আলোকপাত – অমিতাভ মুখোপাধ্যায় 

আলোকপাত – অমিতাভ মুখোপাধ্যায় 

  • Post category:প্রবন্ধ
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 10, 2020
  • Reading time:1 mins read

আমার সাংবাদিকতার জীবন  ও প্রাসঙ্গিক দু ‘চার কথা –  অমিতাভ মুখোপাধ্যায় 

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

1975সালে আমি কলা বিভাগের ছাত্র হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করি. এই বছরেই   কোলকাতার “ডালি ” নামে এক শারদ সংকলনে আমার ‘বেকার ‘শিরোনামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়. এই সঙ্গে চলতে থাকে প্রথমে পাণ্ডুয়া রেল স্টেশনে “যাত্রিক ” নামে  একটি  দেওয়াল পত্রিকা প্রকাশ , পরে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা (সাহিত্য সতী, পাণ্ডুয়া, হুগলী ). বন্ধু দের সহযোগিতায় এই পত্রিকার মাত্র তিনটি সংখ্যা( 1976-77)প্রকাশিত হয়. মূলতঃ আর্থিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়. এরপর আমি সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট হই. প্রথমে সনৎ চক্রবর্তী নামক এক সতীর্থর হাত ধরে কলকাতার “সত্যযুগ “পত্রিকায় ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক  হিসেবে সংবাদ লেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি. কিন্তু একজন বেকার কলেজ ছাত্র হিসেবে কলকাতার সঙ্গে বেশিদিন তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব হয় নি. অতএব নিজের জেলার সাহাগঞ্জের এক পাক্ষিক “স্বপ্ন সবুজ ‘পত্রিকায় সংবাদ প্রতিবেদন লেখা শুরু করি. এর পর বর্ধমান জেলার “আলিকালি “পত্রিকায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রথমে সহ ও পরে সংযুক্ত সম্পাদক হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিবেদন, সংবাদ লিখতে আরম্ভ করি. তখন থেকেই সাংবাদিকতার জগতের নানান ভালো -মন্দ দিক আমার সামনে আসে. বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা’র পাশাপাশি সাংবাদিকতা,কোলকাতার নামী দৈনিক “বর্তমান “কাগজের রবিবারের পাতায় ইতিহাস ভিত্তিক প্রতি বেদন(1985-87)ও স্থানীয় সংবাদ দিতে শুরু করি. প্রতিটি প্রতিবেদনএর জন্য পত্রিকা দপ্তর 50টাকা করে দিত . কলকাতার সাপ্তাহিক “পরিবর্তন “পত্রিকায় (এখন নেই )গ্রামীণ সমস্যা মূলক প্রতি বেদন এবং  অন্য নামী -অনামী পত্র পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু  লিখতে শুরু করি. একসময় এই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চেয়ে কলকাতার নামী সংবাদপত্রের দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে বেড়াতে থাকি. তখন আমি এম. এ(ইতিহাস ), বি. এড.সন্তোষ জনক নম্বর নিয়ে  পাস করে গেছি. 

সাংবাদিকতার জগতে এই কর্ম প্রার্থীর জীবন ছিল বেদনা দায়ক অভিজ্ঞতায় পূর্ণ. প্রথমতঃ গ্রামের ছেলে, দ্বিতীয়তঃ কলকাতায় কোন থাকার জায়গা না থাকা, সর্বোপরি টেলিফোনএর সুবিধা না থাকাটা  অন্য তম কারণ ছিল. তবে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশ ও প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকদের পুত্র -কন্যারা নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের সময়ে একটা বিশেষ সুবিধা ভোগ করতেন. কেননা বিভিন্ন পত্রিকার নিয়োগ পরীক্ষার  ফলাফলে এই সত্য অন্ততঃ আমার চোখে পড়েছে. একবার গৌর কিশোর ঘোষ এর মতো বিশিষ্ট  সংবাদ ব্যক্তিত্ব,  বিখ্যাত রস সাহিত্যিক দ্বারবঙ্গের  বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায় (আমার প্রয়াত বড় বোন ও ভগিনীপতির  অত্যন্ত নিকট আত্মীয়) -এর দৈনিক “বর্তমান “পত্রিকার রবিবারএর পাতায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে গৌর বাবুর সঙ্গে পাণ্ডুয়ার একটি অনুষ্ঠানে আলাপ হওয়া ও “রাণুর প্রথম ভাগ”-এর রাণুর সঙ্গে মহানাদ গ্রামে গৌর বাবুকে সস্ত্রীক নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ইত্যাদির সুবাদে তিনি কলকাতার একটি পত্রিকার দপ্তরে একজন কর্মকর্তার কাছে আমাকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলেন. দৈনিক “আনন্দ বাজার “

পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে তখনও গৌর বাবু কর্ম রত ছিলেন. সেই ব্যক্তি কলকাতার কোন আত্মীয়র ঠিকানা দিয়ে আমাকে দ্বিতীয়বার  আবেদন করিয়েছিলেন. পরীক্ষার আগে তাঁকে বায়ো ডাটা ও লেখা পত্র দেখাতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘গৌর বাবু যাকে পাঠিয়ে ছেন -তার সম্পর্কে দেখার কিছু নেই ‘. 

কিন্তু বিধি বাম থাকায় বা কোন এক অজানা কারণে সেই চাকরিটাও আমার হয় নি. সেই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করে একরাশ হতাশা ও অপমান নিয়ে সেই বিকেলেই গৌর বাবুর সঙ্গে দেখা করি. গৌরবাবু সব জেনে শুনে একটা কথাই শুধু বলেছিলেন, “এটা তোমার অপমান নয়, গৌর কিশোর ঘোষের অপমান “. যদিও পত্রিকাটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় নি. 

এরপরও আশা ছাড়িনি. মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে গিয়েছিলো— পেশাদারী সাংবাদিক আমাকে হতেই হবে. শেষে কংগ্রেসের প্রাক্তন মন্ত্রী মাননীয় প্রদীপ ভট্টাচাৰ্য’র (ইনার “প্রাগভাষ” পত্রিকাতেও আমি কবিতা, নিবন্ধ লিখতাম )চিঠি নিয়ে তৎকালীন দৈনিক ” যুগান্তর “পত্রিকায় একটা কাজের জন্য গিয়েছিলাম- শ্রদ্ধেয় তরুণ কান্তি ঘোষ মহাশয়ের কাছে . ইতিমধ্যে বাগবাজারের অফিসে অমিতাভ চোধুরীর কাছে ( সম্ভবতঃসেই সময় তিনি  বার্তাসম্পাদক ছিলেন  )হুগলী জেলার সংবাদ  প্রতিনিধি হিসেবে একটা কাজের আশায় ছ’মাস ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে. প্রথমে ভালো ব্যবহার করলেও শেষে অপমান করেছিলেন. অমিতাভ বাবু অবশ্য  তাড়াবার আগে পাঁচটি বানান লিখতে দিয়েছিলেন. এর মধ্যে ‘আশিস বানানটি আমি ভুল করে ‘আশীষ ‘লিখে ছিলাম. উনি এ টি. দেব অভিধান পড়া ছাত্র বলেছিলেন. “চলন্তিকা “র নাম শুনেছি কিনা জানতে চেয়ে বাগবাজারে সবজির দোকান দিতে বলেছিলেন. আমি সেই নির্মম অভিজ্ঞতা তরুণ বাবুকে বলতেই উনি দুঃখ প্রকাশ করে আসল কথাটি বলেছিলেন.দিয়েছিলেন  “যুগান্তর” পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগাম সংবাদ. উনিই  অভিভাবক তুল্য পরামর্শ দিয়ে বলে ছিলেন, ‘এম. এ, বি এড. পাস করেছো, বাড়ীর বড় ছেলে, ব্যক্তি মালিকানার কাগজে কাজের  কোনো নিরাপত্তা নেই. হাউসএর মন জুগিয়ে চলতে না পারলে টিকে থাকতে পারবে না’. সংবাদপত্রের জগতে এর থেকে চরম সত্য তখনও ছিল না আজও নেই. উনি আমাকে শিক্ষকতার পেশায় চলে যেতে বলে ছিলেন. এর পর দৈনিক “বর্তমান” পত্রিকায় লেখা লিখির সুবাদে কাজ পাওয়ার আশায় গিয়ে অফিস ভর্তি সাংবাদিকদের সামনে বার্তা সম্পাদক ভূপাল বাবু আমাকে অপমানকর কথা বলে কার্য্যত তাড়িয়ে দিয়েছিলেন. তারপর থেকে ঐ কাগজে লেখা বন্ধ করে দিই. 

       এটাই আমার বিধিলিপি ছিল. শেষে পেশাদারী  সাংবাদিক জীবনকে বিদায় জানিয়ে আমি মহামান্য  হাইকোর্ট এর নির্দেশে” পাণ্ডুয়া শশিভূষণ    সাহা উচ্চ বিদ্যালয়ে1990 সালের october মাসে  ‘ইতিহাস’ বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি. জীবনে আরও নির্মম অভিজ্ঞতা বাকী ছিলো. কাজ চলা কালীন পরে পরিচালন সমিতির অনুমতি নিয়ে পর্যায় ক্রমে এম. এড. (1995)ও শিক্ষাতত্ত্বে পি. এইচ. ডি. (2003)করি. কিন্তু সহজ পথে প্রাপ্য সম্মান মেলে নি.বিদ্যালয়ে (2003-17)উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা বিজ্ঞান পড়ালেও বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির  অসহযোগিতায় শেষে মাননীয় হাই কোর্টের নির্দেশে ইনক্রিমেন্টাল বেনিফিটগুলি পাই. 2017এর মার্চে অবসর নিই .শিক্ষকতার চাকরি পেলেও বর্ধমানএর “জিরো পয়েন্ট “পত্রিকায় 2001 পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে সংযুক্ত সম্পাদক হিসেবে সম্পাদকীয় ও রাজনৈতিক প্রতিবেদন লিখে পরিচিতি পাই. 2003 সালে ভারত সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে “সুপত্র “নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ  শুরু করি. “সুপত্র” নবীন- প্রবীণ, নামী -অনামী লেখকদের সঙ্গী করে 18 বছর শেষ করতে চলেছে. একাধিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছে. আমি কর্ম জীবনে একজন প্রান্তিক কবি ও  লেখক হিসেবে “একটি সরল রেখার খোঁজে”( 1993), “সময়ের অব্যয় “(1999), “ব্রাত্য “(2003)নামে তিনটি কবিতা সংকলন, “একটি ছেঁড়া জীবনের গল্প “(2013),নামে একটি গল্প সংকলন,  “অলয় বসন্ত “(2016)ও “প্রণয় বিবর “(2017)নামে দুটি উপন্যাস প্রকাশ করে মানসিক তৃপ্তি পেয়েছি. এর জন্য নিন্দা ও স্তুতি দুইই আমি  পেয়েছি. “সাত নুড়ি “নামে একটি গল্প সংকলনও প্রকাশ পথে. 

          দীর্ঘ অপেশাদার সাংবাদিক জীবনে আমার অভিজ্ঞতা নির্মম ও হতাশার হলেও  কিছু কথা বলতেই হয়. আমাদের দেশে যেহেতু সরকারি সংবাদ পত্র নেই তাই দু -একটি মুদ্রিত জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদ পত্র ছাড়া সত্যিই সব পত্রিকা ব্যক্তি মালিকানার স্বার্থে নিরপেক্ষ নয়. ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আরও বেশী অনিরপেক্ষ.টি আর পি বাড়ানোর জন্য  পেইড বা হলুদ সংবাদ প্রকাশ, রাজনৈতিক আলোচনা সভা বসিয়ে যুক্তির থেকে বিতর্ক তৈরীর কৌশল বড় বেশী চোখে পড়ছে. দেশের সদ্য পরিস্থিতিতে নানা ক্ষেত্রে তার প্রমাণ মিলেছে. এই বিষয়গুলি আদালত পর্যন্ত গেছে. প্রিন্ট মিডিয়ায় আজ আর ভবিষ্যতের দায়িত্বশীল  সাংবাদিক তৈরী হয় না. কাগুজে বাঘ তৈরী হয়. সত্য ঘটনার সঠিক উপস্থাপনা বড়ই কম. প্রেস কাউন্সিল, এই সংক্রান্ত সংগঠন গুলি দলাদলির প্রভাব মুক্ত নয়. বেশির ভাগ মালিক সংবাদ দাতা ও কর্মীদের সর্বোপরি সাময়িক কলামিস্ট -লেখক দের সঠিক পারিশ্রমিক দেন না. অবসর কালীন সুবিধা, নিরাপত্তা এই করোনা পর্বে আরও বিঘ্নিত হয়েছে. অনেকের কাজ চলে গেছে. আর্থিক সুবিধাও মেলে নি. 

      আজকে খুশবন্ত সিং, সন্তোষ কুমার ঘোষ, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, গৌর কিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, সুমন চ্যাটার্জী, সোম্য বন্দ্যোপাধ্যায়,  এন. রাম. এম. জে. আকবর সর্বোপরি আজকের মুখ্য সচিব অতীতের সাংবাদিক আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, জাতীয় টি ভি চ্যানেলের প্রণয় রায়, রবীশ কুমার  প্রমুখদের মতো সাহসী সাংবাদিকের বড়ই অভাব. 

      শেষে বলি, সমাজে মূল্যবোধের অভাব যখন শুরু হয় তখন তার প্রভাব সব পেশাতেই দেখা দেয়. আজ সব নোবেল বা সম্মান জনক পেশাতেই সততার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে. ব্যতিক্রম থাকলেও বুকে হাত দিয়ে গর্ব করার মতো অবস্থায় আমরা নেই. তাই আত্ম সমীক্ষার সময় এসেছে. পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটাই আমাদের বিশেষ  কর্তব্য মনে করা উচিত.

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply