লড়াকু কবি ও লেখকসত্তার কয়েকটি নিদর্শন  – সুদীপ ঘোষাল

লড়াকু কবি ও লেখকসত্তার কয়েকটি নিদর্শন – সুদীপ ঘোষাল

  • Post category:প্রবন্ধ
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 1, 2020
  • Reading time:1 mins read

আশাপূর্ণা  দেবী তার গল্পে নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের ছবি এঁকেছেন নিরলসভাবে। অতি সাধারণ সংসারের ঘটনা তার কলমের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে এক অসাধারণ অক্ষর চিত্রের সম্ভার। তাঁর গল্প পড়ে পাঠকহৃদয় আলোর বাগিচায় ঘোরে।বিশ্বজনীন জননী তাঁর লেখায় গ্রাম্য ঘটনাকে বিশ্বজনীন ভাবনার স্তরে উন্নীত করেছেন।” সব দিক বজায় রেখে,” এই গল্পে সাড়ে চার বছরের মেয়ের সাথে তার মায়ের সম্পর্কের উত্তরণ ঘটিয়েছেন।তনিমা স্বাধীনচেতা রমণী। নিজেকে গন্ডি ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন বিশ্বদরবারের আধুনিকতার ছোঁয়ায়।শিশু বুতান সংসার ও চারপাশের    পরিবেশ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।চরিত্র অনুযায়ী ঘটনা বিন্যাসে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। মেয়েদের অসহিষ্ণুতা নিয়ে তাঁর কটাক্ষ বড়ই প্রাসঙ্গিক।দেড় হাজারের বেশি ছোটো গল্প লিখেছেন তিনি। উপন্যাসও দেড়শো ছাড়িয়ে গেছে।তিনি বলতেন,ছোটোগল্প আমার প্রথম প্রেম।

ছিন্নমস্তা, গল্পে   ছেলের মরণে জয়াবতীর হৃদয়ে একদিকে সন্তানহারা মায়ের ব্যথা।আর একদিকে ছেলের বৌ প্রতিভার প্রতি প্রতিশোধের আনন্দ প্রকট। জয়াবতীর মতই সে এখন বিধবার অন্তর ব্যথার প্রত্যক্ষ ভাগীদার। তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।পাঠক এখানে ব্যতিক্রমি আস্বাদ পায়। এখানই গল্পের সার্থকতা। একঘেয়ে আস্বাদের অপেক্ষা বিচিত্র অভিজ্ঞতার নিরিখে এই গল্প কালোত্তীর্ণ।কিছু কিছু জায়গায় স্ববিরোধিতা থাকলেও গল্প পড়তে ভালোই লাগে।
জয়াবতী তার পুত্রবধুর তিক্ত বচনে জ্ঞানহীন হয়ে   ঠাকুরের কাছে মাথাকুটে অভিশাপ দিয়েছেন। ট্রামচাপা পড়ে  মরণ হয় পুত্রের। পুত্রহারা মায়ের শোক একদিকে আর অন্যদিকে পুত্রবধুর প্রতি প্রতিশোধের আনন্দ এই চরিত্রের কঠিন স্ববিরোধী মন,পাঠক মনকে নাড়া দেয়। নিয়ে যায় এক কঠিন জটিল মানসিকতার বিশ্লেষণের পর্বে।
আশাপূর্ণা দেবীর গল্পে এক ব্যতিক্রমি কাহিনী পাঠককে আনন্দ বিষাদের জগতে বিচরণ করিয়ে ছাড়ে। তার লেখনীর শৈল্পিক ছোঁয়ায় সহজ সরলভাবে প্রস্ফুটিত হয় গল্প। অমরত্ব পেতে অমৃতের প্রয়োজন নেই। লেখনীর মাধুর্য তাঁকে অমরত্ব দান করেছে সন্দেহাতীতভাবে।
 কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন। ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্র্রুুয়ারী তৎকালীন ব্রিটিশ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন, যেটা বর্তমান বরিশাালের ঝালকাটি। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতম এবং রোমান্টিক কবি। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত এবং কুসুুমকুুমারী দাশগুপ্তের পুত্র। রুপসী বাংলার এ কবির পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ঢাকা  বিক্রমপুরের মানুষ ছিলেন। পরে তিনি বরিশালে চলে আসেন। পিতামহ বরিশালে ব্রাহ্মসমাজ আান্দোলন শুরু করেন। কবির পিতা স্কুল শিক্ষক, একই সাথে প্রাবন্ধিক ছিলেন। বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। কবিমাতা গৃৃহিণী হলেও কবিতা লিখতেন।
তাঁর লেখা আদর্শ ছেলে কবিতা ( আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে) আজও আমাদের কণ্ঠে চির ভাস্বর। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পিতার কণ্ঠে উপনিষদ আবৃত্তি আর মায়ের কণ্ঠে গান শুনতেন।
কবির কবিতায় প্রথম দিকে কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব থাকলে পরে স্বকীয় ধারার স্বাক্ষর রাখেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের বাইরে তাঁকেই বাঙলা সাহিত্যর প্রধান কবি বলে সমালোচকরাা মেনে নিয়েছেন। তিনি শুধু কবিতা লেখেননি। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ২১টি উপন্যাস এবং ১২৬ টি ছোট গল্প লেখেন। কিন্তু তার একটাও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি।
