সময় – রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম- 

[post-views]

সময় টা ২০১০।
দুপুরের কড়া রোদ মাঠে। এই গমগমে রোদের আচে বাইরে থাকা যাচ্ছে না। অবনী ক্লাসরুমে ঢুকলো।
টিফিন পিরিয়ড এখন। গতকাল সন্ধ্যায় বিকেলে অবনীর বাবা চিকেন পরোটা এনেছিল। বিকেলে আধপেট খেয়ে দেয়েও অনেকটা ছিল। অবনীর মা ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল। সকালে গরম করে সেটিই  দেওয়া হয়েছে টিফিনে। অবনীর প্রিয় খাবার এটি।
 অবনীর কিছু ভালো লাগছে না। আজ বাসা থেকে বেরুনোর সময় বাবার সাথেও দেখা হয় নি অবনীর। একসাথে বেরও হওয়া হলো না। বাবা শুধু বললো,তুমি যাও মা। আমি পরে বেরুচ্ছি।
অবনী কিছুটা মুখে দিয়ে আর খেলো না।  নাহ্। কিছুই ভালো লাগছে না।
টিফিন পিরিয়ড শেষ।  অন্ক স্যার ও চলে এসেছে। এসেই বোর্ডে  একটা অন্ক তোলা শুরু করেছে। উফ! এখন সব খাতায় তুলতে হবে!! ভালো লাগে এসব?
হঠাৎ  করে অবনী খেয়াল করলো খুব দ্রুত বেগে তাদের ড্রাইভার আংকেল ক্লাসে ঢুকে পড়লো। এসেই অন্ক স্যারের কানে ফিসফিস করে কি জানি বললো। স্যার বেশ ঘাবড়ে গিয়ে অবনীকে ডেকে বললো আজ তোমার ছুটি,মা। তুমি বাসায় চলে যাও।
অবনী কিছুই বুঝতে পারছে না। ক্লাস থেকে বের হতেই দেখে দরজায় তাদের প্রধান শিক্ষিকা দাড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি। অবনীকে কাছে ডাকে মাথায় হাত রেখে বললো,সাবধানে যেও, মা!
অবনীর মাথায় কিছুই ঢুকছে না। কি হলো হঠাৎ!
জলদি গাড়িতে উঠে গেল। অবনীর মন ছটফট করছে।
আংকেল, কি হয়েছে?
না গো মা। কিছু না।
বলেন না! কি হয়েছে!
তোমার বাবা একটু অসুস্থ গো মা। হাসপাতালে ভর্তি। গেলেই সব জানতে পারবে মা।
কি হয়েছে আব্বুর?
মা একটু স্থির হও। সব জানতে পারবা।
আপনি তাড়াতাড়ি চালান না আংকেল।  তাড়াতাড়ি চলেন প্লিজ।
গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামলো। চার তলায় থাকে অবনীরা। অবনী দ্রুত সিড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে। তিন তলায় গিয়ে অবনী থামলো। ও-ই তো মা!
মা, কী হয়েছে?
অবনীর মা দৌড়ে এসে অবনীকে জড়িয়ে ধরলো। মা খুব কাদছে।
তোর বাবা খুব অসুস্থ রে মা। হাসপাতালে ভর্তি।  দুয়া কর মা আল্লাহ এর কাছে।
এরপর অবনী নিজের রুমে আসলো। ওর খুব কান্না পাচ্ছে। বাবা সরকারি চাকুরিজীবী বিধায় চট্টগ্রামেই ওরা থাকছে প্রায় এক বছর হলো। এখানে আত্বীয় স্বজন বলতে কেউ নেই।  কিছুক্ষণ পর অবনী দেখতে পেলো, তিন তলার আন্টি এসেছে। সাথে অবনীর মিসও,যিনি অবনীকে বাসায় পড়াতো। আন্টি বলছে,
মা,বাবা-মা কারো চিরকাল বেচে থাকে না। তোমার বাবাও বেচে নেই মা।
মানে? কি বলেন এসব? আমার বাবা নেই মানে? আম্মু বলছে তো,বাবা হাসপাতালে। সুস্থ হয়ে যাবে আব্বু। এসব বলবেন না প্লিজ।
না মা। তোমার মাও জানে না মা। জানাতে পারি নি আমরা। তোমার বাবা হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মারা যায় গো মা।…………………………………..
অবনীর কাছে সব অবাস্তব লাগছে। এসব তো হওয়ার ছিল না কখনো। অবনী আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। এক বিশাল সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছে অবনী। যে গর্জন অবনী ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় নি সেদিন। কেউ না।
নাহ্। স্রষ্টাও বোধহয় সে গর্জন  শুনতে পায় নি। সে এক বিরহের সুর, সে এক অশ্রু বিসর্জনের নীরব গল্প।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top