সাহস – মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

 [post-views]

রিয়ার বিয়েটাতে অমত করলো সাদিক।
কেবল সে নয়।ওর বাবাও।
কারন রিয়ার মামা একজন সৎ শিক্ষক এবং বাবা সার্টিফিকেট বিহীন মুক্তিযোদ্ধা। দদ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। কাজেই এরকম মানুষটা সুবিধা নিয়ে আখের গুছিয়ে বেটার কিছু পাইতে নারাজ।যা আছে তাই।
জ্যাক চ্যানেলের লেশ মাত্র নাই।তাই এটা নিশ্চিত যে,এই মেয়ের দ্বারা কোনো ফায়দা লোটা অসম্ভব।তার ওপর রিয়া এনজিওতে আছে।আমাদের মগজে মেয়েরা এনজিও,নার্সিংয়ের মত পেশায় আসা মানেই ঝামেলা।হুট করে বরপক্ষ উঠে গেছে।তারপর সাফ সাফ আলাপ,এনজিওতে থাকা যাবেইনা।
এমনি যুক্তিতর্কের মধ্যেই বিয়ে।
সাফিনের সাথে স্কুলজীবন। কলেজ,বিশ্ব্ববিদ্যালয়েও একই ডিপার্টমেন্ট, সাবজেক্ট নিয়ে পড়া।বিয়ের পর থেকে সময় গড়াতে থাকে মধ্যবিত্তীয় চাকার মতো।তবে রিয়ার কাজের সিনসিয়ারিটি, ক্ষীপ্রতা সবাইকে মুগ্ধ করে।অফিসের নানান জটিল সমস্যার সমাধানে রিয়া ম্যাম ।সাংগঠনিক তৎপরতায় রিয়া ম্যাম। কর্মচারী,কর্মকর্তা সবাই মুগ্ধ। জেলা পর্যায়ের বড় বড় মানুষের মধ্যেও তার নাম।সংস্থার বদলি,গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বস খালি রিয়া রিয়া করেন।
আর রুমানা, আলভী, নিপুনদের মধ্যে মৌমাছির মতো গুণগুণ শোনা গেলো—বসের সাথে এত কী!একটু চুপচাপ কাজ করে গেলে ক্ষতি নেই তো।তা  –না।উনার সাথে লংড্রাইভে যাওয়ার লোভটাও সামলাতে পারেনা রিয়া ম্যাম।
ওদিকে বেচারা সাফিন—আহা!আজকাল আপনার মুখের দিকে তাকালে বড্ড মায়া হয়।সাতটা বচ্ছর গেলো,– বাচ্চা কাচ্চা না থাকলে এত্ত সব ব্যাংক ব্যালেন্স, সহায় সম্পত্তি কে খাবে দুলাভাই?
রুমানার কথাগুলোর মানেটা সহজ।ওরই পরামর্শে সাফিন একটু নিরবে সময় করে ভাবলো বিপিন পার্কে বসে।সামনে আধমরা ব্রহ্মপুত্রের ওপর বিশাল শুন্যতার সবটুকু যেন সাফিনের মাথায়।
স্যার কপি কাইবাইন?
কিশোরটাকে চেনে।পার্কে বসা লোকজনকে চা,কপি,সিগ্রেট টিগ্রেট আনার ফরমায়েশি কাজ করে। ইচ্ছে ছিলোনা।কিন্তু ছেলেটাকে মানা করেই কীভাবে?
স্যারের কি মন খারাপ?
মানে?
না স্যার।ওইযে কইলেন একবার– না,একবার হ।
সমস্যা নাই।যা।এক কাপ ওয়ান টাইম কফি,একটা সেইক।
স্যার আগে কইতাইন গোললিপ।আইজকা সেইক ক্যরে?বুজ্জি —
ছেলেটা দৌড়ে চলে গেছে।ওর গলায় গানের কলিটা রীতিমতো অসহ্য লাগলো—সকি গো—ও,আমার মন বালো না—-
নুরি পাগলিটা।
বহুদিন পর।সেই অকৃপণ হাসি।নিশ্চয়ই তার একটা সু্ন্দর একটা সকাল দিয়ে জীবন শুরু হয়েছিল। তারপর পাথুরে পথে ঠোক্কর খেতে খেতে এরকমই জীবনের পরাজয় মেনে নিয়েছে।টাকা দিলে নেয়না।খাবার দিলে কুকুর,পাখিকে খাইয়ে ফেলে।এটাও তো অন্যরকম সুখের ছায়া।
ছেলেটা ফিরে এসেই হাঁপাচ্ছে।
স্যার।আমার একটা বিপইদ।এই দরেন আপনের জিনিস।
কিন্তু কী বিপদ?
পরে কমুনে স্যার। আমার বাপ মায় বিসন জগড়া লাগচে।মায়েরে মারতাছে।সকিনা বুজি মোবাইল করছে।আমি যাই।
মানুষের এরকম অপ্রকাশিত কষ্টগুলোর দিক  কেউ তাকাবে সে সময় কই।
সিগারেটের শেষ পর্যন্ত টানার ইচ্ছেটা মরে গেছে।কারন রুমানা ফোনে জানালো, রিয়া পাঁচদিনের জন্য বসের সাথে কক্সবাজার যাচ্ছে।
শরীর ঘামছে সাফিনের।টলতে টলতে বাসায় ফিরল সাফিন।ঘরে রিয়া কাপড়–চোপড় ইস্ত্রি করছে।
তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও।
মানে?
মানে ছেড়ে দাও।
আহা, তোমার কী– হলো? বলো তো।
কিছুই হয়নি।
তো?
বলেছি, চাকরিটা ছেড়ে দাও।ওসব এনজিও ফেনজিওতে —-
এত ভালো বেতনের চাকরিটা, ছেড়ে দিতে বলছো?ভেবে বলছো তো?
বেশি ভাবাভাবির কিছুই নেই।হয় চাকরি ছাড়ো,নয়তো আমাকে ছাড়ো।
সুটকেস গোছানোর কাজটাতে চট্ করে একটু ছেদ পড়লো রিয়ার।মাথার ভেতর থেকে কক্সবাজার চিন্তাও যেন ভীতু কাঠঠোকরার মতো উড়ে পালালো।
ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে কী যেন গাঁইগুঁই করছিলো সাফিন।
রাত দুটোয় বিজয় এক্সপ্রেসের টিকেট কেটেছিল পিয়ন ছেলেটা।এখন মাথায় কিছুই কাজ করছেনা।বসের নাম্বারটাও বিজি।সাফিন না খেয়েই বেডরুমে চলে গেছে।
ফোনটা বেজে উঠেছে।মনিটরে বসের নাম্বারটা। ভয় লাগছে।কী বলবে—সব কিছু ঠিকঠাক, এসময়ে না— করে দিলে…….. মাথাটা ঘুরছে। তবুও একটা প্রকাণ্ড শংকা নিয়ে রিসিভ করে—
বস,বলছেন,তোমার জন্য ডায়মন্ড রিংটা কিনেই ফেললাম।
স্যার,আমি কাল কক্সবাজার যাচ্ছিনা।আর চাকরিটাও আমার দ্বারা করা  হচ্ছেনা।
ওপাশ থেকে প্রশ্ন করার আগেই ফোনটা একদম অফ্ করে দিল রিয়া।
রাতটা কেটে গেলো বাকবিতণ্ডা ছাড়াই।ভোরের আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে পড়লো রিয়া।
বরাবরের মতো বেডটির অপেক্ষায় থেকে রিয়াকে ডাকলো।বিছানার ওপরে একটি চিঠি—-আমি তোমাকে মুক্তি দিয়ে গেলাম।
তার পর আরো পাঁচটি বছর।রিয়া সচিবালয়ে জয়েন করতে যাচ্ছে। ক্লাশ নাইনে পড়ার সময় শুনেছে, দাদা প্রায়ই বলতেন,দেশের জন্য, মানুষের জন্য স্বাধীন ভাবে ভালো কাজগুলো করার মর্যাদাই আলাদা।এজন্য কোনো সনদ লাগেনা।
বাবা সেটি কাজে লাগিয়ে বড় কিছু হতে পারতেন।তিনি পিয়নের কাজ করেছেন স্কুলে।
আজ রিয়া নিজের পায়ে ভর করে দাঁড়াবার সাহস পাচ্ছে।

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top