিতু নিয়মিত ছাত্রী,  স্কুরে কিংবা  প্রাইভেটে কখনই অনপস্থিত থাকে না ।  অবশ্য  প্রাইভেট  স্কুলেই, বন্ধুরা সবাই একসাথে পড়ে।

          সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার পর বিকেলের দিকে বৃষ্টি  পরা কিছুটা থামল। তবুও বিকেলটা যেন বিষণ্ণ, আকাশটাও মেঘলা। এদিকে প্রাইভেটের সময় হয়ে যাচ্ছে।  নিতু প্রাইভেট এর জন্য তৈরি  হয়ে যাওরার আগে মা কে বলল,  যাচ্ছি  মা। কন্ঠ শুনে বাবা  বলল, ছাতা নিয়েছ? আকাশে মেঘ আছে, বৃষ্টি  আসতে পারে।

নিতে ভুলে গেছি বাবা, মা ছাতাটা হাতে দিয়ে বলল, সাবধানে যাস মা।
         নিতুদের  স্কুল তাদের বাড়ি থকে ১ কিলোমিটার   দূরে, পায়ে হাটাঁ পথ। সারাদিন  বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাট  ভেজা, আজ চারদিকটা কেনজানি একটু বেশি নিরব লাগছে। পঁথঘাটে কোন  জনমানুষ নেই।নিতু দ্রুত  হেঁটে স্কুলে গেল।

গিয়ে দেখে  কেউ নেই। স্কুলটাতে পিনপতন  নিরবতা। একটুপর দপ্তরিচাচা  এসে বলল, নিতু আজ তো স্যার আসবেনা,  স্যারের মা অসুস্থ  হয়েছে। তোমার দুএকজন বান্ধবী  এসেছিল,তারা কিছুক্ষণ  আগে চলে গেছে।

        এদিকে ক্রমশ ঘনকালো মেঘে আকাশটা যাচ্ছে,  বিদ্যুৎ  চমকাচ্ছিল। দপ্তরিচাচা নিতুকে বলল এখুনি  বৃষ্টি  আসবে নিতু, তাড়াতাড়ি বাড়ি  যাও। নিতু  মলিন মুখে বলল,জ্বী চাচা।

       নিতু স্কুল  ছেড়ে  কিছুদূর এগোতেই বৃষ্টি শুরু হলো। আশেপাশে  কেউ নেই, নিতু সাহসী মেয়ে, তবুও আজ কেনজানি তার ভয় করছে। কিছুদূর যেতেই  নিতু  অনুভব  করল কেউ তাকে অনুসরণ  করছে।  নিতু  আরও ভয় পেল  বৃষ্টির গতি ক্রমশ  বাড়ছে। ভয়ে নিতুর সারা শরীর কাঁপছে। জোড়ে হাঁটার চেষ্টা করলেও কাজ হচ্ছে  না, মনে হচ্ছে  পা দুটো যেন এগোচ্ছে না।

       নিতু  আবাও অনুভব  করল কেউ তাকে অনুসরণ  করছে,  এবার সে পিছন ফিরে দেখল দুজন অচেনা যুবক তাদের সাথে মেম্বারের ছোট ছেলে মতিন।  নিতু তাদের সালাম  দিল। সারামের জবাবে ছেলে গুলো দিল দানবীয় হাসি। সালাম দিয়ে নিতু হাঁটা শুরু করল। বৃষ্টির গতির সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারছে না নিতু। ছাতা থাকার সত্বেও প্রচণ্ড  বৃষ্টিতে নিতুর জামা ক্রমশ  ভিজে যাচ্ছিল।

নিতু অনুভব  করছিল ছেলে গুলা তার দিকে বাজে ভাবে তাকাচ্ছিল। এর মধ্যেই  একটা ছেলে হাঁটতে হাঁটতে  ইচ্ছে  করে তার গাঁয়ে এসে পরল।

নিতু  বলল  ভাইয়া  ঠিক করে হাঁটেন। পিছন থেকে মেম্বারের ছেলে মতিন  অট্টহাসি  দিয়ে  বলল, আরে বন্ধু ঠিক ভাবে হাঁটতে  বলছে।  বলে তিন জনে আবার সেই দানবীয়  হাসি।

         আজ যেন এক কিলোমিটার রাস্তার দূরত্ব  দশ কিলোমিটার  এ পরিনত হয়েছে। নিতু  বুঝতে পারছে  বড় কোন বিপদ  আসতে চলেছে।  সে এই মুহূর্তে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কিছু ভেবে ওঠার আগেই  মানবরূপী জানোয়ার  গুলো হায়নার মত হামলে পরল নিতুর ওপর। নিতু দৌড়ে পালানোর চেষ্টা  করল কিন্তু  সে এখন হায়নাদের হাতে অসহায় হরিণছানা মাত্র।  নিতু তাদের  কাছে অনেক কাকুতিমিনতি  করল, পাঁয়ে পরে কাঁদল, কিন্তু  জানোয়ার  গুলো  তার কোন মিনতি শুনল না।

নিজের সম্মানটুকু বাঁচানোর জ ন্য প্রাণপণ চিৎকার করল নিতু…. বাঁচাও,বাঁচাও…..। কিন্ত বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে  গেল তার আতর্নাদ।

শয়তান গুলো  বলল, যত পারিস চিৎকার  কর কেউ নাই আশেপাশে, তোকে কেউ আজ বাঁচাতে  পারবে না আমাদের  হাত থেকে।
    কি  দোষ করেছি আমি? আমি তো তোমাদের ছোট বোনের মত, আমাকে বাড়ি যেতে দেন….. আবারও সেই দানবীয় হাসি…..

       অতঃপর  জানোয়ার গুলো  তাদের যৌন ক্ষুধা  মিটাল। নিতুর নিথর দেহটা পড়ে রইল রাস্তার পাশে একটা ঝোপের আরালে। নিতুর  রক্তে রঞ্জিত  হলো বাংলার মাটি, পথ-ঘাট…। বৃষ্টির পানি সব ধুয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও,  অবারও সাক্ষী  রয়ে গেল বাংলার প্রকৃতি, রক্তে ভেজা বাংলার মাটি, ও দিকে  পথ চেয়ে বসে রইল নিতুর  বাবা মা……।

 [printfriendly]

আপনার মতামত এর জন্য

[everest_form id=”3372″]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top