জনজীবনের হাহাকারগুলি ভিড় করে আসে কবিতায়  – তৈমুর খান

জনজীবনের হাহাকারগুলি ভিড় করে আসে কবিতায় – তৈমুর খান

কবিতা ধাঁধা নয়, ছলনা নয়, জীবন চর্চার নিমগ্ন উচ্চারণ তা পুনরায় স্পষ্ট হলো বিকাশ চন্দের ‘অনুচ্চারিত শব্দের কোলাহল’ (প্রথম প্রকাশ বৈশাখ ১৪২৭) কাব্যখানা হাতে পেয়ে। সামাজিক এক জীবন দহনের  ভাষাকে সামীপ্য দান করেছেন অলংকারবিহীন কাব্যবিন্যাসের সুচারু নিবেদনে। সেখানে সারল্যই তার প্রাণ, আবেগই তার প্রশ্রয়, সরাসরি প্রকাশই তার নিজস্বতা।

      বিকাশ চন্দ সময়ের কবি, সভ্যতার কবি। শব্দ ও উপলব্ধির ভেতর তাঁর নিভৃত জাগরণ টের পাওয়া যায়। অন্তর্দহনের দীর্ঘশ্বাস মানবিক প্রত্যয়ের ভাষা নিয়ে সুবেদী আলোর উষ্ণতা খোঁজে। যে আলোয় আমাদের সমাজ ও সভ্যতার সম্পর্ক পরিপুষ্টি পায়। তাই কবি সেই আবেগকেই পাথেয় করেন আর হৃদয়কেই মূলধন করে কবিতার কাছে নতজানু হন:

 “প্রতিদিন নিজেকে ভাঙি নিজস্ব প্রতিঘাতে

 আমার শব্দেরা রক্ত মাখে অচেনা প্রতিবাদে—

 হৃদয় তোলপাড় হ’লে চেনা অক্ষর ঠিকরে পড়ে

 হায়! সময়েরা খুঁড়িয়ে হাঁটে—”

    এই ভাঙার মধ্যেই কবির বিবেক ও চৈতন্যে রূপান্তর ঘটে। কবিতা সদর্থক গরিমায় সভ্যতার ধারক হয়ে ওঠে। কবি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন। অভিজ্ঞতা থেকে পথ অন্বেষণ করেন। পারিবারিক জীবনবোধ থেকে উদ্বোধিত করেন নান্দনিক প্রশ্রয়। কবিতা সেভাবেই গড়ে ওঠে:

 “ইতিহাস রেখে গেছে নিখাদ সরীসৃপের গল্প,

 পাথুরে শরীর ভেঙে ঘরের ভেতর নরম আলো।

 অথচ মধ্যবিত্ত জীবন বিবর্ণ ঘরের অন্ধকার—

 তুলতুলে কিছু স্পর্শসুখ অগ্নিপ্রহর

 চেনা শরীর দুটো উজ্জ্বল চোখ

পুণ্যবতী জানে বিমুক্ত পাখির ওড়াউড়ি

 অত্যাচার ডানার ঝাপটানি অনবরত

 হৃদয়ে হৃদয় জড়িয়ে উষ্ণতম চন্দ্র বলয়।”

        কিন্তু দ্বান্দ্বিক প্রতিকূলতাও অবাধ্য হয়ে ওঠে। দিশেহারা করে দেয় জীবনভূমিকে। তখন সেই অভিভবকেও লিখতে বাধ্য হন:

 “না ডাকা দ্বন্দ্ব হঠাৎই লাফিয়ে ওঠে ভাঙে অন্ধকার

 কখনো বৃষ্টি ঝড় ওলটপালট গৃহস্থ আলপনা

 সংযমে বেড়ে ওঠে বিবেক যন্ত্রণা,”

