বিনু  – নুজহাত  ইসলাম  নৌশিন

বিনু – নুজহাত ইসলাম নৌশিন

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:November 27, 2020
  • Reading time:1 mins read

বিনুর রাগ লাগছেভয়াবহ রাগ, কিন্তু প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে নাসভ্য সমাজে থাকার অনেক ঝামেলামুখের উপর ফটাফট কথা বললে বেয়াদব তকমা শোনা লাগেকিন্তু এখন এমন অবস্থা কিছু না বললে আরো পেয়ে বসবেআর কথাটা বলতে গিয়েই  নীল রঙের দোতলা বাড়িতে একটা ছোটখাটো কালবৈশাখী হয়ে গেলো। 

   –দেখেছিস? তোর মেয়ে মুখে মুখে তর্ক করেআমি খারাপটা কি বলেছি, এ্যা। 

নীলুফা বেগম বিনুর নানিকে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন নাএই মহিলা প্রত্যেকটা কথার শেষে এ্যা  জাতীয় প্রশ্নবোধক ঝুলিয়ে রাখেনিজের মা বলে কিছু বলতেও পারেন না কঠিন করেকিন্তু নাতনির  সাথে কেমন ব্যবহার

   বিনু কথাটা এমন ভাবে বলতে চায়নিকিন্তু মাসের এই কয়েকটা দিন কারো ভালো কথা অসহ্য রকম লাগেমনে হয়, আমায় একটু একা থাকতে দাওসব সময় তো তোমাদের বকবকানি শুনছিইকিন্তু কপাল খারাপ ,এই সময় অকারণ ফালতু কথা গুলো আরো বেশি শুনতে হয়।  আজ একটু আগে যেমন শুনলো আর সহ্য করতে না পেরে উত্তর দেওয়ায় একটা ঝামেলা হল

    সুন্দর সকালটা যেন ছুরির  ফলা দিয়ে কেউ  কেটে দিয়েছেতীব্র ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙার পর দেখল যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।  সাদা ফুল তোলা বিছানায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগতার মানে অনেকক্ষণ হল ঘটনাটা ঘটেছেপ্রথম কয়েকটা দিন ব্যথা অসহনীয় পর্যায়ে থাকে বিনুর । 

  আচ্ছা সবার বেলায় কি ব্যথার তীব্রতা এমন থাকেভাবতে ভাবতে তলপেটে হাত দিয়ে চেপে ধরলনাহ্, বাড়াবাড়ি রকম লাগছেআশেপাশে কেউ নেই যে একটা হুট ওয়াটার ব্যাগে গরম পানি এনে দিবেনিজে এই কাজটা করতে গেলে রান্নাঘর অবধি যাওয়া লাগবে, আর  বাকিদের চোখে পড়বে । 

     সকাল নয়টার দিকে আজহার সাহেববিনুর বাবা সোফার রুমে খবরের কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখেন।  রান্নাঘরে যেতে হলে এখন বিনুকে তার বাবার সামনে দিয়ে যেতে হবেজামার পিছনে দাগ নিয়ে যাওয়াঅস্বস্তি করআবার এই শীতের সকালে গোসল করা আরেক কাণ্ডতাতেও তো গরম পানি লাগছেই। 

   সাতপাঁচ ভেবে বিনু বিছানাতেই পড়ে রইলতার মায়ের তো এক বার এই ঘরে উঁকি দেওয়ার কথাআসবে নিশ্চয়ই।  

  আসলতবে বিনুর মা নয়বিনুর নানিতসবি পড়তে পড়তে বিনুর রুমে ঢুকে যেই বিছানায় বসে ছিলেন, তার কিছুক্ষণ পর  কাক চিৎকার দিয়ে বাড়ি মাথায় করে তুললেন।  

  ‘ আহহাবিছানাটা নষ্ট করে দিলিসেদিন মাত্র সাদা চাদরটা বিছানো হয়েছেছিঃ,ছিঃনাপাকতুই  তো এখন নাপাকআর আমি এই বিছানায় বসে পড়লামআল্লাহ, এখন কি হবে – ‘

  বিনুর মাথায় খুন চড়ে গেলসকাল থেকে ব্যথা, তারপর আবার এসব কথাতাও নিজের মায়ের মার মুখেতার কাছে বিছানার চাদরটাই বড় হয়ে গেল!  

 বিনু রাগ সামলাতে না পেরে শোয়া থেকে বসে পড়লকেবল এই কথাটাই বলল, ‘ আপনার কি কখনো এসব হয়নি! নারীত্ব নিয়ে তো সন্দেহে পড়ে গেলাম। ‘ শুধু এই কথাটাই হাসির ছলে বলেছে রাগ সামলে।  তারপরই শুরু হয়ে গেল – “এ্যাঁতোর মেয়ে আমায় এসব কী বলল নীলু! আমি নাকি নারী না! তোদের তাহলে পেটে ধরল কে নীলু! মাইয়া মানুষ বেশি শিক্ষিত করলে এমনই হয়নাপাক বলতেই  ছ্যাঁত করে উঠলনাপাক কে তো নাপাকই বলমুহাজার বার নাপাকআহা, আহাআমায় আবার গোসল করা লাগবে – ‘’বলে গজ গজ করে চলে গেলেন। 

 আর বিনু শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দড়াম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। 

   ভয়াবহ কান্না পাচ্ছে বিনুর।  সকালের ঝামেলাটা তার মা সামলে নিয়েছেকিন্তু মন থেকে নাপাক  এই শব্দটা দূর করতে পারছে নাদুই হাজার একুশ সালেও এমন কথা শুনতে হলনারী  শরীরের স্বাভাবিক একটা নিয়ম  নিয়েআর আরেক প্রায় বৃদ্ধা হয়ে যাওয়া নানি এমন কথা বলতে পারল চিৎকার করেবাসায় বাবা, ভাই ওরা শুনে কি ভেবেছে কে জানেহুহু করে কান্নার ঢেউ  আসছে। 

   প্রতিবারই এমন কিছু না কিছু ঝামেলা হয় পিরিয়ড এর সময়টাতেএই মনটা ভালো থাকে কিছুক্ষণ পরেই কোথা থেকে একদলা মেঘ মনে ভর করে মনে।  সব বিষে বিষাদময় লাগেঅথচ পিরিয়ড নিয়ে টিভি বিজ্ঞাপন গুলোতে দেখা যায় মেয়েরা কত চিলি মুডে থাকে।  এর কতটা সত্যি কে জানেবিনু শুধু জানে তার এই সময় ভয়াবহ একলা লাগে আর কান্না পায়একটা চাপা রাগ কোথা থেকে এসে মাসের কয়েকটা দিন বিনুকে মরিয়া করে তোলে। 

    

   ‘তোমার কি হয়েছে বলবে? ‘

ভার্সিটিতে যাওয়ার পথে বিনুর পাশে হেঁটে রাতুল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। 

বিনু ভেতরে ভেতরে দ্বিধায় মরে যাচ্ছেকি বলবেকেন তার এই মন খারাপ রাতুল জানতে চাইছেঅবশ্য জানতে চাওয়ার কারণ আছে।  গত দুই দিন ধরে বিনু ভার্সিটিতে আসেনি, রাতুলের কোনো কল ধরেনিএক বার ধরে অকারণ রাগ দেখিয়ে কেটে দিয়েছে। 

রাতুল শুধু অবাক হয়েছেবিনু খুব ঠান্ডা, সে খুব কমই রাগ দেখায়অথচ সেদিন বলল,’ কেন আমায় বিরক্ত করছো। ‘ এই কথাটাই রাতুলকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।  

  ‘কি হলো, চুপ কেনোবলো। ‘

বিনু আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, ‘ আমার শরীরটা ভালো ছিল না।  সরি।‘

আহ্,কি হয়েছে তাই তো জানতে চাইছিআমি কি সত্যি তোমায় বিরক্ত করেছিলাম? ‘

সরিবললাম তো। ‘

আমায় বলতে কি অসুবিধা! কি এমন হয়েছিল যেআমায় বললে বিরক্ত করছিঅথচ তুমি কেন ক্লাসে আসোনি তাই জানতে চেয়েছিলাম – ‘ মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো রাতুলের। 

    বিনু মনে মনে ভাবলকি সমস্যা বলতেএটা তো কোনো ছোঁয়াছে রোগ না যে গোপন করে রাখা লাগবে।  

 হাঁটার গতি থামিয়ে বিনু বলল, ‘পিরিয়ড।‘

আরে সেকেন্ড পিরিয়ড এখনো শুরু হয়নি তোশাহানা ম্যামের ক্লাস দশটা কুড়িতে তো। ‘

গাধা, মেয়েদের মাসে মাসে হয় যেটা সেটার কথা বলছিপিরিয়ড। ‘

  রাতুল কিছুক্ষণ চুপ করে হেসে বলল, ‘ এটা নিয়ে এত অস্বস্তি পাওয়ার কি আছে? ফোনে একটা টেক্সট করলেই পারতেখামোখা কতগুলো ধমক খেলামভাবলাম ব্রেকআপ বুঝি করে দাওতোমার ভালো লাগাটা শুধু জানাওখারাপ লাগাটা আজ জানাতে শেখলে না।  আমি তো তোমার সহযোগী হতে চাই। ‘

  বিনু ইতস্তত করে বলল, ‘ না, মানেনানি এসময় বলে নাপাক, এই সেইতুমি আবার কি ভাবো –‘

রাতুল একগাল হেসে বলল,  ‘ তোমার নানিকে বলে দিও এই হিসেব করলে সারা পৃথিবীর মানুষই নাপাকপ্রকৃতির ডাকে সাড়া তো তোমার নানিকেও দিতে হয়বর্জ্য গুলো তো আমাদের শরীরই বহন করে তাই না! ‘

  বিনু হেসে দিল।  হাসলে বিনুর গালে ডাবল টোল খায়আজ পিরিয়ডের চতুর্থ দিনব্যথাকে চাপিয়ে কি একটা সুখ ভর করছেরাতুল তাকে বুঝতে পেরেছে। 

  ‘আমি কি মহারানীর হাতটা ধরতে পারি। ‘

কোনো কথা না বলে চুপচাপ বিনু হাতটা বাড়িয়ে দিলএকেই বলে বোধহয় সুখের মতো অসুখ। 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply