সুপ্ত প্রতিশোধ – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

  –

 [post-views]

প্রবীর শাসমল আইটি সেক্টরে ম‍্যানেজারিয়াল পোস্টে চাকরি করে। দিনের মধ্যে প্রায় বারো ঘন্টা সময়ই অফিসকে দিতে হয়। এই ব‍্যস্ত সিডিউলে বেচারির বিয়েটা পর্যন্ত করা হয়ে উঠছিল না।
 
মা এক একটা পাত্রীর ছবি দেখায়, ফোনে কথা বলতে বলে, দু একবার কথা বলে ব‍্যস্ততার জন্য ভুলে যায়। আর কথা এগোয় না, কিছুদিন পর মেয়েটার অন‍্য কোথাও বিয়ে হয়ে যায়। তাই এবার মা প্রবীরের কর্মস্থল পুনেতে কর্মরতা পাত্রী দেখেছে যে কিনা তার সঙ্গে আলাপ করতে নিজেই আসছে প্রবীরের বাড়ি।
 
ছেলের ব‍্যস্ততা আর আলসেমির জন্য মায়ের নতুন দাওয়াই। ওমা পল্লবী মানে মায়ের দেখা পাত্রী সত‍্যিই গাড়ি ড্রাইভ করে প্রবীরের বাড়ি উপস্থিত হল। “ভাগ‍্যিস ঘরটা হালকা গুছিয়ে রেখেছিলাম”-মনে মনে ভাবে প্রবীর। পল্লবী এসেই বলে-” আপনি আতিথেয়তা নিয়ে চিন্তা করবেন না, আর বেশ বোঝা যাচ্ছে ওটা আপনি  একদমই পারেন না, আমি নিজের চা’টা নিজেই করে খেয়ে নিচ্ছি, ইন ফ‍্যাক্ট বেরোনোর আগে চা খাওয়াও হয় নি, আপনি শুধু কোথায় কি আছে দেখিয়ে দিন।”
 
প্রবীর হাঁ হয়ে দেখল পল্লবী সত‍্যি সত‍্যিই ওর রান্নাঘরে ঢুকে গেল। এতো সহজ হতে প্রবীর ওর চেনা কাউকে দেখে নি, ও তো নিজে এতো সহজ নয়ই। ফলে দূরত্বের প্রাচীর সরে গিয়ে সহজেই একটা হালকা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। এ ক্ষেত্রে ব‍্যতিক্রম হলেও প্রবীর উইক এন্ডে দেখা করার উৎসাহ পেল। ধীরে ধীরে উৎসাহটা বিবাহে সম্মতিতে গড়ালো।
 
ওস্তাদ পল্লবী দুই বাড়ির বিয়ের বাজারই সেরে ফেলল। প্রবীরের মাও খুব খুশি এরকম একজন যুৎসই মেয়ে পাওয়া গেছে বলে, যে তার অকেজো ছেলেটাকে ঠিক চালিয়ে নিয়ে যাবে। চারহাত এক হতে আর দেরী লাগল না। হনিমুনে আইফেল টাওয়ারও বাদ গেল না, আইটি সেক্টরের যন্ত্র প্রবীর হঠাৎ করে বেশ প্রেমিক বনে গেল। যদিও পুরো কৃতিত্বটাই পল্লবীর পাওনা।
 
প্রবীরের মা আর পল্লবীর বাবা,মা কিছুদিন করে থেকেও গেল প্রবীর, পল্লবীর সংসারে। প্রবীর, পল্লবী অফিস যাতায়াত করে একসঙ্গে। প্রবীর এখন সংসারের টুকটাক কাজ পারে। আর ওর বাবা হওয়ার ইচ্ছেটাও ইদানিং প্রবল হয়েছে।
 
পল্লবী ওর কান্ড দেখে হেসে বলে-“তুমি দেখি ছেলেমেয়ের নাম পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছো।” পল্লবীও সহমত হয়, মাতৃত্বের স্বাদ পেতে ওরও ইচ্ছে করে। তবে অন্তঃসত্বা অবস্থায় কিছু শারীরিক জটিলতা ধরা পড়ে। ডাক্তাররা এ অবস্থায় রিস্ক না নিয়ে ধরা পড়া টিউমারটা প্রসবের পর অপারেট করার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক ব‍্যবস্থাপনায় প্রসব হয়, দুই বাড়ির প্রিয়জনেরা উপস্থিত থাকে। ফুটফুটে নাতনি জন্মালেও পল্লবীর অসুস্থতা ওদের পীড়া দেয়।
দীর্ঘ চিকিৎসার পর জানা যায় টিউমারটা অপারেট করা যাবে না, রে দিতে হবে অর্থাৎ ওখানে ক‍্যানসার সেল আছে।
 
পল্লবী সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যায় কিন্তু প্রবীর ভেঙে পড়ে। কত আদর করে মেয়ের নাম রেখেছে তোর্সা, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে পল্লবী মেয়েকে কোলেও নিতে পারে না। তোর্সা কিন্তু বিছানায় শুয়ে মায়ের আঁচলটা শক্ত করে ধরে রাখে, কি জানি ওর ওই ছোট্ট মনটুকু দিয়ে ও কি বোঝে। মুম্বাইয়ের টাটা মেমোরিয়ালে দশ দশটা কেমো নিয়ে পল্লবী সাময়িক সুস্থ হয়। যদিও ডাক্তার বলে দিয়েছেন রোগ যে কোনো সময় আবার ছড়াতে পারে। হাতে কিছুটা সময় পেয়ে পল্লবী মেয়েটার দিকে নজর দেয়।
 
চাকরিতে রিজাইন করে বাড়িতে তোর্সার সঙ্গে সময় কাটায়। কিন্তু ডাক্তারের কথা সত‍্যি করে দেড় বছরের মাথায় রোগ আবার ছড়ায়, এবার লিভারে। তোর্সার তিনবছর বয়সে সব আশা ভরসা, হিসেব চুকিয়ে পল্লবী পরপারের যাত্রী হয়। প্রবীর অথৈ জলে পড়ে, স্ত্রী বিয়োগের শোক, তোর্সাকে কি করে বড় করে তুলবে এসব চিন্তায় ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তোর্সাকেও আর কাছে টানে না, একটা ঘোর, একটা অবসাদের মধ্যে থাকে। তোর্সাকে ওর দাদুদিদা কলকাতায় নিজেদের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও ও বাবাকে ছেড়ে যেতে রাজী হয় না।
 
প্রবীরের মা বাধ‍্য হয়ে এসে থাকে যা তার আগে ভাল লাগত না। নিজের ভিটে ছেড়ে থাকার অভ‍্যেস ওনার নেই,- বাড়িতে নিত‍্য পূজো হয়, তবুও নাতনির মুখ চেয়ে থাকেন। এভাবে কাটে আরও বছর দুই।  প্রবীরের অফিসে ওর জুনিয়র হয়ে আসে মধুজা, প্রবীরের অগোছালো উদভ্রান্ত চেহারা দেখে ওর মায়া হতে থাকে। অফিসের সবার কাছে শোনেও সবকিছু। প্রবীরের কিছুই নজরে পড়ে না, মূর্তিমান শোক হয়েই থেকে যায়।
 
অফিসের একটা কাজে প্রবীরের বাড়িতে এসে প্রবীরের মা আর মেয়ের সঙ্গে আলাপ করে মধুজা। মধুজাকে দেখে তোর্সা বলে-“তুমি আবার কে? তোমাকে তো এর আগে দেখি নি, তুমি কি কারুর মা? তুমি মরে গেলে সে কি একলা হয়ে যাবে?” অতটুকু বাচ্ছার একসাথে এতগুলো প্রশ্নে মধুজা হতচকিত হয়ে যায় তবু তোর্সার অবস্থাটা বুঝতে পারে।
 
মধুজা ঘরে আসায় প্রবীর বিস্মিত হয় কিন্তু প্রবীরের মা খুব খুশি হয়। তোর্সা ঘুরে ঘুরে দেখে মধুজাকে আর ওর মায়ের ফটোর দিকে তাকায়। মধুজা সেটা লক্ষ‍্য করে বলে-“বাহ্! তোমার মা তো খুব সুন্দর দেখতে ছিল,-একেবারে মা দুর্গার মতো সুন্দরী।” তোর্সাও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে-“হ‍্যাঁ, এত্তো এত্তো সুন্দর, এখন আকাশের তারা হয়ে গেছে তবে আসে মাঝে মাঝে আমার কাছে, এই এত্তো এত্তো আদর করে।” প্রবীর ভাবলেশহীন চোখে তাকায়। প্রবীরের মায়ের মনে নতুন স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়। মধুজা চলে গেলে তোর্সার কানে কানে ঠাম্মি বলে-” এই আন্টিটা কত ভাল না।” তোর্সা
অন‍্যদিকে তাকিয়ে বলে-“আমার মায়ের থেকে ভাল নয়।” 
 
ঠাম্মি তোর্সার মনের তল পায় না, ছেলের মনেরটাই পান না তো নাতনি। অফিসে প্রবীর আর মধুজাকে ঘিরে একটা পরিবেশ তৈরী হয়। সবাই জেনে যায় প্রবীরের ব‍্যাপারে মধুজার মনোভাব। ঘরে মা আর অফিস কলিগদের প্রচেষ্টায় শেষ অব্দি বরফ গলে। তোর্সার দাদুদিদাও জেনে খুশি হন। এবারে সামাজিকভাবে নয় শুধু রেজিষ্ট্রি করেই বিয়েটা সারে প্রবীর। মধুজা তোর্সাকে আপন করে নিতে আন্তরিক চেষ্টা করে।
 
প্রবীরের থেকেও বেশী তোর্সাকে সময় দেয়। এভাবে চলতে চলতে খুশির খবর বাতাসে ভাসে, মধুজা মা হবে। প্রবীর অতীত স্মরণ করে আতঙ্কিত হয় আর তোর্সা অকারণ গম্ভীর হয়ে যায়। 
 
মধুজার শারীরিক গঠন মজবুত হওয়াতে নতুন পরিস্থিতিতেও ওর অসুবিধে হয় না। তোর্সার একটা ফুটফুটে ভাই হয়। ও দূর থেকে দেখে মধুজার সঙ্গে নবজাতকের লেগে থাকা, ওর আবছা মনে পড়ে পল্লবীর অসুস্থতা। মধুজা অবশ‍্য ছবছরের তোর্সাকে ওর সন্তান পিপুলের থেকে আলাদা করে না, তবুও তোর্সাকে কি এক অতৃপ্তি ঘিরে থাকে।
 
পিপুলের আটমাস বয়সে মধুজারা  অফিসের একজনের বিয়ের নেমন্তন্ন পায়। কোথাও বিশেষ যাওয়া হয় না বলে প্রবীরের মা বলে-“আমি তোর্সা,
পিপুলকে নিয়ে আছি, মধুজা- তোমরা দুজন বিয়ে বাড়ির থেকে ঘুরে এসো।” তোর্সা বলে-“আমিও যাব বিয়ে বাড়ি।” শেষে তোর্সা, পিপুলকে নিয়েই প্রবীররা বেরোয়। পিপুল বাইরে বেরোনোর আনন্দে আরও হাত পা ছুঁড়তে থাকে।
 
প্রবীর  আর মধুজা গাড়ির সামনে, তোর্সা জোর করে পিপুলকে পেছনে নেয়। যেতে যেতে একটা জোরালো আলোয় প্রবীরের হাত শিথিল হলে বাম্পে ঝাঁকুনি খেয়ে  পেছনের গাড়ির দরজা খুলে যায়।
 
তোর্সা পিপুলকে ধরার বদলে ঠেলে দিল পাশের খাদের দিকে। আওয়াজে  হতচকিত প্রবীর আর মধুজা গাড়ি দাঁড় করিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পিপুলের প্রাণহীন দেহ আবিষ্কার করল।  মধুজা ওই শোকের মধ্যেও তাকিয়ে দেখল তোর্সার চোখে এক ফোঁটা জলও নেই।
 
সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top