বাঙলা সাহিত্যের রোমান্টিক এ কবির জীবন মোটেই রোমান্টিক আর সুখের ছিল না। তাঁর দাম্পত্য জীবনে সুখের কোন আভাস পাওয়া যায় না। এছাড়া চরম দারিদ্র ছিল নিত্যসঙ্গী। জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থ নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলনে পুরস্কৃত (১৯৫৩) হয়। ১৯৫৫ সালে শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থটি ভারত সরকারের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করে।
বাঙলার নিসর্গ, নদী,নালা,বন, তৃণভূমি তাঁর কাব্যে পেয়েছে নতুন প্রাণ। এর আগে আর কোন বাঙালি কবি এভাবে বাঙলার প্রকৃৃতিকে এতটা রোমান্টিকতার সাথে তুলে ধরেননি। তাঁর কবিতায় এতটা রোমান্টিকতা ছিল যে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় সমালােচকরা তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগও আনেন! তাঁর কবিতায় বাঙলার প্রকৃতি, নিসর্গের সাথে সাথে রয়েছে বাংলার বুকে আবার ফিরে আসার আকুলতা। ১৯৫৪ সালে কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পূর্বে  তিনি নিশ্চয়ই দেখে গিয়েছিলেন তাঁঁর সেই বাংলার বুকে তৎকালীন মুসলীগ সরকারের বীভৎসতা। এমনটি দেখলে আগে ওমন কবিতা লিখতেন কিনা সন্দেহ করি!
ব্যক্তি জীবনে অসুখী, দারিদ্রপীড়িত, কিন্তু ভ্রমনপিয়াসী এ কবির কবিতামঞ্জরী আজও প্রতিটিা রুচিশীল বাঙালির কাছে রােমন্টিকতা আর প্রকৃতির  বনে দ্বন্দ্ব চিরকালই ছিল।তিনি জানতে চাইতেন বিপুল রহস্য আবৃত সৃষ্টি ও স্রষ্টার শুরুর কাহিনী।
 সেগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে তার কবিতায়।
আর শাশ্বত কল্পনা লোকের অমরত্ব ও অমর্ত্য সৌন্দর্য —এই দুইয়ের মধ্যে এক গভীর যন্ত্রণা দুঃখবোধ, প্রকৃতি ও শিল্পের নানারূপে শান্তি,
সত্য ও পূর্ণতার সন্ধান ইত্যাদি বিষয় সব কবিতায় আবৃত্ত হয়েছে।তার কবিতা পড়লে আমরা চলে যাই প্রকৃতি ও মানব জীবনের উপকন্ঠে।
জনৈক আস্তাবল রক্ষকের জ্যেষ্ঠপুত্র জনের জন্ম হয়েছিল লন্ডনের মুরফিল্ডসে।

 বাল্যকালে ছাত্র হিসেবে গিয়েছিলেন এনফিল্ড এর একটি বিদ্যালয়ে,যার প্রধান শিক্ষকের পুত্র চার্লস কাউডেন ক্লার্কের সঙ্গে কিটসের হয়েছিল ঘনিষ্ঠ দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব আর ভালবাসাতো জোর করে হয় না। গুঁতিয়ে গান, কবিতা হয় না।

জনের বাবার সঙ্গে ঘোড়ার মালিকের কথোপকোথন বর্ণনা করলাম  কাল্পনিক ঢঙে।
আস্তাবলের মালিক অহংকারী। সে বলছে তার কর্মচারি অভাগা কিটসকে।
–এই ঘোড়াগুলোকে ভালো করে দেখিস।
 কেন ঘোড়ার খাবারের জায়গাগুলো নোংরা হয়ে আছে।।
কেন বল।  এগুলো পরিষ্কার করে দিবি
—–হ্যাঁ বাবু আমি ঠিক পরিষ্কার করে রেখে দেবো আর দেখবেন আমি ঘোড়াগুলোকে জল দিয়ে ধুয়ে কেমন পরিষ্কার করে দেব আপনার ঘোড়ায় চাপতে খুব ভালো লাগবে।
কিটসের বাবা  বিনীত সুরে বললেন।
—-হ্যাঁ আমি কাজে ফাঁকি দেওয়া একদম পছন্দ করি না ঠিকমতো মাইনে নেবে যেমন। কাজ করবে ঠিক সেই মতো।
মালিকের কথা আগুনের গোলার মত গরম।
কোনোরকম বেইমানি আমি পছন্দ করিনা।মালিক বলল।
এই আস্তাবলের মালিকের একটা মেয়ে ছিল। মেয়েটি সুন্দরী।
মেয়েটি এই ঘোড়ার আস্তাবলে কাজ করা ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।জনের বাবাও ভালবাসেন সুন্দরীকে।
তারপর তারা দুজনে বিয়ে করে পালিয়ে গেছিল লন্ডনে।
লন্ডনের এক শহরে তার নাম ছিল মুরফিল্ডস। এই শহরে আর তারা বিয়ে করে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলো। অতিকষ্টে আর একটি আস্তাবলে কাজ জোগাড় করেন কিটসের বাবা।
ধীরে ধীরে তাদের সময় কাটতে লাগলো।
প্রায় দুই বছর পরে তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র জন কিটসের জন্ম হলো।
তাদের আরো সন্তান-সন্ততি হয়েছিল পরে ঘোড়ার আস্তাবলের কর্মি  দুর্ঘটনায় মারা গেল।ঘোড়ার আস্তা বলের কাজ করা ছেলেটি,জনের বাবার ঘোড়ার  পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হল,এক জনবহুল রাস্তায়।
জন কিটস এর বয়স তখন প্রায় আট বছর। পিতৃহারা জন কিটস কাজ করতে শুরু করলেন বাবা মরে যাওয়ার পরে।
পাড়ার এক ভদ্রলোক জনের মায়ের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ল। সে বললো-  তোমার স্বামী মারা গেছে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তুমি কি রাজি আছো?
জনের মা বলল হ্যাঁ আমি রাজি এই  পুত্র কন্যাদের নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে বিয়ে করতে চাই। তুমি কি এদের দায়িত্ব নিতে রাজি?
ভদ্রলোক বললেন হ্যাঁ আমি রাজি।
তারপর তারা বিয়ে করে চলে গেল এডমন্টন শহরে। জন রয়ে গেল একাকি।
সেখানে তারা সুখে বেশ কয়েক বছর বাস করল। একদিন জনের মা তার স্বামীকে বলল আমার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে।
স্বামী বললো চলো আমরা ডাক্তারখানায় যাই তোমাকে দেখাবো। তুমি আবার সুস্থ হয়ে যাবে চিন্তা করো না।
ডাক্তারবাবু বললেন এর হোক খুব কঠিন রোগ আপনাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে।
ডাক্তারবাবু ভদ্রলোককে আলাদা করে বললেন আপনার স্ত্রী যক্ষ্মা হয়েছে। তবু আমি তাকে ওষুধ দিয়েছি এই ওষুধগুলো নিয়মিত খেলে আশা করি ভালো হবে তবে যে পর্যায়ে চলে গেছে ভালো হওয়ার আশা কম।
 সেই ভদ্রলোক কিন্তু তার স্ত্রীকে কথাগুলো বললেন না। কারণ যক্ষার কথা শুনলে তার স্ত্রী হয়তো হার্টফেল করবেন।
——
কিন্তু’ নিয়তি কে ন বাধ্য তে ‘একদিন যক্ষ্মারোগে তার স্ত্রীর মৃত্যু হল।
জনের মায়ের মৃত্যু হল।
——
জনের পালিত বাবা চলে গেলেন অন্যান্য পুত্র কন্যাদের নিয়ে। এমনিতেই জন কাজের জায়গায় একা থাকত। সে বরাবরই একা থাকে। এক নির্জন নিরালা জীবন জনের।
——
 কিন্তু জন এক চিকিৎসকের আন্ডারে কম্পাউন্ডারের কাজ করতে শুরু করলো।
অ্যানফিল্ডে ছাত্রাবস্থায় জন আকৃষ্ট হয়েছিলেন গ্রিক পুরাণের প্রতি। পড়েছিলেন ভার্জিলের মহাকাব্য।
 সর্বোপরি বন্ধু ক্লার্কের উৎসাহ ছিল প্রেরণা।
——
হাজার 1813 খ্রিস্টাব্দে স্পেন্সারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে লারকি, জনের কবি হওয়ার বাসনা কে  জাগ্রত করেছিলেন।
——
 1814 কি লিখলেন তার প্রথম কবিতা, লাইনস ইন ইন্টিমেশন অফ স্পেন্সর।
——
জন তুমি তোমার কাজে মন দাও। এখন কবিতা রাখো। তুমি এই চিকিৎসা শাস্ত্রে ভালো ফল করবে আশা করি। তার বস বিখ্যাত ডাক্তারবাবু এই কথা বললেন।
——
————
জন বলল, ইয়েস মাই বস। আমি অবশ্যই আপনার কাজে মন দেব এবং আমি ডিপ্লোমা অধিকার করব।
——
সেই বিখ্যাত ডাক্তারবাবুর সহায়তায় জণ কিটস চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিপ্লোমা লাভ করলেন।
——
আলাদা করে একটা ডিসপেনসারি খুললেন জন। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রে তার মন বসলো না। তিনি প্রেসক্রিপশন এর উপরে কবিতা লিখতে শুরু করেন অজান্তেই। ডাক্তারি করা তার হলো না তিনি চিকিৎসা করার ব্যবসা ছেড়ে দিলেন।
——
 পুরোপুরি কবিতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
——
1815 সালে কিটস রচনা করেন দুটি ওড,  টু এপোলো নামে।
——
 দুটি ওড, আর কয়েকটি চতুর্দশপদী কবিতা।
——
ওই সময় থেকেই তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠ শুরু করেন। পড়া আর পড়া। গ্রিক মহাকাব্য তার জীবনে ভীষণ প্রভাব ফেলে।
——
এইভাবে আস্তাবল রক্ষকের কাজ করতো জন কিটস এর বাবা । অনেক সন্তান ছিল তাঁর। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল জন কিটস।
তার জন্ম হয়েছিল লন্ডনের মুরফিল্ডসে।
——
 1816 নভেম্বরে  এক্সামিনার এ প্রকাশিত  অন ফাস্ট লুকিং ইন্তু  chapman’s হমার।
মার্চ 1817 সালে বেরোলো গেটস এর আত্মপ্রকাশ মূলক সংকলন পোয়েমস।
——
