সাহিত্যে দশক বিভাজন – সৌম্য ঘোষ

– 

[post-views]

দশক আগে না লেখা আগে? যদি আমরা দশককে আগে ধরে নিই, তাহলে অলেখক-অকবি কিংবা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠাদের স্থান সংকুলান হয়ে যায় ঐ দশক নির্বাচিত খাঁচায়। তাই লেখার গুরুত্ব ও নিরিখ বিবেচনায় কবির আবির্ভাবকাল খুঁজতে গিয়ে আমরা দশককে একটি সময়সূচক হিসেবে গণ্য করি সেক্ষেত্রে দশক-দশক নামের তালিকা কত দীর্ঘ হতে পারে তা ভাবাই কষ্টকর আর ওই দশককে উৎসবমঞ্চের লেখক কবিদের দর-কষাকষির হিসাব আমাদেরকে বিব্রত করে। কবিতার আলোচনায় দশক বিবেচনা অনেকের কাছে অবান্তর প্রসঙ্গ। আমি নিজেও এর ঘোরবিরোধী বিশেষক্ষেত্রে কালখণ্ডে আত্মপ্রতিষ্ঠা প্রাপ্তিবিচার অথবা কালখণ্ডের ভিত্তি মেনে কাব্যবিচারের বিষয়টা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয়। আমরা লক্ষ্য করি গদ্যের ক্ষেত্রে দশক বিবেচনা অনেকটাই সাহিত্যের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি ধারা তৈরি করেছে। এখানে প্রতিনিধিত্ব, উজ্জ্বলতম, বাবুগিরি ইত্যাদি দৌরাত্ম্য চোখে পড়ে। তবে বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের বিবেচনায় এর একটা কালানুক্রক্রমক গণনার গ্রহণযোগ্যতা হয়তো আছে। এর ধারাবাহিকতার একটা রূপ আমরা লক্ষ্য করি- প্রাচীন যুগ ১০০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ, মধ্যযুগ ১২০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ, প্রাক-আধুনিক যুগ ১৮০০-১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ, মধুসূদন যুগ ১৮৪০-১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ, প্রাক-রবীন্দ্র যুগ, ১৮৬০-১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ, রবীন্দ্র যুগ ১৮৭৫-১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (ত্রিশ) ১৯৩০-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (চল্লিশ) ১৯৪০-১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (পঞ্চাশ) ১৯৫০-১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (ষাট) ১৯৬০-১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (সত্তর) ১৯৭০-১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (আশি) ১৯৮০-১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (নব্বই) ১৯৯০-২০০০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (শূন্য) ২০০০-২০১০ খ্রিস্টাব্দ, আধুনিক যুগ (শূন্যের দ্বিতীয়) ২০১০-০ খ্রিস্টাব্দ।
এই কালানুক্রমিক গণনা এক পর্যায়ে দশক পরিচয়ে সাহিত্যের রাজনীতির উৎপত্তি ঘটে। সাহিত্যের গ্রহণ-বর্জন আনন্দবোধ- হতাশা যা এক নৈঃশব্দ থেকে শুরু হয় এবং শেষ হয় আরেক নৈঃশব্দে; যা বস্তুপৃথিবীর নতুন ও অর্থপূর্ণ ফেনোমেনা হাজির করে; যার অভিপ্রায় সমগ্রতা; চেতনার প্রচলিত ছককে যা নস্যাৎ করে; যার দাবি পাঠকের চিন্তন সক্রিয়তা।
একটি দশক গাণিতিক নিয়মে কেবল দশকেই দশ বছরে ফুরিয়ে যাবে তা ভাবা নিতান্তই অবান্তর। কাব্য নিশ্চয়ই গণিত মেনে চলে না; কখনো কখনো একটি দশক শতকেও পর্যবসিত হতে পারে, আর তার প্রমাণ পৃথিবীর নানাভাষিক কাব্যোতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেকে দশ বছর (০ থেকে ০৯) বয়ে যায় নীরবেই, কোনো নতুন ঘটনা ছাড়াই কিংবা কোনো নির্দিষ্ট দশকে কেউ উজ্জ্বল নাও হতে পারেন যার কোনো শনাক্তযোগ্য প্রবণতা ব্যতিরেকে। কোনো কবিকে দশক বিবেচনায় এনে বিচার করা অনেকখানি অবিচারের শামিল। কেউ কেউ দশক পেরিয়েই উজ্জ্বল তাঁকে আমরা কোন দশকের বিবেচনায় ফেলবো। তাই দশক নয়- শতকস্পর্শী সুবোধ্য কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে।
এক দশক থেকে দশকান্তরে যখন বিচার্য অনিবার্য হয়ে ওঠে, পাঠকের এই দশক-অনিবার্যতায় সজাগ বা সতর্ক থাকতে কঠিন হয়ে যায়। কেননা লক্ষ্য রাখতে হয় প্রাক্তন দশক থেকে পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কোন প্রবণতা ও দৃষ্টিকোণের সৌজন্যে চরিত্রবান হয়ে উঠেছেন এক বিশেষ সময়ের পরিকাঠামোতে আর সময়ের তাওয়ায় সেঁকে নিতে নিজস্ব স্বরায়ণ, উপকরণ ও প্রকরণের সম্ভাব্য সমীকরণে কতোটা নির্ধারিত হচ্ছে তার দিকে খেয়াল রাখতে হয়। আমাদের জেনে নিতে হয় টাটকা অবস্থানে থাকা এই যে দশক, তার বিবর্তন, তার রূপান্তর, তার বদলে যাওয়া, এটা নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। তাই পাঠক বুঝে নিতে চায় বিশেষ সময়ের নির্দিষ্ট দাবি মিটিয়ে বাক্সময় হয়ে উঠেছে কার কাব্যে কোনখানে তিনি স্বভাবজ স্বতন্ত্র কিংবা ঐ তথাকথিত দশকগুলো থেকে কোন কোন দিক দিয়ে অর্জিত হয়েছে বিশিষ্ট প্রবণতা, অন্যমাত্রিকবোধ এবং প্রাকরণিক ভিন্নতা।
দশকের বিবেচনায় এই সীমারেখার গণ্ডিবদ্ধতায় কোনো সৃজনশীল সৃষ্টিকে বা তার স্রষ্টাকে মূল্যায়ন করা কঠিন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দশক বিভাজন- বিন্যাসের ছকে ফেলে কাউকে আলোচনা, মূল্যায়ন এবং পর্যবেক্ষণে অস্বস্তিবোধ করি। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষক এই বিভাজনকে দূরত্বের নিরিখে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের স্বাতন্ত্রে সময়ের এককে একটি নির্দিষ্ট কালপর্ব সৃষ্টিশীলতাকে বেঁধে ফেলতে পারেন। কালপর্বকে একপর্যায়ে শতকে অন্তর্ভুক্ত করে দশকওয়ারি বিভাজনে গণ্য করেন। এ বিবেচনা অনেকের কাছে সুবিদিত হয়ত অনেকের উপেক্ষা করার উপায় নেই। আর এ কারণেই সময়ভিত্তিক এ দশকের যোগ-বিয়োগে কতটা বাঁকবদলে হিসাব মিলানো যায় রূপবৈচিত্র্যের সমস্তকে চিহ্নিত করা এই একক-দশক বিভাজন সে অর্থে হয়তো প্রয়োজনীয়ও বটে!
অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top