হে আমার

 13 total views

হে আমার // ড. ময়ূরী মিত্র
___________________________
গতবছর কোভিডে সে আসে আমার কাছে | ব আমি দেখা পাই তার | আজো সে আছে কোথাও না কোথাও |

এক শ্রমিকের কথা বলব | এক অটোচালকের সৎ থাকার শেষ চেষ্টার কথা বলব | এবার অটোচালককে ঠিক কী জাতীয় শ্রমিক হিসেবে ক্লাসিফাইড করা যায় — তাঁকে পরিযায়ী উড়ন্ত না বঙ্গভঙ্গের স্বদেশি শ্রমিক বলবেন কিনা সেটা আপনারা ঠিক করে নেবেন | আপনারা মানে প্রশাসক ,পারিষদ ,এবং সভাসদ | সভাসদটা একটু স্যানিটাইজার নিয়ে স্লাইট করে পরিষ্কার করে দি | এঁরা হলেন ড্রাম পেটানোর মত ঘন ঘন দল বদল করা ” এলিট ইন্টেলেকচুয়াল ক্লাস ” | ড্রামে দুবার কাঠি পেটানোর মধ্যে যেটুকু গ্যাপ থাকে তার মধ্যেই নিজের এরা যে যার ধান্দা বুঝে বক্তব্য রাখে জানা অজানা যেকোনো বিষয়ে | হতভাগাদের আমি বলি ” ইমলি ঝিমলি ক্লাস ” | দুটোই সমান আছে এদের –ভদ্রলোক বলে নিজেকে অহরহ স্বতন্ত্র ভাবা , শ্রমিককে মাঝে মধ্যে বঙবেলুন ছোঁড়ার মত দরদ ছুঁড়ে মারা এবং তার সঙ্গে প্রচুর বুদ্ধি | তো এই তিন জাত –প্রশাসক ,পরিষদ এবং The Most Dangerous সভাসদ নিজেদের ঘোড়ার ডিমের অবস্থান ভুলে মেরে দিলেও শ্রমিকের ক্লাসিফিকেশন করতে সিদ্ধহস্ত হয়ে যাচ্ছেন দিন কে দিন | এমনকি শ্রমিক কী খাবে ,কতটা খাবে কোথায় ঘুমোবে , কতটা ঘুমোবে , কোথায় অনর্গল হিসু পটি করতে করতে মরেও যাবে –সব –সব ঠিক করবে এই বজ্জাতরা | ঠিক করার সময় মুখেচোখে নিউট্রাল ব্যঞ্জনাও রেখে দেবে ছিটেখানিক |

গপ্পে আসি |

কাল ফিরছি সল্টলেক থেকে নাগেরবাজার | এক অটোওয়ালা এলেন | বললাম –সোজা নাগেরবাজার রিজার্ভ করে যাব | আমার সঙ্গে ছিলেন অতনু | ওর ক্লান্তি দেখে অটোওয়ালার প্রথম প্রশ্ন —” শরীর খারাপ নাকি ? ঘাম জমেছে তো কপালে ! আসুন | আসুন | ”

উঠে বললাম –” কত নেবেন ? সেই ট্যাক্সির ডবল তো ? বলুন কত নেবেন ঠিক ? ” মৃদু হাসলেন চালক –” আপনি বলুন | আমি শুনি | রোজ তো আমরাই বলি তাই না ? আজ আপনি বলুন !” শান্ত স্নিগধ কথায় রাগ আরো বাড়ল বা ইচ্ছে করে রাগ বাড়ালাম | ওই যে বললাম –ইমলি ঝিমলিদের বুদ্ধি খুব | —” দেখুন নাগেরবাজার যেতে এখান থেকে ঠিক দেড়শ টাকা ভাড়া | তার থেকে বড়জোর —-|” বাক্য শেষ হল না আমার | তিনি বললেন –” হ্যাঁ আপনি সঠিক | দেড়শই ভাড়া | ” দ্বিতীয়বার থমকালাম।

সারাটা পথ নাক কুঁচকে বসে আছি ওঁর নোংরা জামার দিকে তাকিয়ে | দেখলাম গাড়ির গ্লাস দিয়ে আমায় দেখছেন আর হাসছেন | পথে এক বন্ধু উঠল অটোচালকের | মাস্ক দুলছে হৃদপিণ্ডের কাছে | মুখে ধোঁয়া | মৃদু গলায় বন্ধুকে বললেন –” পরের স্টপে নেমে যা সিগারেট বন্ধ যদি না করিস | ” কান পেতে শুনলাম শ্রমিকের স্বাস্থ্যকথা | আমাদের মত সরবে নয় | নরম বোধে উজ্জ্বল শ্রমিকের বার্তা |

নাগেরবাজার মোড়ে এসে অতনু বললেন –” আমার তো পেসমেকার আছে | যদি বাড়ির সামনে –এই পাঁচটা বাড়ি পরেই আমাদের বাড়ি |”

—” দূরে হলেও আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাব |” বাড়ির সামনে দাঁড়ালো অটো | ইমলি মানে নিজেকে স্বতন্ত্র করে ফেলব এই ইচ্ছেটা ততক্ষণে অনেক বড় হয়ে গেছে আমার | ইচ্ছে করেই ফোলালাম তাঁর জন্য নিজের দুঃখভাবকে | —” আপনাকে ফাঁকা ফিরতে হবে তো ! ডবল নিন | দিচ্ছি |”

—-“আমাকে ডবল দিতে হবে না | আমি এদিকেই আসতাম `| বাঙ্গুরের নির্দিষ্ট পাম্প থেকে পেট্রোল নি তো ! আর দিদি আমার জামাটা নোংরা নয় | কেচে কেচে পুরোনো ছাপ ধরে গেছে | কিন্তু পরিষ্কার | নোংরা জামা পড়ে কি আপনাদের তুলতে পারি ? কত অসুস্থ লোক উঠছেন আমার গাড়িতে ! তাদের ক্ষতি হবে তো !”

দেখলাম –সারাক্ষণ গাড়িতে আমার রুষ্ট থাকাটা ব্যাথা দিয়েছে ওঁকে | খুব ব্যাথা | স্বল্পভাষী মানুষটি আর নিজেকে থামাতে পারছিলেন না তাই | পরপর তরতর করে বলে চলেছিলেন —” দেশের এই দুর্দিনেও দেখুন মানুষ কেমন নিজে সবথেকে বেশি উপার্জন করব ভেবে চলেছে | এখনো এই ভাবছে এরা ? দিদি ? চারগুণ পাঁচগুণ ভাড়া চায় আমার বন্ধুরা | এত বারণ করি ! শোনে না | দিদি শোনে না | বোঝে না একটা ট্যাক্সিওয়ালা অন্যায্য টাকা নিলে বাকিগুলোও মানুষের বিশ্বাস হারাবে | ”

বলতে বলতেই অভিমানে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলেন আমার বিকেলবেলার উত্তমকুমার |

গল্পটা বড় হয়ে গেল খুব ? না ? আরে বড় হয়ে গেল তো লগি দিয়ে টেনে জঞ্জালের গাড়িতে ফেলে দিন ! দেখবেন — নোংরায় বাচ্চাদের ভাতের দলার মত ছোট্ট হয়ে থাকবে গপ্পটা | আবার বলা যায় না — শিশুর মুখ থেকে নালমাখা ভাত ছিটকোবার মত হয়ত এক দেশপ্রেমিক ছিটকে যাবে চারদিকে ! আর তার মরা শরীর থেকে উঠতে লাগবে ফোটা পদ্মের গরম গন্ধ ! ——Classified

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *