সত্যেরে লও সহজে

সত্যেরে লও সহজে
নন্দা মুখার্জী
“ভালো হোক বা মন্দ হোক প্রত্যেক মানুষের বাঁচার জন্য প্রয়োজন তার পরিবারের প্রিয় মানুষগুলো”— আজ এ কথাটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে অরুন ব্যানার্জী।বেশিদিন আগের কথা নয়।মা,বাবা পছন্দ করে তার বিয়ে দিলেন অমৃতার সাথে। অরুন তাকে নিয়ে সুখীই ছিলো।অমৃতা আহামরি সুন্দরী না হলেও দেখতে মন্দ ছিল না।বলতে গেলে গৃহকর্মে সে ছিল ভীষণ পারদর্শী।বৌভাতের পরদিন থেকেই সে স্বইচ্ছায় সংসারের যাবতীয় কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।ভীষণ বুদ্ধিমতী অমৃতা সংসারে প্রবেশ করেই বুঝতে পেরেছিল বয়স্ক শ্বশুর,শ্বাশুড়ীকে দিয়ে সংসারের কোন কাজ করানো ঠিক হবে না।কারণ এতে তাদের কষ্টই হবে আর স্বামীর কাছে এই কারণে সে ছোট হবে।অরুনের মা,বাবাকে কষ্ট দিলে তার প্রতি অরুনের ভালোবাসা কমবে।বুদ্ধিমতী অমৃতা ন্যায়নীতি সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিলো।সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো নিজের মা,বাবার জায়গাটা কাউকেই দেওয়া যায় না ঠিকই কিন্তু স্বামীর মা,বাবাকে তো কিছুটা ভালোবাসা দেওয়া যেতেই পারে।আর অরুনও তাতে খুশিই হবে।সংসার মানেই তো পরিবারের সকল মানুষের পাশে থেকে তাদের সুখে সুখী হওয়া তাদের দুখে দুখী হওয়া।একটা সুখী পরিবার গড়তে গেলে অনেক সময় অনেক কিছুই মানিয়ে নিতে হয়।
বিয়ের এক বছরের মধ্যেই অরুনদের বাড়ি, পাড়া-প্রতিবেশী এবং অরুনদের সমস্ত আত্মিয়বন্ধুর মধ্যে অমৃতার সুনাম ছড়িয়ে পড়লো।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল বিষয়টা প্রথম প্রথম অরুনের ভালো লাগলেও খুব ভালো কখনোই লাগেনি। পরের দিকে নিজের স্ত্রীর গুণকীর্তন অন্যের মুখে শুনলেই তার সমস্ত রাগ এসে পড়তো অফিস থেকে বাড়ি ফিরে অমৃতার উপর। অমৃতা নিজে তো নয়ই তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি হঠাৎ করে অরুনের মধ্যে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখে তারা নিজেরাও অবাক হয়ে গেলেন।দিনকে দিন অরুন তার নিজের স্ত্রীকেই হিংসা করতে শুরু করলো।মা,বাবার শত অনুরোধ,দিনরাতে তাকে বুঝিয়েও কোন পরিবর্তন তার মধ্যে আনা গেলো না।কেমন যেন সে মানসিক রোগী হয়ে উঠতে লাগলো।অমৃতা চেষ্টা করেছিল তাকে ডক্টর দেখানোর কিন্তু সেদিন তার গায়ে অরুনের হাত উঠেছিলো।রাতে ঘরের ভিতর চিৎকার,চেঁচামেচি শুনে অরুনের মা,বাবা ছুটে এসে বন্ধ দরজায় আঘাত করে জোর পূর্বক দরজা খুলে দেখেছিলেন অমৃতা অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে আর তার কপাল ফেঁটে রক্ত বেরোচ্ছে।বাবা ছেলেকে মারতে উদ্যত হলে তার মা চিৎকার করে বলেন,
— শাসন করার পরিস্থিতিতে আজ ও আর নেই।আগে মেয়েটির জ্ঞান ফেরায় ওকে বাঁচাই পরে ওর ব্যবস্থা আমরা করতে না পারলে পুলিশের হাতে ছেড়ে দেবো।
সেই মুহূর্তে অরুন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
তারপর কেটে গেছে পাঁচ,পাঁচটি বছর।অরুন আর বাড়ি ফিরে আসেনি।অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও তার কোন হদিস পাওয়া যায়নি।পরের মাসেই অমৃতা বুঝতে পারে সে মা হতে চলেছে।ছেলের বয়স এখন চার বছর।বাড়ির এই তিনটি প্রাণী সকলের অরুনের কথা প্রতি মুহূর্তে মনে পড়লেও কখনোই তারা একের সাথে অন্যে অরুনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে না।শুন্যতা যার যার বুকের ভিতর সেই সেই চাপা দিয়েই রাখে।।দীর্ঘদিন অফিসে না যাওয়ার কারণে তার চাকরিটাও সে খুইয়েছে।
অরুনের দূর সম্পর্কের এক মামার পরিবার বাঁকুড়া বিষ্ণুপুর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গিয়ে শুশুনিয়া পাহাড়ের কাছে একটা দোকানের সামনে অরুনকে আবিস্কার করেন সম্পূর্ণ উন্মাদ অবস্থায়।তারা সেখানে আর কাল বিলম্ব না করে সেদিনই তাদের গাড়িতে করে অরুনকে নিয়ে ফিরে আসেন অরুনদের বাড়িতে।ডাক্তারের পরামর্শ আর সেবাযত্নের ফলে অরুন ফিরে পায় তার পূর্ব জীবন।ফিরে পায় তার স্ত্রী,সন্তান আর মা বাবাকে।সকলের কাছে সে ক্ষমা চেয়ে নেয়।শুরু হয় তার নূতন করে পথ চলা।চেষ্টা করে আবার রোজগারের একটা পথ খুঁজে নেওয়ার।ভীষণভাবে উপলব্ধি করে সংসার জীবনে ভালো মন্দ যে ঝড় ই আসুক না কেনো সকলে মিলে এক জায়গায়,একসাথে থাকাটাই জীবনে মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top