       সময়ের ধুলো ও বিবর্ণতা ভেদ করে নতুন সূর্যের অপেক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠে। সভ্যতার উত্থান ও বিস্তারে আমাদের লোককথা, প্রাচীন লোকসংস্কৃতির মূল্যবোধ থেকে ফিরে আসে। বিশ্বাসের সৌহার্দ্য বিস্তৃত হয়। তাই মনসামঙ্গল থেকে চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী থেকে রামায়ণ গান, অশোকের স্তম্ভলিপি থেকে অজন্তা ইলোরার গুহাচিত্র সবেতেই সভ্যতার মানববৃত্তীয় প্রকাশ কবি দেখতে পান। কিন্তু তবুও মানুষের মধ্যে ধ্বংস হানাহানির আদিম প্রবৃত্তির স্রোত বয়ে চলে। কবি বলেন:

 “আচ্ছন্ন একাল কেড়ে নেয় দুর্বিনীত হিংসা সমুদয়”

 তখন ক্লেদকিন্ন জীবনের এই উচ্ছন্ন অভিরূপ বিপন্নতায় ঠেলে দেয়। সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বড় ব্যথিত এই সময়ের প্রলাপ:

 “দিনের চেনা এদেশের সব বদলে যায় বসবাস নগ্ন  অন্ধকারে—

 রক্ত মাংস জন্ম নাড়িছেঁড়া চিৎকার নিরুদ্দিষ্ট নবজন্ম সুখ,

 শেকড়বাকড় বর্ণহীন ধর্মকথা পার্বণী ফুলের প্রিয় পসরা—

 হাওয়া বৃষ্টিজলে ভাসে চেনামুখ সন্তান-সন্ততি নিজস্ব ঠিকানা,

 যা-কিছু দু’চোখে দেখা কেন তবু ভুল অঞ্জলি ঢালো হে সম্প্রতি।”

 ‘অন্ধকার’ ও ‘রাত্রি’ শব্দদুটি বিপন্ন সভ্যতার রূপ। কবিতায় বারবার ফিরে আসে। আমরা কি তবে অন্ধকারের যাত্রী?

 কবি জানিয়ে দিয়েছেন ‘যা-কিছু দু’চোখে দেখা ভুল অঞ্জলি’। অর্থাৎ আমাদের জীবনের কৃত্রিমতা মোহময়তা এক ভ্রান্তির শিকার। কবি মানবিক পথেরই অন্বয়কে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাঘাতে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছেন। অবিনাশি ক্রোধ দূরে ঠেলে দিয়েছে। দিনের আড়ালে রাত্রির বিরাজমানতায় অথবা ক্লান্তমুখের মায়ার ভারে হারিয়ে গেছে কবির আনন্দযজ্ঞের পসরা। বিশ্বাসে বিপ্লবে ভাষার স্মিত গৌরবে বহমান নৌকায় যে জলকন্যাকে কবি দেখতে চান—সেও এক অন্য যন্ত্রণা। ভোরের ফুল পাখির সুভাষিত গৌরবও ম্লান হয়ে গেছে। নিঃসঙ্গতার হাহাকারে ছাপিয়ে গেছে সভ্যতা। কবি তখন শুনেছেন:

 “কারা যেন বলে গেল ভুলে যাও সব মানুষের অন্তর্বোধ”

       এভাবেই সময়কে ধারণ করে সময়ের স্বর শুনেছেন তিনি। দেখেছেন:

“রঙ মেখেছে পাখি ফুল মাটির মানুষ সমূহ জান্তব—

 দিগন্ত মেখেছে আকাশ কোন সৌন্দর্য মনন,

 আবিরে রেঙেছে ভূত-ভবিষ্যৎ সর্বনাশী গ্রহণ।”

    কিন্তু কী করে এসব থেকে বের হবেন? কী করে মানবিক পৃথিবী রচিত হবে? কী করে আশ্বস্ত করবেন সমূহ মানবজগৎকে?

       কবি জানেন হৃদয়, শস্য আর সম্পর্কের উন্নতির মধ্যে দিয়ে সভ্যতা আবার কল্লোলিনী হবে। তাই কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে আশ্বাস ছড়িয়ে দিয়েছেন:

১)”এখন উদার সময়ে সোনা ফলেছে সবুজ ক্ষেতে”

 ২)”গাঁ-গঞ্জ ঘিরে আছে সবুজ তার উপরে নীলের অহংকার”

 ৩)”সবুজ চরাচর পুকুর নদী শস্য সবুজ ধানের ক্ষেত”

  ৪)”মিলনের সুর সম্মিলন জড়িয়ে ম্রিয়মান সমূহ বর্ণমালা।”

 তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত আমাদের জাগরণ—%যেখানে আমরা বুঝতে পারি এবং শুনতেও পাই:

 “স্থির সময় জেনে গেছে ঈশ্বর আল্লা কতটা সফল

 কতটা কান্নার উষ্ণতায় বুকের তাপে বরফ গলে

 শিরশিরে হিমেল হাওয়ায় ভেসে যায়

 অনুচ্চারিত শব্দের কোলাহল।”

    বিকাশ চন্দ কষ্টের কথা লেখেন। ধূসর জীবনের কান্না লেখেন। বাঁচার মন্ত্রও লেখেন। জনজীবনের হাহাকারগুলি ভিড় করে আসে তাঁর কবিতায়। ইতিহাস থেকে যুগান্তরের পথে মানবসভ্যতার উত্থানের কাহিনি সাম্প্রতিকের জীবন-যাপনের মধ্যেও সেই ট্রাডিশনের ছায়া ভেসে ওঠে:

 “সংসারী উঠোনে সব ঋতু ফেলে গেছে ছায়া

 তুলসীতলার সকল প্রতিকৃতি বারোমাস একা

 ধারেকাছে ঘুরে বেড়ায় পুরনো প্রস্তর লিপি সভ্যতা

 কিছু বিমুগ্ধ গাছ প্রতিদিনই একই রকম পরকীয়া

 অনুভব প্রিয় চাঁদ তারা ছায়াপথে লোফালুফি সারাটা আকাশ।”

   খুব বাস্তববাদী বলেই নিজেকে বাস্তব জীবনের কাছাকাছি রেখে দীর্ঘশ্বাস ও ভাঙন, কান্নাহাসির মর্মরিত ধ্বনিকে কাব্যশরীরে স্পন্দিত করে তুলেছেন। জাদুবাস্তবের লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এক জায়গায় বলেছেন: “nothing in this world was more difficult than love.”(Gabriel García Márquez) অর্থাৎ আমরাও জানি এই পৃথিবীতে ভালোবাসার চেয়ে কিছুই কঠিন ছিল না। এই কবিও সেই ভালবাসাই খুঁজে পাননি—যাতে মানুষ রক্তারক্তি বন্ধ করে। জাতি ধর্ম সম্প্রদায়ের ভেদ ঘুচিয়ে দেয়। গরীব ধনীর দূরত্ব মিলিয়ে দেয়। উঁচু-নিচুর সীমানা মুছে দেয়। আর তারপরেই ভালোবাসার এক মানবিক পৃথিবীর স্বপ্নকে সার্থক করে। কবি জন্মের পাশে মৃত্যু, সুখের পাশে দুঃখ, প্রেমের পাশে বিরহ, সৃষ্টির পাশে ধ্বংসকেই বড় করে দেখেছেন। কবিতাগুলি নঞর্থক চেতনায় হতাশার গান হয়ে বেজে উঠেছে। শব্দের অনুচ্চারিত কোলাহল তো সেখানেই বিভূষিত।

————————————————————

অনুচ্চারিত শব্দের কোলাহল :বিকাশ চন্দ, কবিতিকা প্রকাশন, রাঙামাটি, মেদিনীপুর, প্রচ্ছদ :বিষ্ণু সামন্ত, মূল্য ১২০ টাকা।

তৈমুর খান 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply