হারানো সুর – সুতপা ব‍্যানার্জী( রায় )

– 

[post-views]

কুসুম রান্নাঘর থেকে হাঁক পারল শাশুড়ি প্রভার উদ্দেশ্যে –
” রোজ রোজ এতো খ‍্যাটনের রান্না করতে পারব না, এবার নিজের নিরামিষটা নিজেই করে নেবেন।” ও দিক থেকে উত্তর এলো-” নিরামিষের ছিরি কি, ওই তো আলু সেদ্ধ, উচ্ছে সেদ্ধ, নাহলে পেঁপে সেদ্ধ; তাতে এতো কথা শোনাও কেন বাছা।” দুজনের ধুন্ধুমারের মাঝে একনিষ্ঠ সাধিকার মতো গেয়ে চলেছে টুকুন, কুসুমের একমাত্র মেয়ে। ভৈরব রাগের “জাগো মোহন পেয়ারে”- সুরের ঝর্ণাধারায় বিশ্বপ্রকৃতিকে আলোকিত করছে।
দুপুরে খেতে বসে প্রভা বলল-” ঘরে একটু দই-ও তো পেতে রাখতে পারো বউমা, বুড়ি এই শাশুড়ির জন‍্য।” কুসুম উত্তর দিল-” আপনার ছেলে তো অকালে চলে গেল, বাপের জমিদারী কিছু পায় নি যে প‍্যাকেট প‍্যাকেট দুধের ব‍্যবস্থা করব।।” টুকুন মুসুর ডাল, আলুসেদ্ধ দিয়ে সোনামুখ করে ভাত খেয়ে উঠে চলে গেল। কুসুমের কাজ সারার ঝনঝনানি কানে এলো, আওয়াজগুলো যত না দ্রুত কাজ সারার, তার চেয়েও বেশী জগৎ সংসারের ওপর রাগের।
রাতে চা হাতে নিয়ে মেয়ের রেওয়াজ শুনতে বসল কুসুম; টুকুন চোখ বুজে গেয়ে চলেছে বিলাবল,-” বেগ দরশন দাও কৃষ্ণমুরারী, গোবর্ধন গিরিধারী।” প্রভাও নিমিলিত চোখে শুনছে, খুলে যাচ্ছে মনের দরজা, যেখানে স্মৃতিরা চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। টুকুনের ঠাকুর্দা এই হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে গাইছেন-” তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”- প্রভা পাশে বসে শুনছে, টুকুনের বাবা পল্লবের তখন চার বছর বয়স। তারপর কোথা দিয়ে যে কিসব হয়ে গেল, পথ দুর্ঘটনায় স্বামী মারা গেলেন, শোকে আকুল হয়েও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রভাকে শক্ত হতে হোল। তিলে তিলে কষ্ট করে মানুষ করলেন পল্লবকে, বয়স হতে বিয়েও দিলেন,- ভাবনায় ছেদ পড়ল কুসুমের ডাকে।” মা তোলা কাপড়গুলো একটু ভাঁজ করে রাখতে পারতেন, যে পাষাণভার আপনার মনে, আমার মনেও তো তাই।” প্রভা চোখ মুছে উঠে পড়লেন, মনে মনে ভাবলেন কুসুমেরও তো তারই মতো কপাল হল, ক‍্যানসারের থেকে ফেরাতে পারলেন কই ছেলেকে।
পরদিন গানের মাষ্টার সকাল সকাল এসে হাজির হলেন, ” ও মাসিমা মিষ্টি খাওয়ান, টুকুন জি-বাংলার অডিশনে চান্স পেয়েছে।” গোটা বাড়ির পরিস্থিতি পলকে বদলে গেল।
সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top