সমভাব – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

 3 total views

[post-views]

ভোলা ল‍্যাঙচাতে ল‍্যাঙচাতে এলো দেশের রাজার কাছে, দেশটার নাম সবপেয়েছি, সভাসদেরা উ‍ৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে ভোলার দিকে,-ও বলা হয় নি, ভোলা রাজার ব‍্যক্তিগত দূত, ওই খোঁড়া পায়েতেই ও সারা রাজ‍্যের খবর রাখে। রাজা মঙ্গলমনি বড়ই দয়ালু, ভোলার জন্য সুধাঅন্ত সরবৎয়ের ব‍্যবস্থা করে ওকে বসতে বললেন। ভোলার কিন্তু তর সয় না, ও বলার জন্য হাঁকপাক করতে থাকে-“রাজা মশাই–ইয়ে মানে বলছিলাম কী-” রাজা সিংহাসনে ফিরে গিয়ে সুধাঅন্ত সরবতের শেষ ঢেকুরটা তোলার অপেক্ষা করতে থাকে।
ভোলার পেট থেকে কথা আর ঢেকুর দুটোই একসঙ্গে বেরিয়ে আসে-“ভিনদেশী পাগল রাজামশাই।”সমস্বরে সবাই বলে ওঠে-“পাগল” রাজ পন্ডিত কুশল‍্যকরণ মাথা নেড়ে বললেন,”নেহাৎ অভিধানের জোরে আমরা শব্দটি জানি, নাহলে আমাদের রাজ‍্যে নৈরাজ্য নেই, নৈরাশ‍্য নেই, তাই পাগলও নেই,- ব‍্যাপারটা অভিনব বটে।”রাজ অমাত‍্য মাথা নেড়ে বললেন,-“রাজা আজ্ঞা করুন,-শ্রীমান পাগলকে সম্মানপূর্বক রাজসভায় নিয়ে আসি।” সভাসদগণ অমাত‍্যের প্রস্তাবে বলে উঠল,-সাধু সাধু।”
রাজা সমর্থনে বলে উঠলেন,-“রাজবৈদ‍্য যাক সঙ্গে, কখন কী লাগে, দীর্ঘপথ ভ্রমণে অতিথি যদি অসুস্থ থাকেন।” অতঃপর ভোলা, অমাত‍্য ও রাজবৈদ‍্য চলল অতিথি পাগলকে নিয়ে আসতে। পাগল তখন একটা গাছের তলায় বিশ্রামে ব‍্যস্ত,ভোলার ডাকে চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,-” আমি তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করি নি, আমায় একটু থাকতে দাও।” রাজবৈদ‍্য বলল,-“আমরা আপনাকে সসম্মানে নিয়ে যেতে এসেছি।”-রাজবৈদ‍্য নাড়ি পরীক্ষা করে বললেন-“বড়ই অস্থির নাড়ি।”অগত‍্যা শ্রীমান পাগল চলল ওদের পিছু রাজসভায়। সুন্দর সুরেলা অভ‍্যর্থনায় রাজার দরবারে শ্রীমান পাগলের প্রবেশ ঘটল। রাজা সম্ভাষণ করলেন-“নতুন মানুষ আপনার নাম কী?”
শ্রীমান পাগল উত্তর দিল-“আমার মনে নেই, উপযুক্ত কাগজ দেখাতে না পারায় আমাকে কোন দেশ গ্রহণ করে নি,-আমি বোধ হয় নিরুদ্দেশ।”-বলার ধরণে সভায় হাসির  রোল উঠলে, রাজা বললেন-“আপনি নিশ্চিন্তে এই রাজ‍্যে থাকুন,এখানে থাকতে কোন কাগজ লাগে না।”সবাই বলে  উঠল-“ওনাকে আমরা কী নামে ডাকব?”রাজকবি বলে উঠলেন-“ভাবুক”সবাই এই নাম আনন্দের সঙ্গে মেনে নিল। রাজা এবার বললেন-“আপনি কোথা থেকে এসেছেন ভাবুক।”ভাবুক-“বললাম যে আমার কাগজও নাই,দেশও নাই।”-“ঠিক আছে আপনি আজ থেকে এই সবপেয়েছি দেশের বাসিন্দা।”-রাজামশাই বলে উঠলেন।
অমাত‍্য-“এখানে সবাই  সবাইকে ভালবাসে, পাশে দাঁড়ায়।”-ভাবুক বলল-“আমি তো এরকম একটা জায়গা বহুদিন ধরে খুঁজছি,-এখানে ভালবাসা পেতে কিছু করতে হয় না?-“হ‍্যাঁ হয়,-ভালবাসতে হয়”-রাজকবি বললেন। ভাবুক তাজ্জব,-“শুধু ভালবাসলেই ভালবাসা পাওয়া যায়?-আমি তো তা পেতে গিয়েই পাগল হলাম,”-বলেই ভাবুকের কান্না পেয়ে গেল। কান্না ভোলাতে রাজগায়ক গান ধরল-
                 “হেথায় কেউ কাঁদে না,
                 দুঃখ বলে কিছু নেই,
                 বন্ধু আর নয় কান্না।
ভাবুক মুগ্ধ হয়ে সবাইকে দেখতে থাকল। রাজা বললেন-  “আপনার প্রিয়জন কেউ নেই?”-ভাবুক বলল-শুনেছি বাবা,মা মারা যাওয়ার পর যারা আমার সবকিছু নিয়ে নেয় তারাই আমার প্রিয়জন।” রাজা ভাবুকের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন,-“এখন আমরাই আপনার প্রিয়জন চিন্তা করবেন না।” ভাবুক অবাক হয়ে বলল-“মহারাজ আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে রাজারাজরারা গরিবের কাঁধে হাত রাখে না,-রাখলে জানবেন ভোট এসে গেছে।”
রাজ‍্যের অর্থমন্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন-“ওখানে আপনার ভরণপোষণ ঠিক চলত তো?””আজ্ঞে না,কোনরকমে বেঁচে ছিলাম,দেশটায় আর কোন চাকরি নেই,আবার নতুন তালাবন্ধ জীবনে অনেকের চাকরি গেছে। সরকারি  সুযোগ সুবিধেগুলো কোথায় চলে যায় তাও বলতে পারব না।” রাজা বললেন-“কোন চিন্তা নেই,-এই রাজ‍্যে খাদ্য,বস্ত্র উৎপাদনে সবারই স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে, তার ভাগও সবাই সমানভাবে পায়;-এই দেখ,-আমার যা পোশাক রাজকবিরও তাই, শুধু কাজের ভাগ অনুযায়ী আমরা আলাদা আলাদা ব‍্যাজ ধারণ করি।” ভাবুক এতক্ষণে ভাল করে তাকিয়ে দেখল-সত‍্যিই তো তাই।
রাজবৈদ‍্য জিজ্ঞেস করলেন,-“তুমি যেখান থেকে এসেছো সেখানে চিকিৎসা পেয়েছিলে?” ভাবুক ভাবনায় ডুবে গিয়ে বলল-“ওখানে বড়লোকদের জন্য কিছু চমৎকার ব‍্যবস্থা আছে হয়ত, কিন্তু গরিবদের চিকিৎসা পেতে বড়ই দুর্ভোগ পোয়াতে হয়,- রোগ নির্ণয়, রোগীর শয‍্যা দীর্ঘ লাইন বা দালালের ওপর নির্ভরশীলতা।” রাজসভায় সবাই সমস্বরে বলে উঠল,দালাল সেটা কী বস্তু ভাবুক মশাই।”
ভাবুক তার চেষ্টামতো বোঝাতে শুরু করল-“কোন কিছু সহজে পেতে গেলে যে মানুষদের উপরি পয়সা দিয়ে সে ব‍্যবস্থা পাওয়া যায় তাকেই দালাল বলে,-এ ব‍্যবস্থা শুধু স্বাস্থ‍্যে নয়,সর্বত্র আছে।” রাজামশাই আঁতকে উঠে বললেন-“কী সাঙ্ঘাতিক,আপনাকে আর কোথাও যেতে হবে না,-এখানে সকলের জন্য সমান সুযোগ,-আপনি এখানে নিশ্চিন্তে থাকুন।” রাজগাইয়েরা গেয়ে উঠল-
              ভাবুক তুমি আমাদের এই দেশে
              সুখে শান্তিতে থাকো,
              সমান সুযোগ পাবে হেথায় তুমি
              চিন্তা কিছুই নেই কো।
এমন সময় ভাবুকের কানে এল-“এই পাগল ওঠ,-পার্কটা  কি তোর শোবার জায়গা?-কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে দেখো।”- সিভিক পুলিশের গুঁতো খেয়ে ভাবুক চারদিকে  তাকিয়ে সব পেয়েছির দেশটাকে খুঁজতে থাকল।
সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)
0 - 0

Thank You For Your Vote!

Sorry You have Already Voted!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top