কাব্য সংকলন টি পাঠক ও সমালোচক মহলে বিশেষ সমাদর লাভ করেনি। অনেক লড়াই ছিল তার কবিপ্রতিভার স্বীকৃতিলাভে।
——
কিন্তু অনুদার ও বিরূপ সমালোচনা কবিকে নিরুৎসাহ করেছিল এমন নয়। তিনি কানে তুলতেন না বাজে কথা।
——
 1816  এপ্রিলের থেকে 1818 পর্যন্ত সাইক্লিন হ্যাম্পস্টেড প্রভৃতি স্থানে বসবাসকরার সময় কিটস রচনা করলেন তার দীর্ঘ আখ্যানকাব্য এন্ডিমিয়ন।
 কিটস লিখেছিলেন কবিতা প্রেম জীবন দর্শন বিষয়ে তাঁর অসামান্য পত্রগুচ্ছ।
ভাই বন্ধু আত্মীয় পরিজনের কাছে লেখা সমস্ত চিঠিপত্র পরে 1848 এবং1878 প্রকাশিত হলো এইসব মূল্যবান আত্মজৈবনিক কথা সাহিত্যিক ধারাভাষ্য রূপে গৃহীত হয়।
——
হাজার 1817 থেকে 1818 শীত ঋতুতে কিটস ল্যাম্প  ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হ্যাজলিটের সান্নিধ্যে এসেছিলেন।
——
বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন জন্য চার্লস আর্মিটেজ ব্রাউন আর ছিলেন অসুস্থ কবিভ্রাতা টম ।  জনের পারিবারিক যক্ষা রোগের লক্ষণ গুলি এই সময় থেকেই শরীরে দেখা দিতে থাকে।
বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে কাহিনী অবলম্বনে একটি গাথা কাব্য সংকলন পরিকল্পনা করেন কিটস।
——
তার সংক্ষিপ্ত কবি জীবনে সৌন্দর্যপিয়াসী কিটস সময় প্রবাহের দুর্যোগ-দুর্বিপাক এর মধ্যেও নিরন্তর সন্ধান করেছেন চিরন্তনের অমরত্বের।
——
 ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনের ধারাবাহিক বিপর্যয় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে যতই ভারাক্রান্ত করেছে ততই মৃত্যুর ছাপ তার জীবনে তরুণ কবি অঅত্যন্ত  সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কবিতায় শিল্পের মাধুর্যে ।
——
শেলীর কাব্যে দূরবর্তী আনন্দলোকে পৌঁছাতে না পারার যে হাহাকার শোনা যায় কিটসের কাব্যে সে ধরনের আত্মবিলাপ এর চিহ্ন নেই।
——
ছাত্র অবস্থা থেকে ইতালির ইতিহাস কিংবদন্তি ও স্পেনস্যারের রোমান্টিক থেকে বিশেষভাবে তাকে মুগ্ধ করেছিল।
——
বড় বড় কবিরা ও বিরূপ সমালোচনা ও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ থেকে কিন্তু রক্ষা পাননি।
 যত বড় কবিদের দেখা যায় মর্মাহত কবি তারা তাদের আত্মজীবনীতে সেই কথাই লিখে গেছেন।
——
জন কিটস এর ক্ষেত্রে এর অন্যথা হয়নি।
 তিনি অনেক বিরূপ সমালোচনা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য থেকে রেহাই পাননি।
——
 1820 সালে কিটসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ল্যামিয়া,ইসাবেল্লা,দি ইভ অফ সেন্ট আ্যগনেস আ্যন্ড আদার পোয়েমস, প্রকাশিত হয়।
——
শেলীর পাঠানো আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে রোমে পৌঁছান তিনি এবং সেখানেই 1821 এর ফেব্রুয়ারীতে কিটস এর মৃত্যু হয়। তার সমাধিফলকে তিনি উত্তীর্ণ করতে চেয়েছিলেন এই  উক্তি,হেয়ার লাইস ওয়ান  হুজ নেম ওয়াজ রিট ইন  ওয়াটার ।
——
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সমাধি স্তম্ভে লিখতে চেয়েছিলেন,
——
“দাঁড়াও পথিকবর, তিষ্ঠ ক্ষণকাল এ সমাধিস্থলে…..” ইত্যাদি।
গ্রেট মেন থিংস এলাইক।
ছাত্র অবস্থায় কাব্যচর্চা শুরুতে মধ্যযুগীয় ইতিহাস ও কিংবদন্তি এবং স্পেন্সারের রোমান্টিক মাধুর্য কে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছিল।
——
1819 এর বসন্ত ঋতু কিটসের কর্মজীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
তার কবি জীবনের এই স্মরণীয় মুহূর্ত তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তার আত্মজীবনীতে।
——
তার কবি প্রতিভার সেরা সম্পদগুলি এই সময়ই রচিত হয়েছিল।
 কবিতার পাশাপাশি এই  ওডগুলি চিত্রকল্পের ইংরেজি কাব্য সাহিত্যের অনন্য কীর্তি রূপে স্বীকৃত ।
——
হাইপেরিয়ান রচনায় কিটস এর দক্ষতা অপূর্ব ছিল।
স্কটল্যান্ড আয়ারল্যান্ড এ পদযাত্রা সরিয়ে লন্ডন ফিরে হাজার 1818 শেষে কিটসের এর ভূমিকা
প্রশংসনীয়।
তিনি আরও একবার গ্রীক পুরাণের দ্বারস্থ হবার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন।
——
বাটনের দিয়ে এ্যানাটমী অফ মেলাতনিন থেকে নাগকন্যা লামিয়ার গল্পটি গ্রহণ করেছিলেন কেটস লামিয়াকে হার্মিস দিয়েছিলেন সুন্দরী নারীর রূপ আর সেই মোহিনী রূপে রামিয়া প্রলুব্ধ করেছিল করেন যুবরাজকে লামিয়াকে নিয়ে যায় সেখানে তারা মিলিত হয় অতঃপর নিষেধ অগ্রাহ্য করে এলআইসি আমন্ত্রণ জানায় তার বন্ধু পরিচিতদের মধ্যে ছিলেন প্রবীণ যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে ধরা পড়ে যায় নাগিনী কন্যা প্রকৃত পরিচয় হয় মুখে পতিত হয় বাস্তবে দেখাতে চেয়েছেন অনেকটা কোলরিজের ক্রিস্টাবেল কবিতার মত এ্যাপোলোনিয়াসের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর লামিয়াকে ঘিরে ফ্যান্টাসি অলৌকিকতার যে রহস্য তাদের মধ্যবর্তী কিন্তু এক অমীমাংসীত থাকে গেছে রোমান্টিক কাব্য কবিতায় নারী নির্বাচিত বারবার দেখা গেছে।
——
এই প্রসঙ্গে আরেকটা বেলার এর উল্লেখ করা যায় মোহিনী নারী প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে জনৈক নাইট কিভাবে দৌড়ায় এবং মুখোমুখি হয়েছিল সর্বনাশা ধ্বংসকারী আশ্চর্য কাহিনী প্রেমের ছলনায় ভুলিয়ে বিপর্যস্ত কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ছিলনা স্পেন্সারের দেখেছিলেন এমন হতে পারে। ফ্যান্টাসি অতিপ্রাকৃত বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে, যথার্থই একটি চমকপ্রদ কাহিনী।
——
সনেট রচনায় কিটস এর দক্ষতা ও সাফল্য সর্বজনবিদিত।
শেক্সপিয়ারের গঠনে অধিকতর স্বচ্ছন্দ বোধ করেছেন তার মোট 61 টির মধ্যে 42 টি এবং শেক্সপিয়ারের চতুর্দশপদী পরীক্ষামূলক রচনা শেক্সপিয়ারের সংস্কৃত অনুবাদ পরিকাঠামো লিখেছিলেন।
অন ফাস্ট লুকিং ইন্তু chapman’s কল্পনা অন্যতম সেরা নিদর্শন।
——
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপময় বর্ণনায় ছবি কিসের কবিতায় বড় আকর্ষণ প্রকৃতিবাদ গ্রুপের গভীরে কোন অন্তর জীবনের সন্ধান করেননি কিংবা প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্য লোকের উদ্দেশ্যে ধাবিত হতে চাননি ক্ষেত্রে কাব্য কবিতায় প্রকৃতি চিত্র চিত্রিত প্রকৃতিকে দেখিয়েছিলেন।
——
এ থিং অফ বিউটি ইস এ জয় ফরএভার। লিখেছিলেন তিনি।
 কাব্যসাধনার সৌন্দর্য ছিল কিটসের ধ্ররুবতারা শিল্পে কিংবা প্রকৃতিতে কিংবা প্রেমে তিনি নির্মাণ করেছেন সৌন্দর্যের রূঢ় বাস্তবের কল্পনার আশ্রয় নিতে চেয়েছেন।
 আশ্রয় নিতে চেয়েছেন মধ্যযুগীয় রোমান্স জগতে ধর্মীয়-সামাজিক কবিতাকে কেস দেখেছিলেন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় প্রচারবিমুখ ছিল।
তার কাব্য জগত ইন্দ্রের মাটির পৃথিবী জগত। ব্যক্তিগত পারিবারিক ও সামাজিক যন্ত্রণা পিরান ভূতে বিশ্বাস অর্জন করেছেন।
 পাখির গানে শিল্পকর্মের অবিনশ্বরতা প্রকৃতির পরিপূর্ণরূপে রূপকথা অতিপ্রাকৃতের প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁর কবিতার ছন্দে ছন্দে প্রচলিত।
 তার কেবলমাত্র সৌন্দর্যবোধ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইলে তা হবে এক অতিসরলীকরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসে বাস্তবতার এক ভিন্ন মাত্রা।
——
সৌন্দর্য মনে প্রেমের কবিতার কাব্য কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে মানব সৌন্দর্যের যেসব ইন্দ্রিয়ঘন শব্দচিত্র উপহার দিয়েছেন তা উল্লেখনীয় কবিতা অংশে একটি পানপাত্রের উজ্জ্বলনীলমণি চিত্রকল্প দৃষ্টিনন্দন অংশগুলো ঠিকমতো পড়লে কয়েকটি বিশেষ ব্যাঞ্জন স্বরধ্বনি মায়াবী বিন্যাসে আমরা যেন ভালবাসার প্রান্তে এসে যাই।
“o for a breaker full of the warm South
Full of the true the blushful Hippocrene
With beaded bubbles winking at the brim
And purple stained mouth.”
এ টি পানপাত্রের উজ্জ্বল বর্ণের  রাজ্যে প্রকৃতি চিত্রকল্প পাই তা অভূতপূর্ব নমুনা।
প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনায় নদীর সৌন্দর্য বর্ণনায় তার তুলনা মেলা ভার। ফুলের গন্ধের সঙ্গে তিনি ফিসফিসিয়ে কথা বলার তুলনা করেছেন। এক অপূর্ব তুলনাময় নিদর্শন।
——
প্রাচীন গ্রিক শিল্প সাহিত্য পুরাণের ও প্রভাব তার কবিতায় লক্ষ্য করা যায়।
ফরাসি বিপ্লবের’ ঝড়ের মতো প্লেটোনিক ভাবাদর্শে প্রেরণা শেলীর কবিতায় কবির উপলব্ধি আত্মিক শক্তির উদ্বোধন এভাবে পুরস্কৃত করেছে কিডসের কাব্যের তেমনটা নেই কিসের কবিতার জগতে জগতে জগতে প্রাচুর্যপূর্ণ।
নদী আকাশ মেঘ ফুল পাখিদের নিয়ে প্রকৃতির যে বর্ণময় জগত কিসের নিভিরও চিত্ররূপময় চিত্রকল্পে অপূর্ব লাবণ্যময়।
ইন্দ্রিয় আকুল বিলাসিতা কিসের কাব্যজগতে প্রধান লক্ষণ মানসী কাব্যের প্রতিটি ফুটে উঠেছিল ও একই অবস্থা কথা বলেছিলেন কি কবিতায় পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে স্থায়িত্বের যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছিল।
——
পলারিজের অতিপ্রাকৃত রহস্যময়তা রবীন্দ্র কাব্যে তেমন মুখ্য বা আধিপত্যকারী ভূমিকা দেখা না গেলেও তার কোন কোন ছোটগল্পে বা উন্নত রচনা আধিভৌতিক শিরোনাম করা যায় নিশিতে ক্ষুধিত পাষাণ প্রকৃতি রচনা রোমান্টিক কবিতা রবীন্দ্রনাথ যথার্থ আনন্দের একটা আন্তরিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন কাব্যগ্রন্থের কাব্যভাষা নির্বিশেষে রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী রবীন্দ্রনাথ।
——
প্রাচীন গ্রিক শিল্প-সাহিত্য পুরাণ বিষয়ক একটি অনুরোধ ছিল অপরিসীম তার সৌন্দর্যের সন্ধান ও দর্শন ছিল গ্রীক সংস্কৃতি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত সামাজিক রাজনৈতিক দলকে তেমন আমল দেননি মানুষ ও প্রকৃতি প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে মৃৎশিল্প পুরান সম্বন্ধে তার আগ্রহ ও অপরাপর কবিদের থেকে আলাদা ছিল।
——
ফরাসি বিপ্লবের ঝড়ো উদ্যমতা ও প্লেটোনিক ভাবাদর্শে প্রেরণা শেলীর কবিতায় কবির উপলব্ধি আত্মিক শক্তির উদ্বোধন স্পৃহাকে যেভাবে পরিস্ফুট করেছে কাব্যে তেমনটা নিয়ে কিটসের কবিতার জগতে নিয়ে যাব।
বাংলা কবিতায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য কবিতার প্রাথমিক পর্বে মধুসূদন রঙ্গলাল রচনায় কৃষি ও রোমান্টিকতা তেমন উল্লেখযোগ্য ছাপ ফেলতে পারেনি হয়তোবা হেমচন্দ্রের বৃত্রসংহার কাব্য দেবতার হাইপেরিয়ান এর ছায়া লক্ষ্য করা যায়।
দেবেন্দ্রনাথের ইন্দ্রিয় আসিত প্রেমের কাব্য রচনা গ্রীষ্মের ইন্দ্রিয় রয়েছে কিসে কাবেরী অভিশাপ নজরে পড়ে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আর্যগাথা কাব্যে দ্বিতীয় খন্ড আদর্শ নারী বা প্রেমিকাকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল নিদর্শন মেলে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিটসের প্রভাব তার কবিতায় ছবিতে লক্ষ্য করা যায় কিটসের গান অজানা ফুলের সুরভী মাখা গান।
——
বাংলা ভাষাকে ভালোবেসেছিলেন অন্তর থেকে।তাই বাকদেবীর আশীর্বাদে ধন্য হয়েছিলেন তিনি
।ভালোবাসার কেন্দ্রে আছে কবির মাতৃভাষার ও সাহিত্যের উন্নয়নজনিত আত্ম প্রসাদ।ছোটোবেলায় যখন তার কবিতা পড়তাম,হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন…. তখন কোন এক জাদুমায়ায় আচ্ছাদিত হত মন। সামান্য কয়েকদিন তিনি ইউরোপে বাস করলেই কি মন কল্পলোক ইউরোপময় হয়ে যায়।বাল্যকাল থেকেই ভারতবর্ষের জল হাওয়ায় তার বাস।বাংলার পটভূমিতেই এই পন্ডিতের  মানুষ হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শুরু।আপামর বাঙালি মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের এক নবতম সংযোজন।সনেট রচনায় যে বস্তুটি কবি মানসে আবেগের তরঙ্গ জুগিয়েছে তা হল তার প্রতিভার নবতর খেলা। কবির প্রতিভা লীলাখেলার কেন্দ্রেও বাংলার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশিত হয়।চতুর্দশপদী, তাঁর এক অনন্য আবিষ্কার। প্রণাম তাঁর কবি মানসকে।
——
তাঁর চতুর্দশপদী বা সনেটের মধ্যে তাঁর কবি মানসকে খুঁজে পাই।বিদেশে বাস করেও তাঁর মন পড়েছিলো ভারতবর্ষের মাটিতে,জল হাওয়ায়, নদীপুকুরে,জলডোবায়।এই স্বদেশ পাগল মনটি গড়ে তোলে বাংলার সনেট জগৎ।কবির বিদশবাস না ঘটলে সনেট রচনা হত না। আপন দেশকে ছেড়ে যে বিদেশে বাস করেছে একমাত্র সেই বুঝতে পারবে এই ভালোবাসার যন্ত্রণা।
——
——
আমি পড়াশোনার খাতিরে গ্রাম থেকে বাবা মা কে ছেড়ে বাইরে কিছুদিন ছিলাম। একবছর পর পর যখন গ্রামের মাটিতে পা দিতাম তখন মনে হত আমি কোথায় এলাম এই আমার একান্ত আপন বাসভূমি।মাটি নিয়ে সারা অঙ্গে মেখে নিতাম। গ্রামের গাছ গাছালি,বনবাদাড়,জীবজন্তু  নদী, নালা,ডোবা সবকিছুই নিজের অত্যন্ত আপন মনে হত। আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করত না শহরে। এইরকম মন নিয়েই কবির ছটফটানি।দেশে থাকাকালীন তিনি সনেট রচনা নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করেন।তাঁর নানা সৃষ্টি ভিড়ের মধ্যে, একান্ত তপস্যায় নয়।একই সঙ্গে একাধিক রচনা তিনি বলে যেতেন ক্রমাগত।কয়েকজন লিখতেন সেইসব শুনে।তাঁর অনির্ণেয় আন্তর তাগিদ এবং অদম্য সংকল্প সমস্ত কাব্যসৃষ্টির মূল উৎস।দেশে থাকতেই কবি ইতালি ভাষার চর্চা শুরু করেন ।কবি তাসোর মূল কাব্য পাঠ করে অপার আনন্দ লাভ করেন।পেত্রার্ক পড়ে পন্ডিত হওয়ার নিছক আনন্দলাভ নয়, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সনেটে হাত পাকিয়েছেন।কঠিন তপস্যার মধ্যে খুঁজে  গেছে পরশপাথর, তাঁর হৃদয়।
——
——
তাঁর রচনা কৃষ্ঞকুমারী, এক বিয়োগান্তক নাটক।মাত্র ছয়মাসের মধ্যে লেখেন।একগুচ্ছ গীতিকবিতা লেখেন যাঁর নাম ব্রজাঙ্গনা ও খাঁটি মহাকাব্যের অর্ধেক লেখেন, মেঘনাদবধ।তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে, চলছিলো কবির অমিত্র ছন্দে কাব্যরচনার যুগান্তকারী পরীক্ষা।
মধুসূদনের কবি মানস সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলি।নিজে এক মহৎ লোক না হলে কাব্য সৃষ্টির ব্যাপারে বিচার সম্ভব নয়। কবির প্রধান নির্ভর রস।ইতিহাস তাই বলে।কবিতার মধ্যে ব্যক্ত্বিত্বের স্পর্শটুকু প্রয়োজন।এ এক অতি গভীর ব্যাপার।কবিকে আমরা বুঝলাম তাঁর কাব্যে।
——
সাহিত্য ছিলো আবেগপ্রধান।বাস্তব জীবনের সমস্যা, জীবনের সামগ্রিক আলোচনা, দুঃখ প্রভৃতি নিয়েই সৃষ্টি হত সাহিত্য।আধুনিকতা বলতে কি বোঝায়  গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়া।তাহলে কবি মামূলি সাহিত্যপথ একটু নড়িয়ে দিয়েছিলেন বৈকি।বাংলা ভাষার এক অভিভাবকের মত তাঁর আবির্ভাব। ব্যাস,বাল্মিকী,হোমার,ভার্জিল,মিলটন,ট্যাসো প্রমুখ মহাকাব্য রচয়িতাগণ যে জীবনদর্শন রূপায়িত করেছেন পাঠকরা তার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন।কবিদের মানসমুকুরের ছাপ তাঁদের রচনাতে পড়েছে।ভাবগভীরতার সঙ্গে প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁদের কাব্যিক অনুভূতি।কবি মধুসূদন এর ব্যাতিক্রম নন।বহুকালের একঘেয়েমীর অবসান ঘটান দান্তে।দান্তের কবি মানস সাহিত্যের আকাশে স্বমহিমায় দীপ্যমান।সার্বভৌম ভাব সংস্কৃতির এক অদ্ভূত সমন্বয় সাধিত হয়েছে।মহাকাব্যের ঘটনাবিন্যাস,গঠনবৈশিষ্ট্য ও অখন্ত ভাবসংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রেখে চিরনির্দিষ্ট আধারে সমসায়িক ইতিহাসের তীব্র মানসবিক্ষোভ ও আদর্শসংঘাত, দ্রবীভূত গৈরিক প্রবাহের ন্যায় প্রবৃত্তির ধর্মীয় উচ্ছ্বাসে সমস্ত কলা কৌশল সমন্বয়ে সাধিত হয়েছে।
——
মধ্যযুগের ধর্ম বিশ্বাস ও যাজক তন্ত্রের মধ্যে এক বিরাট আত্মার অধ্যাত্ম আকূতি, স্বর্গনরকের রহস্যভেদী দিব্যদৃষ্টি, দৈববিড়ম্বিত মানবিকতার বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধা যে কেমন করে সংকীর্ণ বোতলের মধ্যে বিধৃত হলো তা শিল্পপ্রতিভার এক অপূর্ব বিস্ময়।আমরা কবির মানস পটে সংস্কারমুক্তি ও চিত্তের উদার অগ্রগতির পরিচয় পাই তার মেঘনাদবধ কাব্যে।নবজাগৃতির যুগে মানবচেতনায় এসেছে নব প্লাবন ও নব চিন্তার জোয়ার।মানুষ নিজেকে দৈব নির্ভর না করে অনন্ত সম্ভাবনার প্রতি অনুরক্ত হলো।সেক্সপিয়ার,শেলী,সমারসেট মমের রচনা মানব হৃদয়ের বিচিত্র বিকাশের মধ্যে যে জীবন দর্শনের সন্ধান দিয়েছেন তার প্রশান্ত গভীরতা মানব হৃদয়কে সিক্ত করলো অনিবার্যভাবে।
——
আমাদের প্রিয় কবি তার উন্মুক্ত স্বাধীন কলমে এঁদের পাশেই আপন প্রতিভার প্রমাণ রাখলেন,ভিন্ন নব জীবনদর্শনে।অষ্টাদশ শতকে সমগ্র ইউরোপের কাব্য সাহিত্যে কবিকল্পনা অপেক্ষা যুক্তিবাদ ও মননশীলতার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।যুক্তিবাদ ও তার্কিকতা এযুগের সাহিত্যের সাধারণ গুণ হিসাবে প্রকটিত হয়।এই পটভূমিকায় মধুসূদনের আবির্ভাব ও তাঁর কাব্য রচনার পূর্ণ তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে আমার তাঁর কবি মানসের প্রকৃত পরিচয় পাবো।
আপামর বাঙালীর হৃদয়ে আছে প্রিয় কবি মধুসূদনের প্রতি ভালোবাসা।
সুদীপ ঘোষাল
পূর্ববর্ধমান
লড়াকু কবি ও লেখকসত্তার কয়েকটি নিদর্শন - সুদীপ ঘোষাল
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply