সোনালি মুহূর্ত – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

কি জানি? ঠিকঠাক প্রেম টা পারতাম কিনা আমরা?

দীপ, কান্তা, রণ, প্রতাপ আর সায়নী… একগুচ্ছ হয়ে ফুটে থাকে আসানসোল থেকে বর্ধমান- এই লোকাল ট্রেনের কামরায়। এই রুটে গেছে অথচ ওদের খেয়াল করে নি এমন লোক কম আছে। কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা কী শীত এদেরকে দেখতে পাওয়া যায়। এরা প্রত‍্যেকেই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। শুধু ঋতু ভেদে এদের সাজ পোশাকটা একটু পাল্টে যায়। যেমন শীতকাতুরে দীপের তখন মাফলার মাস্ট, কদিন বেশ মাফলার ম‍্যান হয়ে ঘোরে। আবার রণের অন‍্য সমস‍্যা, ওর তীব্র গরম বোধ, তখন ওকে ফিনফিনে সুতির পাজামা-পাঞ্জাবীতে দেখা যায়।

আর সায়নী, ওর শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা অলটাইম স্কার্ট। সবার পোশাকের আলাদা আলাদা ট্রেডমার্ক থাকলেও বেচারা কান্তা থই পায় না বাকীদের সঙ্গে। ওর যা জোটে তাই ও পরে। ট্রেনের নিত‍্য হকার ক্ষেন্তমাসি ওদের ডাকে-“পুলাপান” আর ওরা মাসিকে কমলালেবু মাসি। ছেলেমেয়েগুলো সারাক্ষণ হইচই করলে কী হবে ক্ষেন্তমাসির দরকারে অদরকারে ওরাই ভরসা। যেমন মাসির নাতি-নাতনীদের বই-খাতা জামাকাপড়ের ব‍্যবস্থা করা। ঝালমুড়ি কাকু বিশ্ব-র সঙ্গেও ওদের খুব ভাব।

ওদের জন্য স্পেশাল ঝালমুড়ি থাকে। কোনদিন বিশ্ব-র ভাল বিক্রীবাটা না হলে ওরা ঠিক বুঝতে পারে। সেদিন বেশী বেশী ঝালমুড়ি কিনে খায়। একদিন ফেরার পথে কতকগুলো আজেবাজে ছেলের দল সায়নী আর কান্তাকে ট্রেনে অশ্লীল উক্তি করছিল, দীপ-প্রতাপ আর রণও ওদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছিল না। সেদিন দুষ্কৃতি দলটাকে উপযুক্ত জবাব দিয়েছিল ঝালমুড়ি কাকু। একসময়ে উনি ভাল বডি-বিল্ডার ছিলেন, সায়নীদের আগ্রহভরে নিজের অতীতে পাওয়া মেডেলও দেখিয়েছেন।

সায়নীদের আসাযাওয়ার পথে আর এক ভরসা পানাগড় থেকে ওঠা দিদিমণিদের একটা দল। হেন বাঙালির উৎসব নেই যা ওরা ট্রেনের কামরায় পালন করে না। রসুন সন্ধ‍্যা,অর্থাৎ রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, সুকান্তের জন্মদিন সবই পালন করে ট্রেনে। গতবছর দিদিমণির দলের সমর্থন পেয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে চিত্রাঙ্গদা অব্দি করেছিল; রণ,কান্তা,শুভাদি, রিমাদি ছিল গানে আর বাকীরা নাচে। রেল দপ্তরে হইচই পড়ে গেছিল। এ উপলক্ষ্যে ওরা প্রাইজও পেয়েছিল। দীপ, সায়নীদের দলটা এইভাবে ট্রেন যাত্রীদের ভালোবাসার বন্ধনেও জড়িয়ে পড়ে। দুবছর আগে যখন পুলওমার সৈন‍্যদের হত‍্যাকান্ড হল সেসময় ওদের কামরায় ছিল ওই ঘটনায় শহীদ একজনের মেয়ে।

মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে খবরটা শুনে ও দেখে ওর তো বাড়ি ফেরার মতো অবস্থা ছিল না। দীপ, সায়নীরা সেদিন মেয়েটিকে ওর বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল। এখনো ঐ পরিবারের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে। যাতায়াতের পথে যদি শুনল কারুর পড়ার বা চিকিৎসার খরচ জোগাড় হচ্ছে না, তখন সায়নীদের দলটাই হয়ে যায় আস্ত একটা ব‍্যান্ড, গান গেয়ে যতটা পারে টাকা তুলে দেয়।

এ হেন দলের সদস‍্য প্রতাপের বাবা যখন হঠাৎ মারা গেল আর কঠিন বাস্তবটা যখন প্রতাপের সামনে এসে পড়ল তখন রণ বলল-“দেখলি তো সবসময় ভাল কাজ করলেই তোমার সঙ্গে যে ভাল কিছু ঘটবেই এ ধারণা ঠিক নয়।” এইভাবেই ট্রেনের মধ্যে সুখে দুঃখে ওদের যৌবন কাটে, আসে প্রেম আবার তা ভাঙেও। তবে কান্তার গল্পটা একটু অন্যরকম হল। পানাগড়ের ওই দিদিমণিদের দলে একজন সদ‍্য স‍্যারের উদয় হল। কয়েকদিন পর দেখা গেল কান্তার সীটের বদল ঘটেছে আর দিব‍্যি হাসি-মজা-গল্প করতে শিখে গেছে।

রণরা পেছনে লেগে বলে-“কি রে কান্ত, স‍্যারের কাছে কি শিখছিস।” কান্তা চোখ পাকিয়ে বলে-“এসএসসির টিপস্ নিচ্ছি।” তা ওর ঐ টিপস্ কাজে লেগেছিল বইকি। ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েই এক ঢিলে চাকরিটা ঐ স‍্যারের স্কুলেই পেয়েছিল সাথে স‍্যারের সংসারটাও। সায়নীদের অবশ‍্য অসুবিধে হয় নি,ওরা যখন পিএইচডিতে ঢুকল তখন ব‍্যাগ কাঁধে করে কান্তাও সেই দিদিমণির দলের নিত‍্যযাত্রী। দেখাসাক্ষাৎটা থেকেই গেল, এখন রণ, দীপ, সায়নী আর প্রতাপকে দেখতে পেলে ছুটে ছুটে ওদের কাছে চলে আসে।

এভাবেই স্রোতের বহমানতায় ভাসতে ভাসতে প্রতাপের জীবনেও এলো প্রেম। ওর হৃদয়কে দোলায় দোলালো ময়ূরী। প্রফেশনাল ডান্সার, কলকাতায় মাঝেমধ্যেই অনুষ্ঠান করতে যায়, এইভাবেই প্রতাপের সঙ্গে আলাপ। ফিজিক্সের ব্ল‍্যাকহোল নিয়ে রিসার্চ করা প্রতাপ এখন নাচের ব‍্যাপারেও অনেক খোঁজখবর রাখে। হরিণ শিশুর নতুন শিং গজানোর মতো সদ‍্য শেখা নাচের কাহন দিয়ে আড্ডার আসর মাতাতে চায় আর বাকীরা তাতে শুরুতেই জল ঢেলে দেয়। ফিচেল দীপটার সম্বন্ধে সায়নী একপ্রকার নিশ্চিন্ত ছিল যে ওর ওসব প্রেমটেম আসবে না। কিন্তু অবাক কান্ড, সায়নীকে ভুল প্রমাণিত করে দীপ প্রেমে পড়ল ওর থেকে পাঁচবছরের বড় এক কলেজ লেকচারারের।

ট্রেনে এক হকারের হয়ে গলা ফাটিয়েছিল দীপের প্রেমিকা পিয়ালি আর তাতেই নাকি দীপ ওর মানবিক মুখ দেখতে পেয়েছিল। হ‍্যান্ডসাম দীপের পিয়ালিকে পটাতে অবশ্য বেশী সময় লাগে নি। সাথে প্লাস পয়েন্ট ছিল দীপের কাব‍্য প্রতিভা, এমন জীবনানন্দ মার্কা কবিতা দীপ আউড়েছে যে বনলতা থুড়ি মিস পিয়ালি ঘায়েল। দীপের এমন মাখো মাখো প্রেম দেখে সায়নীরও খুব প্রেম করতে ইচ্ছে করেছিল। তবে ও বস্তুটা বোধ হয় ওর কপালে নেই তাই ও একার কাব‍্য নিয়ে মেতেছিল.. এই মাউন্টেনিয়ারিং বা ট্রেকিং। মায়ের ঘ‍্যানঘ‍্যানানি কাব‍্যও ওকে ঘায়েল করতে পারে না। রণ আর সায়নীর ডিপার্টমেন্ট এক, মাইক্রোবাইলজি, তাই দুজন মোটামুটি পরামর্শ করে একই ট্রেন ধরার চেষ্টা করে।

সায়নীর সঙ্গে সেদিন আলাপ হল বৃহন্নলা কুসুমের। সমাজের প্রান্তিক করে ফেলে রাখা কুসুমের জীবনের কাহিনী সায়নীকে মুগ্ধ করল। কুসুম নিজের সঞ্চয়ের টাকায় একটা সেলাই স্কুল চালায়। নিজেদের জীবনের স্রোত যাতে অন‍্য খাতে বইতে পারে তারজন‍্য বাচ্ছাদের একটা স্কুলও করেছে। সায়নী কথা দিল কুসুমের কর্মকাণ্ড একদিন দেখতে যাবে ও সাধ‍্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। রণ এখন দেশ-বিদেশের জার্নালে লিখে ভালোই রোজগার করে। ও-ও কুসুমকে ভরসা দিল। এরমধ্যে ট্রেনে একদিন এক অবাক করা কান্ড ঘটল।

একজন প্রায় চল্লিশ বছর বয়সের একটা লোক বছর পনেরোর একটা মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে চলেছে। রণ আর সায়নীর উল্টোদিকের সীটে বসেছে ওরা। কিরকম বিহ্বল দৃষ্টি মেয়েটার, সঙ্গের লোকটার সঙ্গে যেন সহজ হতে পারছে না। ওদের হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছে লোকটা মেয়েটার কেউ হয় না। মেয়েটার বিপন্ন ভাব দেখে সায়নীর সন্দেহ হয়। ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করে।

সায়নীর জিজ্ঞাসাবাদে লোকটা যারপরনাই বিরক্ত হয়, চিৎকার করে বলে-“আমি কোথায় যাচ্ছি, কাকে নিয়ে যাচ্ছি,এসব আমার ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার, আপনি প্রশ্ন করে আমাদের বিরক্ত করছেন কেন?” সায়নীও তার উপরে গলা চড়িয়ে বলে-“রেল পুলিশের গুঁতো খেলে না সব ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার বেরিয়ে যাবে।” পুলিশের নাম শুনে মেয়েটা কেঁদে ফেলে বলে-“এই কাকুটা আমায় কাজ দেবে বলে শহরে নিয়ে যাচ্ছে,আমার কেউ হয় না।”আর যায় কোথায়, অন‍্যান‍্য যাত্রীরাও প্রতিকারে নেমে পড়ে। রেল পুলিশ এসে লোকটাকে ধরে জেরা করলে জানা যায় ও নারী পাচারকারী।

মেয়েটাকেও বাড়ি পাঠানোর ব‍্যবস্থা করা হয়। রণ ও সায়নী মেয়েটাকে বাড়ি পাঠানো নিশ্চিত করে পরের ট্রেনে বাড়ি ফেরে। ট্রেনের সফর চলতে চলতেই কান্তার একবছরের বিবাহবার্ষিকী এসে যায়। ট্রেনেতেই ওরা সুন্দরভাবে পালন করবে বলে ঠিক করে। কান্তার বর রক্তিমকে মাঝে বসিয়ে একদিকে কান্তা আর অন‍্যদিকে রণ গান ধরল-“এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বল না।” ওদের গান শেষ হতেই কে যেন গান ধরল-“তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো, আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।” ওরা অবাক হয়ে দেখল, টেনের মধ্যে একজন অচেনা বাউল এসে ওদের আনন্দের হাটে যোগ দিয়েছে।

ওই বাউলের গানই ছিল কান্তার স্পেশাল দিনের স্পেশাল পাওনা, যা কোনো জাগতিক পাওনার অনেক উর্দ্ধে। এমনই করে সুখে দুঃখে ট্রেনের চলমানতার মতো দীপ-সায়নীদেরও জীবনের চাকা ঘুরতে থাকে। ওরাও পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নিজেদের কর্মক্ষেত্র, সংসার নতুন নতুন জগতে নতুন মানুষ, সম্পর্কের ভীড়ে..পুরোনো সম্পর্কগুলো হারাতে থাকে। বছর পনেরো পারও হয়ে যায়। ওদের মনে আবার সবকিছু ফিরে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলভার জুবিলির ডাক পেয়ে। শত ব‍্যস্ততা সত্ত্বেও ওরা আসে ঐ অনুষ্ঠানে, শুধু প্রতীকের সঙ্গে দেখা হয় না। ওরা ওখানেই ঠিক করে আবার একদিন ওরা ওদের প্রিয় ট্রেন সফর করবে।

সেইমতো ওরা ঠিক করা জায়গায় মিলিত হয়। নানা কথায় ওরা নস্টালজিক হয়ে পড়ে। এইসময় কমলালেবুর ঝাঁকা নিয়ে ট্রেনে ওঠে বছর পঁচিশেকের এক যুবক। কান্তা বলে-“দেখ..দেখ..কমলালেবু যে বিক্রী করছে ও আমাদের সেই কমলালেবু মাসি ক্ষেন্তমাসির মতো দেখতে না।” ছেলেটা শুনতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়- “তোমরা কার নাম করলে? উনি তো আমার দিদা ছিলেন।” সবাই অবাক হয়ে যায়, রণ জিজ্ঞেস করে- “ক্ষেন্তমাসি কোথায়? ভাল আছে তো?” ছেলেটার চোখটা ছলছল করে ওঠে-“না গো দিদা আজ সাতবছর হল মারা গেছে।

তোমরা কি দীপদাদা, সায়নীদি এরা।” দীপ অবাক হয়ে-“তুমি আমাদের নাম জানলে কী করে?” ” দিদা আমাকে সব বলত, তোমরা তো আমাদের কত সাহায্য করেছো,”- ছেলেটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সায়নী ওকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করে-” লেখাপড়া শেষ কর নি?” “আমার মাথা মোটা ছিল গো, বোনটাকে এমএসসি পড়াচ্ছি, আশীর্বাদ কর যেন ও তোমাদের মতো হয়,”- স্পষ্ট স্বীকারোক্তি ক্ষেন্তমাসির নাতির। ওরা সবাই জোর করে বোনকে উপহার কিনে দেবে বলে টাকা তুলে দিল।

ওর নাম বিপিন, ওর কোনো আপত্তিই ওরা শুনল না। বিপিন ওদের নমস্কার করে চলে যেতেই, টিকিট চেকার ঢুকল। রণ ও দিকে তাকিয়ে-“দেখ সবাই…টিকিট চেকারকে কেমন চেনা লাগছে না।” ও দিকটাতে চোখ পড়তেই সবাই সমস্বরে-“আরে… প্রতীক..তুই, এলি না কেন ইউনিভার্সিটিতে?” এতদিন পর ওদের হঠাৎ করে দেখে প্রতীকও চমকে যায়, কাছে এসে বলে-“নিয়ে নিলাম রেলের এই চাকরিটা, তোরা তো জানতিস বাবা হঠাৎ করে মারা গেলেন।” সবাই প্রতীকে ওদের পাশে বসায়, ওর সংসারের খোঁজ নিতে ব‍্যস্ত হয়ে পড়ে। সায়নী এই খুশীর মুহূর্ত তুলে রাখতে মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরে বলে-“স্মাইল প্লিজ”….”খ‍্যাচ”…একটা স্মরণীয় মুহূর্ত ওদের জীবন খাতায় জমা পড়ে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top