১২৫তম জন্মজয়ন্তীর শ্রদ্ধাঞ্জলি – নেতাজীর দেশত্যাগ ও আজাদ হিন্দ – বাহিনী সম্পর্কে দু ‘চার কথা – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে শুধু দেশ নায়ক নয়, বিপ্লবের সন্তান বলাই শ্রেয়. কেননা গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকলেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করে সহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন. নেপোলিয়নিও ভাবধারা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল. জাগ্রত বিবেক বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর জীবন দর্পণ. দেশবন্ধু ও বাসন্তীদেবীর দ্বারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ।

ব্রিটিশ সরকার সুভাষের এই মনস্তত্ব বুঝেই 1940, 2 জুলাই তাঁকে ‘ভারত রক্ষা আইনে ‘ গ্রেপ্তার করে. কারারুদ্ধ হওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন. তাই তাঁকে এলগিন রোডের বাড়িতেই গৃহ বন্দী করে রাখা হয়. এই বাড়ী থেকেই পাহারা দেওয়া পুলিশএর চোখে ধুলো দিয়ে(17 জানুয়ারি, 1941) অবাঙালির ছদ্মবেশে শিশির বসুর সহায়তায় মোটর গাড়িতে চেপে গোমো স্টেশনে গিয়ে ওঠেন.উদ্দেশ্য একটাই: অহিংস মতবাদ নিয়ে দেশ স্বাধীন করা যাবে না. ব্রিটিশ সরকারকে মারের বদলে মারই দিতে হবে. তাই এক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন. শত্রুর শত্রু আমার মিত্র এই ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ছিলেন ।

প্রথমে পেশোয়ার থেকে আফগানিস্তান, পরে মস্কো অতঃপর বার্লিন. 28 মার্চ, 1941.ইতিপূর্বে বন্দী হওয়া ভারতীয়দের নিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত নাম্বিয়ার, ডঃ এম. আর ব্যাস, ডঃ গিরিজা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ’র সহযোগিতায়’ আজাদ হিন্দুস্থান বেতার কেন্দ্র ‘গঠন করে সবধর্মের দেশবাসীর সমর্থন চান. তিনি যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে গড়ে তুললেন Free Indian Legion (মুক্ত ভারতীয় সেনা দল ).এই সেনা দলের প্রতীক হলো :উল্লম্ফনরত বাঘ. সুভাষ এই পর্বে হিটলারের সাহায্য চেয়েও পান নি. ইতিমধ্যে বিপ্লবী রাস বিহারী বসু জাপানে এক স্বতন্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন. এঁদের লক্ষ্য ছিল: আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন. প্রথমে 1942, 1সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে রাস বিহারী বসু ও ক্যাপ্টেন মোহন সিং “আজাদ হিন্দ ফৌজ “গঠন করেন. কিন্তু বিভিন্ন কারণে শ্রী সিং -এর সঙ্গে মত পার্থক্য দেখা দেওয়ায় সুভাষ চন্দ্র বসুকে রাস বিহারী বসু নব গঠিত সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক -এর দায়িত্ব নেবার আমন্ত্রণ জানান. সুভাষ সাগ্রহে তা মাথায় তুলে নেন.(1943, 25 অগাস্ট ) ।

জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সুভাষ-এর যোগ্য নেতৃত্বে এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরী হয়. আজাদ হিন্দ ফৌজের ডাকে ‘দিল্লী চলোর’ ঘোষণা করা হয়. এক বেতার ভাষণে এই সঙ্গে সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি. “এটি একটি স্মরণীয় আহ্বান বা উক্তি হয়ে সারা পৃথিবীর ভারত বাসীকে আন্দোলিত করে ।

শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায় . সেনা সদস্যরা সুভাষ চন্দ্রকে “নেতাজী “হিসেবে মেনে নেয়. আজাদ হিন্দ বাহিনীতে গান্ধী ব্রিগ্রেড, নেহেরু ব্রিগ্রেড, ঝাঁসীর রানী ব্রিগ্রেড(ক্যাপ্টেন: লক্ষ্মী স্বামী নাথন ) তৈরী হয়. এই পর্বে সুভাষের দেশপ্রেম, নেতা -নেত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রশ্নাতীত ভূমিকা নেয়. শাহনওয়াজ খান সুভাষ ব্রিগ্রেডের দায়িত্ব পান ।

1943, 23 অক্টোবর সিঙ্গাপুরে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়. শুরু হয় ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ. জাপান, জার্মানি, ইতালি মোট আটটি দেশ সেই স্বাধীন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়. জাপান উপহার হিসেবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (1943, 6 নভেম্বর )আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে অর্পণ করে. প্রধানমন্ত্রী তোজো নেতাজীকে পূর্ণ সমর্থন জানান. নেতাজী আন্দামানের নাম রাখেন শহিদ দ্বীপ আর নিকোবরের নাম রাখেন স্বরাজ দ্বীপ ।

1944, 14 এপ্রিল মণিপুরের মৈয়াং -এ ও কোহিমায় স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা তোলা হয়. ব্রিটিশ শক্তিকে নিয়ণ্ত্রণ করার জন্য ইম্ফল দখলে নিয়ে আসা হয় ।

কিন্তু বিধি ছিল বাম. দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানি, জাপান হেরে যায়. মিত্র শক্তি জয় পায়. ফলে সুভাষএর ভারত জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়. কেননা আজাদ হিন্দ ও সর্বোপরি নেতাজী সামরিক দিক দিয়ে জাপানের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন.দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হয়েও তাঁকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্যাভাব, বিষাক্ত কীট পতঙ্গের সম্মুখীন হতে হয় ।

পরবর্তী পর্যায়ে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার অনভিপ্রেত সংবাদ প্রচারিত হয়. দিনটি ছিল–1945, 18 অগাস্ট।

জাতি এই দু :সংবাদ আজও বিশ্বাস করে না . নেতাজী পরিবারের সদস্যরা সকলেই এই সংবাদ বিশ্বাস করেন না. কেউ কেউ করেন ।

সমাজতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে মহাত্মা গান্ধী স্বীকার করে ছিলেন, “যদিও আজাদ হিন্দ ফৌজ তাঁদের আশু লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন নি, তথাপি তাঁরা এমন কিছু করেছেন , যে জন্য তাঁরা গর্ববোধ করতে পারেন . সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, তাঁরা একই পতাকার তলে ভারতের সকল ধর্ম ও জাতির মানুষকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন. ধর্মীয় ও অন্যান্য ভেদবুদ্ধির উর্দ্ধে তাঁরা একতা ও সংহতির আদর্শ সঞ্চারিত করেছেন । “

সেদিন জার্মান ও জাপান দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত না হলে আজাদ হিন্দ ফৌজকে ব্যর্থতার মুখ দেখতে হতো না. আজাদ হিন্দ বাহিনী ও সুভাষ -এর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই. তিনি ভারত আত্মার প্রতীক. প্রকৃত অর্থে দেশ নায়ক ।

শেষে, আক্ষেপ শুধু একটাই :স্বাধীনতার পর একাধিকবার বিভিন্ন নামে গুরুত্ব পূর্ণ কমিশন বসলেও সরকারি উদাসীন্যে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সঠিক মৃত্যু দিন সর্বোপরি চূড়ান্ত সংবাদ আজও ঘোষণা হলো না !

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি রহস্য জনক অধ্যায় হিসেবেই আজও থেকে গেল ।

story and article

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top