স্বজন – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

 [post-views]

রবি বাবু ! 
আপনার একটি উপদেশ মূলক চিঠি গত কালের ডাকে আমি পেয়েছি. সে চিঠিতে আপনি লিখেছেন, হতাশা আর ব্যর্থতা  নিয়ে তো অনেক কিছুই অনেকদিন ধরেই লিখলে,এবার মিলনাত্মক কিছু  লেখো . 
 
         আপনি ঠিকই বলেছেন,  এসব আজকাল কেউ পড়ে না. একঘেয়ে, চর্বিত চর্বন. সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়. তবে মিলনাত্মক একেবারেই লেখা হয় নি-এটা ঠিক নয়. কেউ কেউ আবার বলেছেন, আমার কবিতাগুলি বিবৃতি ধর্মী. 
 
    আসলে আপনার মতো বিশ্ববন্দিত প্রতিভা আর এলো কৈ? গানে, গল্পে, কবিতা, নাটকে, উপন্যাসে, ছবিতে আপনি যে সব  স্থাবর সম্পদ রেখে গেছেন -তারপর আর কারও কিছু বলার নেই. আনন্দ -বেদনা, সুখ- দুঃখ সবেতে আপনিই শেষ কথা. আপনিই  আমাদের দ্বিতীয় বেদব্যাস. একজন কবি বলে ছিলেন, কে আর  হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জানাতে ভালোবাসে?  আর একজন কবি বলেছিলেন,  অমল কান্তি রোদ্দুর হতে চেয়ে ছিল. এ রকম দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যেতে পারে. কিন্তু আমি তো অমল কান্তি হতে চায়ই নি. শুধু নীরার জন্যও কবিতা লিখতে পারিনি. আর যে যাই লিখুন -আপনাকে অতিক্রম করা যায় কী?যায় না——–
 
          আমি তো জীবনের পড়ন্ত বেলায় ফিরে দেখার মতো সব কিছু দেখতে চাইছি. হ্যাঁ, একদিন আমার মতো অতি  ক্ষুদ্র জীবনেও আপনার মহৎ জীবনের মতো আনা বা আন্না কিংবা কাদম্বরী, ওকাম্পো, নলিনীদের মতো বা বনলতা কিংবা নীরার মতো কেউ কেউ ছিল. তবে দু’দিনের জন্য. তারা সব শিউলি ফুলের মতো সন্ধ্যায় ফুটে ছিল, সকালে ঝরে গেছে. তবে আপনার মতো দার্শনিক বা প্লেটোনিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো যোগ্যতা আমার ছিল না. আপনি যে দৃষ্টিতে জীবনকে দেখেছেন, নিজেকে দগ্ধ করেছেন, ভেঙেছেন, গড়েছেন, ব্যবহার করেছেন সেসব  ক্ষমতার  এক কণাও  যদি পেতাম -তাহলেএতদিনে  সোনা হয়ে যেতাম. তাই তো আমার জায়গা দুদিন বাদে  কিছু বিবর্ণ হয়ে যাওয়া স্মৃতির পাতাতেই থেকে যাবে. কিংবা আমার অবর্তমানে আস্তাকুঁড়ে—–
 
        আর দু’জন দুঃখী, অথচ বিশেষ  প্রতিভার  কথা এই সময়ে  মনে পড়ছে. কাজী নজরুল  ও শরৎ বাবুর কথা. একজনকে আপনি ধূমকেতু বলেছিলেন. তিনিও  প্রথমে যাকে  জীবনে চেয়েছিলেন, তাকে চুরুলিয়াতে বসেই  চোখের জল ফেলতে হয়েছিল. আর শরৎ বাবুর রাজলক্ষ্মীকে  বাস্তবেও ও উপন্যাসে রাজলক্ষ্মী হয়েই থেকে যেতে হয়েছিল. দুজনেই দারিদ্রজয়ী সেই সঙ্গে মানসপ্রেমীও বটে. একজন বিদ্রোহী তকমা নিয়ে বেঁচে গেলেন আর একজন দেবদাস না হয় শ্রীকান্ত. আপনার মতো গভীর ভাবে  কেউ জীবনকে  ছুঁয়েও দেখেনি, ভেবেও দেখেনি. আপনি অমৃত – গরল সর্বত্রই আছেন. এক গীতিকার অনেক চিন্তা ভাবনা করেই লিখেছিলেন, সবার হৃদয়ে রবীন্দ্র নাথ আর চেতনাতে নজরুল. আর শরৎ বাবু পুরুষ -নারীর সম্পর্কের টানাপোড়েনে কিংবা অন্ত:মিলের প্রয়োজনে নারী জাতিকে মহান করে দিয়ে গেছেন. তিনি দু ‘প্রকার দারিদ্র দেখিয়ে গেছেন. এক মানসিক, অপরটি আর্থিক. নাহলে অভাগীর স্বর্গ, মহেশ লেখা হতো না. হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জানাতে গিয়ে বলে বসতেন না, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়’. কিংবা ‘সংসারে যারা শুধু দিলে পেলেনা কিছুই—‘. আর রবিবাবু, আপনার  কোনটা উল্লেখ করবো বলুন তো?  আপনি  তো আমাদের সকলের বাতিঘর. –মিলনে -বিরহে, প্রেমে -অপ্রেমে আপনিই  অনন্য, অপরিমেয়. চোখের জল মুছিয়ে দেবার একমাত্র সঙ্গী বা আশ্রয়.  
 
         আপনাকে  কিংবা  আরও অনেককে পড়ার  পর  আমার মতো এক কানা, খোঁড়া, বোবার কবিতা, গল্প, উপন্যাস কেন লোকে পড়বে বলুন তো?  আপনি আজও বেঁচে আছেন  –বা থাকবেন আপনার স্থায়ী সম্পদ নিয়ে   মানব  সভ্যতা যত দিন থাকবে–ততোদিন. আর আমি? চিতাতেই সব  শেষ. 
        এখন শুধু সময় কাটানোর জন্য এইসব ছাই -পাঁশ লিখি.পাতা নষ্ট হবে বলে সচরাচর কেউ আমার লেখাপত্র ছাপে না. তাই এই নিকৃষ্টের ভরসা কেবল ফেইসবুক. অন লাইন ম্যাগাজিন. ক ‘জন পড়ে কে জানে? 
 
    জানেন রবি বাবু, প্রিয়জনেরা খুব রাগ করে. কেউ বলে বুড়ো শালিখের ঘাড়ে —-না হয় মতিভ্রম. 
 
             নিতান্তই মানসিক ক্ষিদে মেটানোর জন্য অনেক বছর ধরে একটা চটি সাহিত্য  পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করে আসছি.  তাতেও কারও কারও আপত্তি. অতো   নিজেকে জাহির করার বয়স আর আছে? যত সব বাজে খরচ. পেনশন-এর টাকায় আত্ম প্রচার আর কী !শখ বটে. I
        কিন্তু মন যে মানতে চায় না রবিবাবু !
 
বিবমিষা কিছুতেই যেতে চায় না. এর মধ্যে আবার অনাত্মীয় একজন  নিজেই এই   তুচ্ছ কবির কবিতা আবৃত্তি করে ভি ডি ও-য় ধরে  পাঠায়. তাতেও বিরক্তি. নয়তো সেই একটা ভালো শব্দ আছে না  -ব্যাজস্তুতি. 
 
            তাই তো মনের কথাগুলো আপনাকে এতদিন পর খুলে বলছি. আপনি আমার অভিভাবক. আপনি  ছাড়া কে শুনবে বলুন?   আপনি আমার আত্মার আত্মীয়, প্রকৃত স্বজন. 
 
        পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তাহলে গুরু -শিষ্যে আবার দেখা হবে. কিন্তু সেখানেও তো গরমিল. আপনি  ইহলোকে না থেকেও অক্ষয় বট হয়ে আছেন.  চিরকাল থাকবেন——- 
 
      আর আমি তো  এখনও পাঁকে পদ্মফুল ফোটাতে চাইছি.আপনার -আমার মাঝে সময়, বয়স সর্বোপরি প্রতিভার   আসমান -জমিন ব্যবধান.
 
আচ্ছা রবি বাবু!শেষে, আপনার কাছে  একটা বিনীত  প্রশ্ন আছে. পাঁকে পদ্মফুল সত্যিই ফোটে? আপনি কখনো দেখেছেন? 
          
মনে হয় —না!
অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top