হুইস্কি বাবার মন্দির – সিদ্ধার্থ সিংহ

এই মন্দিরে দেবতার ভোগে কখনও খিচুড়ি দেওয়া হয় না। দেওয়া হয় না বাতাসা, নকুল দানা কিংবা প্যাঁড়া। এই মন্দিরের ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় একমাত্র তরল পানীয়— হুইস্কি, রাম কিংবা ওয়াইন। সোজা বাংলায় যাকে বলা হয় মদ।

এই মন্দিরটি রয়েছে ভারতেই। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনির এই কাল ভৈরব মন্দিরে আরও অন্যান্য ব্যান্ডের মদ দিলেও যেহেতু হুইস্কিই বেশি দেওয়া হয়, তাই স্থানীয়দের কাছে এই মন্দিরটি হুইস্কি বাবার মন্দির নামেও বেশি পরিচিত।

অনুমান করা হয়, রাজা ভদ্রসেন এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। হাজার হাজার বছরের প্রাচীন স্কন্দ পুরাণের অবন্তী খণ্ডে এই কাল ভৈরবের অর্চনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

পুরনো একটি মন্দিরের উপর বর্তমানের এই মন্দিরটি তৈরি হলেও প্রাচীন এই মন্দিরের উৎপত্তি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মন্দিরটি নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল।

কথিত আছে, প্রাচীন কালে তন্ত্র সাধকরা এই মন্দিরে বসেই পঞ্চমকার সাধনা করতেন। মানে মদ, মাংস, মাছ, মুদ্রা ও মৈথুন দিয়ে অর্চনা করতেন। সেই থেকেই এই মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে মদের প্রচলন শুরু হয়।

বর্তমান মন্দিরের গঠনশৈলীতে মারাঠা স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে পুরো মাত্রায়। মারাঠা জেনারেল মহাদোজি শিন্ডে এই মন্দিরের দেবতাকেই তাঁর পাগড়ি উৎসর্গ করেছিলেন।

এ মন্দিরের দেবতাকে কেউ যদি মদ না দিয়ে অন্য কোনও কিছু দিয়ে পুজো দেন, তা হলে নাকি কাল ভৈরব তার উপরে খুব রুষ্ট হন এবং তার কোনও মনোবাঞ্ছা পূরণ হয় না।

তাই এই মন্দিরের দেবতাকে শুধুমাত্র হুইস্কি, রাম বা ওয়াইন দিয়েই পুজো করা হয়। এমনকী, এখানে আসা ভক্তদের প্রসাদ হিসেবে মদের বোতলই দেওয়া হয়।

পার্কিং লট থেকে মন্দিরের মূল ফটকের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে রাস্তার দু’ধারে‌ ডালার দোকানের মতোই সার সার দোকান, যেখানে প্রকাশ্যে বিদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হুইস্কি, রাম ও ওয়াইন বিক্রি হচ্ছে।

দর্শনার্থীরা পুজো দিতে যাওয়ার জন্য এখান থেকেই মদ কিনে নেন। পুজোর ডালায় ফুল বেলপাতার সঙ্গে থাকে এক বোতল হুইস্কি বা রাম। তবে না, এখানে বাংলা মদ চলে না।

ভোগ হিসাবে পুরোহিতের হাতে পুরো বোতলটাই তুলে দেওয়া হয়। একটা কানাউঁচু থালায় সেই বোতল থেকে বেশ খানিকটা ঢেলে নেন তিনি। তার পর সেই হুইস্কি, রাম বা ওয়াইন দেবতার সামনে থালায় করে সাজিয়ে দেওয়া হয়।

দেবতা নাকি সেই হুইস্কি কখনও-সখনও খানিকটা খেয়েও নেন। এটা নাকি অনেক দর্শনার্থী স্বচক্ষে দেখেওছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, শিবের সামনে মদ দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা উবে যায়। থালাটি খালি হয়ে গেলেই কাল ভৈরবীর সামনে থেকে সেটা সরিয়ে দেওয়া হয়।

চোখের সামনেই এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। তবে কেউই জানতে পারেন না ১০০ বোতল মদ কী ভাবে নিমেষে‌ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে এটাই হয়ে আসছে।

যদিও এ নিয়ে নানা রকম গল্প প্রচলিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অনেকেই দুনিয়া তোলপাড় করা গণেশের সেই দুধ খাওয়ার ঘটনাটিরও তুলনা করেন। তবে পুরোহিতদের দাবি, ওই মদ হুইস্কি বাবার মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত দেবতা স্বয়ং কাল ভৈরবীই খান। কারণ, কাল ভৈরবের মুখে কোনও গহ্বর নেই। নেই কোনও কারসাজি বা চালাকিও।

Siddhartha Singha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top