একটি চোরের আত্মকাহিনী – অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

একটি চোরের আত্মকাহিনী – অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 8, 2020
  • Reading time:1 mins read

– 

আমার নাম শঙ্কর । এটা  আমার আসল নাম না । পরিচয় গোপন করতে নাম পরিবর্তন   করলাম ।  আসলে আমি একটা চোর ।  চুরি আমার পেশা । এখন  আমি জেলে । জেলে বসে লিখছি আমার আত্মকাহিনী । ভাবলে অবাক লাগে না ? চোরের আবার আত্মকাহিনী ।  হ্যাঁ  , চোরের আত্মকাহিনী । আপাতত বেশ কয়েক বছর আমাকে জেলের  ঘানি টানতে হবে । সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর রাত্রে লিখি । অতি  কষ্টে জেলারের অনুমতি করিয়েছি । জানি না কেন উনি অনুমতি দিয়েছেন ।
         কোনোদিন নিজের আত্মজীবনী লিখবো ভাবিনি । কি আছে লেখার ? একটা চোর মানে সমাজের কলঙ্ক । অপরাধ জগতের একজন কারিগর । বেশ সুন্দর ভাষা ব্যবহার করছি । সত্যি কথা বলি , আমার সাথে একই সেলে আরেকজন কয়েদি থাকে । তিনি একজন ব্যাংক ম্যানেজার । কোটি কোটি টাকা তছরুপের দায়ে কারাবাস । ভদ্রলোকের নাম অলকেশ বর্মা । শিক্ষিত মানুষ । রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল । কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলাম উনাকে আমার ইচ্ছার কথা । উনি আমাকে ভাষার যোগান দিয়েছেন । সেইজন্য সম্ভব হয়েছে লেখা । আমার বিদ্যা তো ক্লাস এইট পর্যন্ত ।
           জীবনে প্রথম লিখছি । একটু ভয় ভয় তো করছে । তবুও লিখছি । প্রথমে ভাবছিলাম নাম কী  দেব ? তিন চার দিন হয়ে গেল একটা জুতসই নাম ঠিক করতে পারলাম না । সেদিন রাত্রে হাবিলদার খাবার দিতে এসে দেখে আমি লিখছি । হুঙ্কার দিয়ে জানতে চাইলো যে আমি কী  করছি । আমি লিখছি শুনে তার হাতের থালা পড়ে  যাবার জোগাড় । খানিকটা হেসে বিদ্রুপের সুরে  বলে , ব্যাটা চোরের আত্ম  কাহিনী লিখছে । ব্যাস , পেয়ে গেলাম নাম । চোরের আত্ম  কাহিনী । নাম তো হলো , শুরু করবো  কোথা থেকে  ? চিন্তা করে দেখলাম অত  ভাবতে গেলে লেখা হবে না । যেমন যেমন মাথায় আসবে তেমন তেমন লিখে যাবো ।
          স্কুলে পড়াশুনোয় ভালোই ছিলাম । অল্প  বয়সে পেকে গেলে যা হয় , আমার তাই হলো । জুটলো একদল বখাটে বন্ধু । ক্লাস বাঙ্ক  করে চলে যেতাম কোনোদিন সিনেমায় , কোনোদিন ট্রেনে করে ব্যান্ডেল চার্চ বা অন্য কোথাও । সিগারেট খাওয়ার নেশা হল । সেখান থেকে সিগারেটের মশলা ফেলে গাঁজার মশলা ভরে খাওয়া শুরু । ক্লাস সেভেন এইট থেকেই  গাঁজার নেশায় পোক্ত হয়ে গেলাম । সে তো গেলাম , নেশার টাকা যোগাবে কে ? বাবা বাজারে  সব্জি  বেচে । নিরীহ ,সাদাসিধা মানুষ । বাবাকে বাজারে সাহায্য করার নামে  গিয়ে  বস্তার তলা থেকে টাকা হাপিস করতাম । বেশি দিন চলল না । ধরা পরে গেলাম । বন্ধুরা বুদ্ধি দিল স্কুল থেকে সাইকেল চুরি করার । কি ভাবে তার ঢুকিয়ে সাইকেলের তালা খুলতে হয় , শিখে গেলাম । টিফিন পিরিয়ডটাই উপযুক্ত সময় । দরজা খোলা পাওয়া যায় । মাইনে  দিতে গার্জিয়ানরা আসে । তাছাড়া , ভোটার লিস্টে নাম তুলতে বাইরের লোক আসা যাওয়া করে । আমার কাজ সাইকেলটা গেটের বাইরে বের করা । বাকিরা নিয়ে পালাতো । প্রথমবার ধরা পড়ার পরে হেডস্যার সতর্ক করেছিল । তারপরেও চুরি করায়  স্কুল থেকে টিসি ধরিয়ে দিল । পড়ার ওখানেই ইতি ।
           সাইকেলে হাত পাকিয়ে শুরু হলো বাইক চুরি । মাঝে মধ্যে ধরা পড়তাম । থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে ধোলাই দিত । পাবলিকের হাতে ধরা পড়লে গন ধোলাই । সেটা সহ্য করাই  মুশকিল ছিল । তাও সহ্য হয়ে গেল । মাঝে বন্ধুরা ডেরায় নিয়ে গেল । পরিচয় হলো চোরেদের সর্দারের সাথে । এরিয়া ভিত্তিক এক একজন সর্দার । সেখানেও নানা রকম পদ আছে । ট্রেনারের কাছে পাঠিয়ে দিল । আর একটা স্কুল । চোরেদের স্কুল । আমার মত প্রচুর ছেলে । সব চোর । ভাবলেই অবাক লাগে । সমাজের উন্নতি কোনো দিন হবে না । এক শ্রেণীর পুলিশের সাথে সর্দারদের যোগাযোগ । প্রচুর টাকার লেনদেন । পাকা ক্রিমিনাল হয়ে মিশে গেলাম ভদ্রলোকের সমাজে । ডাক পড়লে থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হত । কখনো  টাকার ভাগ দিতে আবার  কখনো বা  ডান্ডার বাড়ি খেতে ।মাঝে মাঝে ভাবি আমি শালা চোর । চুরি আমার পেশা । কিন্তু পুলিশ তো চাকরি করে । মাইনে  পায় । তাও বাবুরা তাকিয়ে আছে চোরেদের টাকায়  ভাগ বসাতে ।
      এক মামার  সাইকেলের গ্যারাজ আছে । মামা মানে চোরদের মামা । সামনে সাইকেল রিপেয়ারিং , পেছনে চোরাই মাল পাচার । রাতারাতি সব পার্টস আলাদা করে বস্তা বন্দি করে চালান হয়ে যেত । ব্যবসা যখন জমে গেছে , ঠিক সেই সময়ে এক জাঁদরেল  পুলিশ অফিসার এলেন লোকাল থানায় । কাজ করতেই পারছিলাম না ।কাজ তো করতেই হবে । তা না হলে খাবো কি ? ঠিক ধরা পরে যেতাম । বেধড়ক ঠেঙাতো  । ফেলে রাখতো থানার গরাদের  ভেতর । কোনো নিয়ম কানুন মানত না । তার একটাই কথা তার এরিয়াতে একটাও চোর গুন্ডা থাকতে পারবে না । মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে । এটা  কোনো কথা হলো ? আমরা খাবো কি ? হাওয়া ? তখন আমি জেলের বাইরে । সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম । পেয়ে গেলাম সুযোগ । নতুন কেনা বুলেট মোটর সাইকেলটা পার্ক করে অফিসার  সেলুনে ঢুকেছে দাঁড়ি শেভ  করতে  । আমাকে আর পায়  কে । সেকেন্ডের মধ্যে লক খুলে মোটর সাইকেল নিয়ে ধা ।
           জানতাম মামার দোকানে গেলে ধরা পড়ে  যাবো । পালালাম শহর  ছেড়ে । আমার মামার বাড়ির  গ্রামে । একদম অজ  পাড়া গাঁ । চুরির সুবাদে সবই জানাশুনো । সব জায়গাতেই চোর আছে । চোর থাকলে চোর বাজার ও থাকবে । বেচে  দিলাম মোটর সাইকেল । কিন্তু থাকবো কোথায় ? মামারা জানে আমি এক নম্বরের চোর । প্রচুর বদনাম আমার । সেখানে ঢোকা বারন  । দিনের বেলাটা এদিক ওদিক ঘুরে একটা পুরনো ভাঙ্গা চোরা বাড়ি দেখতে পেলাম । পুরো বাড়িটা একটা অশ্বথ গাছ দিয়ে ঢাকা । একটু রাত  হলে চুপি চুপি ঢুকে পড়লাম বাড়িটার ভেতর । ঘুটঘুটে অন্ধকার । প্রথমে ভাবলাম এখানে মানুষ থাকে না । পরে একটা ভাঙা জানলার পাল্লা দেখলাম খোলা । উঁকি মারতে দেখি বিছানায় একটা বুড়ো শুয়ে আছে । পাশে টুলে  বসে একটা মেয়ে চামচে করে কি খাওয়াচ্ছে বুড়োটাকে । । আরও  ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করার পর আলো  নিভলো । পাশের ঘরে জ্বলে উঠলো একটা হ্যারিকেন । মেঝেতে আসন বিছিয়ে মেয়েটা শুক্নো  রুটি খাচ্ছে জলে ভিজিয়ে । দেখে খারাপ লাগলো । জীবনে এই প্রথম কারোর জন্য খারাপ লাগলো । সাহস করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম । পকেট থেকে একটা ছুরি  বের করে মেয়েটাকে বললাম , চিৎকার করলেই মৃত্যু ।   একটাও শব্দ করবে না । ভয় নেই আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না । রাতের বেলা থাকবো । সকাল হলেই চলে যাবো । কিন্তু তুমি যদি সকালে গ্রামের মানুষদের বলে দাও ,তাহলে তোমার বিপদ ।
মেয়েটা নির্বিকার ভাবে বলল , আমার আবার বিপদ ! কি আছে যে বিপদ হবে ? কথা শুনতে পারি  তবে একটা শর্ত  আছে । আমি বললাম কি শর্ত ? মেয়েটি বলল , ডাক্তার বলেছে আমার বাবা দু’একদিনের মধ্যেই মারা যাবে ।আপনাকে ভগবান পাঠিয়েছে । আমি একা  মেয়েছেলে । কি করে সব সামলাবো ? আপনার দুটি পায়ে পড়ি । আপনি আমাকে বাঁচান । আমরা অত্যন্ত গরিব । আমরা একঘরে হয়ে আছি । সে অনেক কথা । পরে শুনবেন । এখন বলুন আপনি আমাকে এই দায়   থেকে উদ্ধার করবেন কিনা ?
অনেকক্ষন আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় নি । আমার মত নির্লজ্জ্ব ,বেহায়া , সমাজের জঞ্জাল সে কিনা করবে অন্যের উপকার । তাও নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে । আশ্চর্যজনক ভাবে   আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করলাম । এই প্রথম কারুর জন্য আমার মায়া   হল । নিজের বাবা মায়ের জন্য যা কোনোদিন হয় নি , তাই হলো । রাজি হয়ে গেলাম ।        বললাম , ঠিক আছে । আমি দিনের বেলায় তোমার ঘরে লুকিয়ে থাকবো । কাক পক্ষীতেও  টের পাবে না ।
           সদ্য  মোটরসাইকেল বিক্রির টাকা পকেটে । তার থেকে হাজার পাঁচেক টাকা মেয়েটিকে দিয়ে বললাম ,  এটা  রাখ । এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে । আমার পরিচয়টা তোমায় দিয়ে নিই । আমি একটা চোর । এসব চুরির টাকা । চুরি করে পালিয়ে  এসেছি । এতদিন অনেক খারাপ কাজ করেছি । তোমাকে দেখে খুব কষ্ট হলো । সত্যি কথা বলছি । আজ পর্যন্ত কোনোদিন কোনো মেয়েছেলের সাথে নষ্টামী করি নি । তুমি চাইলে আমাকে বিয়ে করতে পার । না চাইলে করবে না । তবে তোমার উপকার আমি অবশ্যই করবো । তুমি চাইলে এখন থেকে আমি চুরি করা ছেড়ে দেব । কোনো একটা কাজ জুটিয়ে নেব ।  ।
মেয়েটি ঝুপ করে আমার পায়ের উপর আছড়ে পড়লো । ওর চোখের গরম জল ভিজিয়ে দিল আমার নোংরা পা দুটো । শধু বলল , আমি রাজি ।
তিন দিনের দিন মেয়েটির বাবা মারা গেল । মেয়েটিকে সব  শিখিয়ে  ভোর থাকতে চলে   গেছিলাম । গ্রামের লোক আমাকে দেখলে সন্দেহ করতে পারে । একটু বেলা বাড়লে গ্রামে ঢুকলাম  একে তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম অমুকদের বাড়িটা কোথায় । বহুদিন খবর নেই । বোনের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে এসেছি । গ্রামের লোক সন্দেহ করলো না । ওরাই আমাকে মেয়েটির বাড়িতে নিয়ে এল । তারপর আর এক প্রস্থ নাটক । যাইহোক , গ্রামের কিছু মানুষকে কাজে লাগিয়ে দিলাম । টাকা ছড়ালে কাকের অভাব হয় না । খুশিতে লেগে পড়লো কাজে । সমস্ত জোগাড়যন্ত্র করে এবার শ্মশান যাত্রা । মনে মনে ঠিক করলাম মেয়েটিকে বিয়ে করে এই গ্রামেই থেকে যাবো । সংসার পাতবো । ভালো হবো । আর চুরি করবো না  । নতুন জীবন শুরু হবে আমার । গ্রামের ছেলেরাই খাটিয়াতে কাঁধ দিল । আমি সবার আগে খৈ ছড়াতে ছড়াতে যেতে লাগলাম । শ্মশানের প্রায় কাছে এসে গেছি । হঠাৎ কে আমার হাতটা চেপে ধরলো । দেখি আমার শহরের সেই পুলিশ অফিসার । ঘটনাচক্রে তার  গ্রামের বাড়ি এখানে । তার ও পিতৃ বিয়োগ হয়েছে । শব  দাহ  করে সদলবলে ফিরছে । আমাকে দেখে অবাক ! বলল , চল আমার সাথে । অনেক অনুনয় বিনয় করলাম । শুনলো না । টানতে টানতে নিয়ে গেল ।
আজ আমি জেল খাটছি । আমার জীবনের  সমস্ত স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল । জানিনা মেয়েটি এখন কোথায় , কি ভাবে আছে ? আমার আর ভালো  হওয়া হলো না । চোর ই থেকে গেলাম । জেল থেকে বেরিয়ে আমি কী  করবো , না , সেটা এখন বলবো না । আগে ছাড়া পাই ,তারপর ।
অসীম
 
 
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply