একই আলো পৃথিবীর পারে –  ফাবিহা বিনতে হক

একই আলো পৃথিবীর পারে – ফাবিহা বিনতে হক

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 10, 2020
  • Reading time:1 mins read

সকালের রোদ চোখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল তরুর চোখ কচলে কচলে চশমাটা পড়ে ঘড়ির দিকে তাকালো সে ঘড়িতে তখন ভোর ৬টা বেজে ২০ মিনিট তরু সবসময় সকাল ৮টা বা ৯টায় ঘুম থেকে ওঠে আজ এত সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ সে ধরতে পারছে না রাতে ঠিকমত ঘুমাতেও পারেনি কেন এমন হচ্ছে কে জানে?

এই সময়ই দরজা ঠেলে তরুর মা রোকেয়া বেগম ঘরে ঢুকলেন 

-কী রে? এখনই উঠে গেছিস যে? ঘুম ভেঙে গেছে?

তরু আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললো,হুম

-ঘুম ভালো না হলে আরেকটু ঘুমিয়ে নে মা নাহয় চোখের নিচে কালি পড়ে দেখতে বাজে লাগবে

এতক্ষণে তরু তার অস্থিরতার কারণ ধরতে পারলো আজ তাকে দেখতে আসার কথা পাত্র-র কোন আত্মীয় না,চাচী-মামী না,সরাসরি ছেলে নিজেই মেয়েকে দেখতে আসবেতাদের দেখা হবে অবশ্য বাইরে একটা রেস্টুরেন্টেঘরোয়া পরিবেশে মেয়ে দেখাদেখি আধুনিক পাত্রের একেবারেই পছন্দ না

 এই পর্যন্ত বেশ কয়েকবার শাড়ি চুড়ি জড়িয়ে,প্রসাধনী মেখে পাত্রপক্ষের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে তরুকে কিন্তু এখনো সে কাজটার সাথে অভ্যস্ত হতে পারেনি কারো দেখতে আসার নাম শুনলেই তরুর অস্থির লাগে,নিদারুন টেনশনে তার সারাদিন কাটে 

তরু মৃদু হেসে মা-কে উত্তর দিলো,”সারা গায়ে তো এমনিই কালি, মানতুন করে আর কোথায় কালি পড়বে বলো তো?”

রোকেয়া বেগম মেয়ের কথা শুনে মলিন মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেনতরু বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালোসূর্যের আলো কাচের আয়নায় পড়ে তার মুখটাকেও উজ্জ্বল করে তুলছেমাথাভর্তি এলোমেলো চুলগুলো নেমে গেছে কোমড় পর্যন্ততরুর গায়ের রঙ শ্যামলা যাকে খাঁটি বাংলায় কালো বলা হয়,ঠিক তেমনইচেহারায় তেমন কোন বিশেষত্ব নেইশুধু ডাগরডাগর চোখগুলো ছাড়াসেই চোখগুলোও হাই পাওয়ারি চশমায় ঢাকা পড়ে গেছে বলে তরুর মায়ের দুঃখের অন্ত নেইতার ধারণা,এত সুন্দর চোখ যে দেখতে পাবে,সে কখনোই তার মেয়েকে অপছন্দ করতে পারবে নাচশমা দিয়ে ঢাকা পড়ে যায় বলেই তরুকে আজও কোন পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়নি

একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স পাস করেছে সে গতবছরকিন্তু পাত্র দেখাদেখির পালা শুরু হয়েছে তারও বছর দুই আগে থেকেইকিন্তু আগে তোড়জোড় ছিল নাএখন তরুর বাবা মোকাম্মেল হোসেন তার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেনমোকাম্মেল হোসেন যতই কোন পক্ষকে ধরতে চাইছেন,ততই যেন সবাই পিছলে যাচ্ছেএই কথা ভেবে তরুর হাসি পেয়ে গেলপাত্রপক্ষগুলো যেন শিং মাছ আর তার বাবা শিকারীযতই ধরতে চাইছেন পিছলে যাচ্ছে আর বিষকাটাগুলো লাগছে তরুর গায়েব্যথার যন্ত্রণায় বেশ কয়েকদিন ছটফটিয়ে আবারও সেই মাছ ছোঁয়াছুয়ি খেলাএই খেলার শেষ কোথায়?

ছোটবেলায় তরুর গায়ের রঙ ধবধবে সাদা না হলেও ময়লা ছিল নাকিন্তু দুই বছর বয়সের পর থেকেই তরুর উজ্জ্বল রঙ মলিন হতে শুরু করে আর তা যেন দিন দিন বেড়েই যাচ্ছেতরুর মা রোকেয়া বেশ কয়েকটি রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনী এনে দিলেও তা তেমন কাজ করে নিকিন্তু তিনি এখনো হাল ছাড়েননিতাদের বাসায় নিয়মিত /৪টি সংবাদপত্র রাখা হয় শুধু রূপচর্চা বিষয়ক লেখাগুলো পড়বেন বলেতিনি আধুনিক প্রযুক্তি তেমন ব্যবহার করতে জানেন না,তাছাড়া ওগুলো তেমন বিশ্বাসও করেন নাতাই সংবাদপত্রই একমাত্র ভরসা তারতিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পড়েনস্পেশাল তথ্যগুলো কাটিং করে রেখে দেনতরুর মা এবং বাবার জীবন আবর্তিত হয় তরুর বিয়েকে কেন্দ্র করেতাদের একমাত্র চিন্তার বিষয় হচ্ছে তাদের  কন্যার বিবাহতরু মাঝে মাঝে ভাবে তার  বিয়ে হয়ে গেলে এই মানুষগুলো বাঁচবে কী নিয়ে

তরুর ভাইবোন নেইছোট থেকেই একা একা বড় হয়েছে সেঈদ,পূজার ছুটিতে তরুর,চাচাতো-মামাতো ভাইবোনেরা যখন গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতোতখন সবার মাঝে থেকে সে বুঝতে পারতো তার চেহারা বদলে যাচ্ছেআত্মীয়স্বজনরা তরুর মা-কে জিজ্ঞেস করতে করতে জেরবার করে দিতেন,কেন তার এই ফর্সা সুন্দর মেয়েটা কালো হয়ে গেলএকবার বাচ্চারা সবাই বর-বউ খেলছেতখন দেখা গেল,কেউই তরুকে বউ করতে চাচ্ছে নাওর এক মামাতো বোন বলেই ফেললো,”মা বলেছে কালো মেয়েদের বিয়ে হয় বোবাকালার সাথেআমরা কেউ বোবাকালা নই, তাই তোর বিয়ে হবে না তরু।“

প্রচন্ড দুঃখ পেয়ে তরু মায়ের কাছে গিয়ে কেঁদেছিলো খুবএরপর থেকে তরু আর কোথাও যেতে চাইতো নানিজেকে একটু একটু করে গুটিয়ে ফেলতে শুরু করেছিলো সেই ছোট থেকেইতরুর বন্ধুবান্ধবও খুব কমসে কোন আড্ডায় থাকে নাকোনো বিয়েবাড়িতে যায় নাক্লাস শেষ করে সোজা বাড়ি-এটাই ছিল তার জীবনের গন্ডিতরুর ক্যাম্পাসের এক ছেলে সহপাঠী তাকে ডাকতো,কৃষ্ণকলিসেই ছেলেটাকে তরুর ভালোই লাগতোক্লাসে চুপচাপ বসে দূর থেকে তাদের আড্ডা দেখতোকখনো ক্লাসে না এলে তরুর মন খারাপ হতোকিন্তু কখনো বলা হয়নি ওকে তার ভালো লাগার কথাযে মেয়েটা শৈশবকাল থেকেই হীনমন্যতায় ভুগতে ভুগতে বড় হয়,তার কাছে যেকোন ক্ষুদ্র ইচ্ছেগুলোও থাকে পথের পাশে বেড়ে ওঠা দূর্বাঘাসের মতোসেগুলোকে বাড়তে না দিয়ে পিষে ফেলাটাই যেন নিয়মতাই তরুও তার সবুজ সবুজ অনুভূতিগুলো মেরে ফেলতে চেয়েছে আজীবনতাও কিছু ইচ্ছে মুখচোরা হয়ে নিজের অজান্তেই থেকে যায়তরুর মন ভালো থাকলে সেকৃষ্ণকলি আমি তারে বলিগানটা গুনগুন করে গায়সে এতই আস্তে আস্তে সুর বাঁধে যেন দেয়ালও শুনতে না পায়যেন কৃষ্ণকলিদের মন ভালো হওয়াটা অন্যায়কিন্তু আজকাল আর তরুর মন ভালো থাকে নাবাবা-মা তাকে নিয়ে এত চিন্তায় আছে তা ওর ভাবতে ভালো লাগে নানিজের প্রতি একধরনের বিতৃষ্ণা ভর করছে ওকে ক্রমশইপৃথিবীর সবাই ওর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শুধু তার এই কালো কুচ্ছিত মুখটার জন্যইকৃষ্ণকলিরা শুধু কবিতা,গল্পেই ভালবাসা পায়বাস্তবজীবনে তাদের কেউ গ্রহণ করতে চায় নাস্বয়ং রবিঠাকুরই কী বিয়ে করেছিলেন নাকি সেই কৃষ্ণকলিকেচুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে এসবই ভাবছিলো তরুভেবে নিজেই নিজের ভাবনায় লজ্জিত হয়ে গেলসে-ও কী ওর বাবা-মা এর মত শুধু বিয়ে কেন্দ্রীক চিন্তাভাবনা করতে শুরু করে দিয়েছে? বিয়েই কী একমাত্র ধ্যানজ্ঞান তপস্যা কোন মেয়ের জীবনে? হঠাৎ তরুর খুব কষ্ট হতে লাগলোনিজেকে তুচ্ছ,ক্ষুদ্র ভাবতে ভাবতে সে এখন ক্লান্ততার বাবা মেয়ের জন্য একটা নতুন শাড়ী কিনে দিয়েছেন কেবল পাত্রের সামনে পড়ে যাবে বলেমোকাম্মেল হোসেন-এর ধারণা হালকা গোলাপি রঙের শাড়িতে তরুর গায়ের রঙ উজ্জ্বল দেখায়কিন্তু তরুর ধারণা কোন বইয়ে এমন তথ্য পেয়েছেন মোকাম্মেল সাহেবশাড়ীর আঁচলে চোখ মুছলো তরুএকটু সকাল সকালই তৈরী হয়ে নিয়েছে সেএকটু পর পর মায়ের তাগাদা শোনার থেকে রেডি হয়ে বসে থাকা ভালোএই সময় মোকাম্মেল সাহেব তরুর ঘরে আসলেন। 

-কী রে মা,এখনই তৈরী হয়ে গেছিস নাকি? বাহ্ বেশ মানিয়েছে তো রংটায়

তরু শুধু একটু হাসলোকিছু বললো না। 

মোকাম্মেল সাহেব আবার বললেন,”যেকোন ফর্সা মেয়ে থেকে তোকে কোনো অংশেই কম মনে হচ্ছে নাছেলে বাপ বাপ করে রাজি হয়ে যাবে দেখিস।“

এই কথা শুনে তরুর মনটা আবারও তিক্ততায় ভরে গেলতাকে কেন সবসময় একটা ফর্সা মেয়ের মত হতে হবে? যেখানে তার নিজের বাবা-মা সন্তানের স্বকীয়তা ভালবেসে গ্রহণ করতে পারছে না,তার গায়ের রঙ-কে দূর্বলতা হিসেবে মেনে নিয়েছে,এই সমাজ তাকে আর কিভাবে গ্রহণ করবে? তরুর বাবা-মা যদি সবসময় নিজের মেয়েকে ফর্সা বানানোর চেষ্টা না করতেন,মেয়েকে অন্যের ঘরে দিয়ে দেবার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা না করতেন তাহলে আজ তরু অন্যরকম হতে পারতোতরু নিজেকে ভালবাসতে পারতো,আর দশটা মেয়ের মত সবার সাথে স্বচ্ছন্দে মিশতে পারতো,গান গাইতে পারতো,কান্না এলে হৃদয় উজাড় করে কাঁদতেও পারতোসবাই শুধু সমাজের দোষ দেয় কিন্তু সব সমস্যার সূচনা হয় পরিবার থেকেইবাবা-মায়েরা সন্তানের ভবিষ্যতের প্রতি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন একের পর এককিন্তু এতে করে যে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষটা একটু একটু নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাতে থাকে তা তারা বুঝতে পারেন না

তরু পৌঁছে গেল ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টেপাত্রকে খুঁজে পেতে তার বেগ পেতে হলো না কারণ ছেলেটি নিজেই ওকে খুঁজে নিয়েছেবেশ লম্বা,সাধারণ চেহারার একটি ছেলেপ্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে বছর দুয়েক হলোপ্রথমে দু’জনের কেউই কথা বলতে পারছিলো নানীরবতা ভাঙলো প্রথমে ছেলেটিই

-আপনার নামটা সুন্দরতরুউচ্চারণ করতে না করতেই মিলিয়ে যায়আমার নাম জানেন নিশ্চয়ই?

তরু মাথা নেড়ে জবাব দেয়,”জ্বী,মাহমুদ।“

-আপনি কী অবাক হয়েছেন, কেন আমি আমার সাথে কাউকে নিয়ে আসলাম না?

তরু কিছু বললো না,শুধু তার বড় বড় চোখ দুটি মেলে তাকিয়ে রইলো মাহমুদের দিকেমাহমুদ নিজেই বলতে শুরু করলো,”আমার সাথে আর কেউ আসেনি কারণ এতজনের খাবারের বিল দেওয়ার মত টাকা আমার নেইআমি খুব সাধারণ একটা চাকরি করিতাতে বেতন খুবই কমএতটাই কম যে কোন বড় হোটেলে দুইজনের বেশী বিল দিতে গেলে আমার মাসের বাকী দিনগুলো হাত কামড়ে পড়ে থাকতে হবে।“

তরুর এই সাধারণ গাট্টাগোট্টা লোকটাকে এক লহমায় পছন্দ হয়ে গেলকোনরকম কপটতা না রেখে যে নিজের অপারগতা প্রকাশ করতে জানে সে নিঃসন্দেহে ভালো মানুষতরু কী কোনদিন পারবে মাহমুদের মত আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের কথা বলতে?

মাহমুদ আবার বলতে শুরু করলো,”আমি বুঝতে পারছি না,আপনার পরিবার কীভাবে আমার সাথে সম্বন্ধ করতে রাজী হলেন? এত চমৎকার একটি মেয়েকে তারা ছেড়ে দিলেন একটা সরকারি কেরানীর সাথে দেখা করবার জন্যে?”

তরুর মনে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেছে খুব ধীরেতার গলার কাছে কী যেন আটকে যাচ্ছে বারবারএই জীবনে আজ পর্যন্ত কেউ তাকে চমৎকার বলে নি কিংবা এর কাছাকাছি কোন শব্দ দিয়েও তরুর প্রশংসা করেনিতরুকে প্রশংসা করার একমাত্র বাক্য হচ্ছে,’বাহ তোমাকে তো বেশ ফর্সা দেখাচ্ছে‘।

তরু নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,”নিজেকে এত তুচ্ছজ্ঞান করছেন কেন? কেরানীরা কী মানুষ না?”

মাহমুদ এসব কথার কোন ধার না ধেরেই বলা শুরু করলো,”শোনো তরু,আমি চাইলে আমার মা-কে নিয়ে তোমার বাড়ি যেতে পারতাম এতে করে কী হতো জানো? তোমাকে সার্কাসের পুতুল সেজে আমাদের সামনে বসে থাকতে হতো আর আমিও তোমার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতাম নাসমাজের এসব বাজে সিস্টেম আমি ভাঙতে চাইছিএই যে সরকারি চাকরিটা আমি করছি সেটাও আমার মায়ের অনুরোধেআমার বাবা নেইছোট থেকে মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেনআমার মায়ের ধারণা সরকারি চাকরিই জীবনে উন্নতি করার একমাত্র উপায়কিন্তু আমি অন্য চাকরীও খুঁজছিপেয়ে গেলে এই চাকরী ছেড়ে দিবোআমি তখন থেকেই দেখছি,তুমি খুব আড়ষ্ট হয়ে বসে আছোএখানে কী তোমার খুব অসুবিধা হচ্ছে?”

তরু তাড়াতাড়ি উত্তর দিলো,”না না,আমি ঠিক আছিআপনি বলুন না,আমি শুনছি।“

মাহমুদ একটু হেসে উত্তর দিলো,”তুমি কী জানো তোমার কোন ছবি আমাকে পাঠানো হয়েছে?”

ফোন বের করে তরুর একটা ছবি তাকে দেখালো মাহমুদছবিতে তরু-কে খুব ফর্সা মনে হচ্ছেতরুর মুখ অপমানে লাল হয়ে গেল,তার চোখ ফেটে জল আসছেআর কতবার তাকে এভাবে অপমানিত হতে হবে?

তরুর এই অবস্থা দেখে মাহমুদ একটুও বিচলিত না হয়ে বললো,”তরু আমার তোমাকে পছন্দ হয়েছেছবি দেখে  ভালো লেগেছিলো বলেই এসেছি কিন্তু বাস্তবে দেখতে আরও মায়াবী মনে হয়েছেছবিতে তোমার এই দুঃখী দুঃখী মায়াবী ভাবটা নেইকিন্তু সামনাসামনি আছেতরু আমি জানি,কেন তুমি জড়োসড়ো হয়ে আছোএই জায়গায় আশেপাশের সবাই বেশ ফ্যাশনেবল,চকচক করছে সবাইসেখানে তোমার নিজেকে একেবারেই বেমানান লাগছেতুমি ভাবছো,সবাই তোমাকে আড়চোখে দেখছে আর হাসাহাসি করছেঠিক না?”

তরু কোনো উত্তর না দিয়ে চোখের পানি মুছলোক্রমেই এই অসাধারণ মানুষটার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে সেএতটা গুরুত্ব দিয়ে কেউ কখনো তার সাথে কথা বলেনিকেউ কখনো তাকে বোঝার চেষ্টাও করেনিএই প্রথম কারোর চোখে সে সুন্দর হতে পারলো। 

মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলা শুরু করলো,”কিছুক্ষণ আগে তুমিই আমাকে বলছিলে নিজেকে তুচ্ছজ্ঞান না করতে আর এখন তুমি কী করছো বলো তো? কী নিয়ে এত দুঃখ তোমার? গায়ের রঙ নিয়ে?”

সময় তরুর একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের হাতের পাশে রাখলো সেতরু ঘটনার আকষ্মিকতায় এতটাই বিহবল যে,বুঝতেই পারছে না কী হচ্ছে

মাহমুদ বলতে শুরু করলো,দেখো,তাকিয়ে দেখো,আমি তোমার চেয়েও কালোকই আমার তো দুঃখ হচ্ছে নাএমনকি কোনদিন আমার মনেও হয় নি কেন আমি কালো হলাম আর আমার বোন ফর্সা হয়ে জন্মালোতরু তুমি হয়ত বেশ স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে উঠেছো তাই গায়ের রঙ নিয়ে মাথা ঘামাবার মত অজস্র সময় তোমাদের হাতে ছিলকিন্তু আমাকে বড় হতে হয়েছে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করতে করতেআমি ছোটবেলায় জানতাম না,দুপুরে ভাত খেলে রাতে ভাত খেতে পারবো কিনাসবাই পড়াশোনা করতো একটা ভালো রেজাল্টের আশায় আর আমি করতাম যেন স্কলারশিপ পেতে পারিস্কলারশিপের টাকায় যেন পড়ালেখাটা চালিয়ে নিতে পারি,থামতে না হয়। 

আমি বুঝতে পেরেছি,কেন তোমার বাবা এই সম্বন্ধ করতে রাজী হয়েছেনতারাও তোমার মত তোমার রঙ নিয়ে খুশি ননপৃথিবীর একটাই রং আর সেটা হলো ক্ষুধাবাকী যেসব ছাইপাশ রয়েছে তা তৈরী করে সমাজ,তোমার আমার মত অনেকের বাবা-মাএই সমাজের রঙ আমি বদলাতে পারবো না কিন্তু নিজেকে যেন এই নোংরা সিস্টেমের বলি হতে না হয় সেই চেষ্টা করে যাচ্ছিতুমিও নিজেকে বলি করো নাকখনো নিজেকে অসুন্দর ভেবো না।“

তরু মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই বিষ্ময়কর মানুষটার কথা শুনে যাচ্ছিলোতার কাছে আশেপাশের সবকিছু এক মুহূর্তের জন্য বিলীন হয়ে গিয়েছিলতারা যেন প্রস্তর যুগের ধ্বংসাবশেষ এর মাঝে বসে থাকা এক জোড়া জীবন্ত প্রাণ। 

সন্ধ্যাতারার মত ঝলমল করতে করতে তরু বাড়ি চলে এলো আজ তরুর দিনটা অন্যসব দিন থেকে আলাদা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় মার্ক করে রাখলো সে ঘরে ফিরে কারো সাথে কথা না বলে দরজা বন্ধ করে দিলো আজকের এই সময়টা শুধু সে নিজের জন্য রাখবে দরজা বন্ধ করে এতদিনের লুকানো সব কান্না একসাথে বের হয়ে আসলো এতগুলো বছরের অবহেলা,এত মানুষের অবজ্ঞা,টিপ্পনী, নিজেকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত রাখা আর কোন এক অচেনা মানুষের প্রতি জন্মানো আবেগ সবই যেন চোখের পানি হয়ে বের হচ্ছে হৃদয়ের কোণ থেকে তরুর মনে ভাসছে প্রথমবার ওকে যখন দেখতে এসেছিল সেইদিনের কথা ছেলের মা ওকে দেখে বলেছিলো,”তা মা,গায়ের রং এত পোড়ালে কী করে? বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে খুব রোদে ঘোরাঘুরি করো বুঝি?”

তরুর মনে পড়ছে,তার বাবা ওর এক জন্মদিনে একটা দামী পুতুল উপহার দিয়েছিল তরু রাগ করে সেই পুতুলের গায়ে কালো রং করে দিয়েছিল

তরুর কান্নার আওয়াজ এখন ওর বাবা-মা শুনতে পাচ্ছে তারা দরজায় ভয়ে আতংকে অস্থির হয়ে বারবার দরজায় আঘাত করছে তরুর মা কান্না জুড়ে দিয়ে বলছেন,” কী হয়েছে মা বল? আর কখনো তোকে কারো সামনে যেতে হবে না মা ছেলে কী বলেছে তোকে মা?”

তরুর বাবাঃআরে না বললে বুঝবো কী করে? আমি এখনই ছেলের বাড়িতে ফোন করছি কেরানীকে আমি পুলিশে দেবো

এই সময় তরু চোখ মুছে দরজা খুলে বললো,”আমি ঠিক আছি মা তোমাদের কাউকে কিছু বলতে হবে না।“

তরুর মা ইনিয়ে বিনিয়ে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে ওখানে কী হলো কিন্তু তরু কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেইনিরাতে তরু অপেক্ষা করেছিলো মাহমুদের ফোনকলের কিন্তু কোনো ফোন আসেনিতরু মরে গেলেও ওকে ফোন করতে পারবে না তাই অপেক্ষা ছাড়া ওর কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল নাতরু সারারাত ঘুমাতে পারলো নাচোখ বন্ধ করতেই মাহমুদের মুখটা ওর সামনে ভেসে উঠছিলোএই অনুভূতি ওর ছাব্বিশ বছরের জীবনে এই প্রথমতরু তার শাড়িটা ভাঁজ করে যত্ন করে তুলে রাখলোআজকে যা যা ব্যবহার করেছে-চুলের ক্লিপ,স্যান্ডেল থেকে শুরু করে কপালের টিপটা পর্যন্ত আলাদা বক্সে রেখে দিলো সে। 

জানালা খুলে তার সামনে দাঁড়ালো তরুআকাশে তখন পূর্ণিমার ঝকঝকে চাঁদএতদিন সব সুন্দর থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছে সেকিন্তু আর নাযে যাই মনে করুক,এই পৃথিবীর কাছে সবার যেমন দাবী,তারও ঠিক ততোটাইনিজেকে আর কখনো এতটুকু ছোট হতে দেবে না সে

সকাল হয়ে গেলনাশতার টেবিলে তরু খুব হেসে হেসে সবার সাথে কথা বললোতরু বললো,” বাবা আমি চাকরির পড়াশোনা শুরু করবোতোমাদের ঘাড়ে বসে আর কতদিন বলো?”

এই কথা শুনে তরুর বাবা-মা অবাক হয়ে গেলওর বাবা বললেন,”ঠিকাছে মা,করতুই যা ভালো মনে করিস।“ তরুর বাবা-মা মেয়েকে এত প্রাণবন্ত আগে তেমন দেখেনিতারা বুঝতে পারলো,গতকালের ঘটনার জন্যই তার মেয়ের এত পরিবর্তননিশ্চয়ই ছেলের পছন্দ হয়েছে তরুকেমোকাম্মেল হোসেন নিশ্চিন্ত মনে বাজার করতে গেলেনসারাদিন গেল তরুর কাছে কোনো ফোন এল নাহয়্ত অফিসে আছে ভেবে তরু অন্য কাজে মন দিতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারছিল নাতরু নিজেই কী দেবে? না,না তাহলে মাহমুদ ওকে হ্যাংলা মেয়ে ভাববেনাকি ফোন করেই দেখবে,যা ভাবার ভাবুকএইসব দোটানায় সন্ধ্যা হয়ে গেলকিন্তু ফোন আর এলো না

এদিকে ফোনের অপেক্ষা করছেন মোকাম্মেল সাহেবওছেলের পছন্দ হলে তাদের তো অফিশিয়ালি জানাতে হবে নাকি,এভাবে চুপ মেরে বসে থাকলে তো কিছুই আগাবে নামোকাম্মেল সাহেব ঘটককে ফোন দিলেন রাতেঘটক বললেন,তিনি পরে জানাবেনকিন্তু ঘটকও আর ফোন দিলেন না

বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা আর ওর অস্থিরতা সবকিছুর জন্য তরু নিজেই মাহমুদকে ফোন দিলোরিং হয়ে কেটে গেল কেউ রিসিভ করলো নাবাইরে আকাশে গাঢ় মেঘ জমেছেতরু জানালা বন্ধ করতে গেল কিন্তু করলো নাবৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছেবৃষ্টির ছাঁটে তার গায়ের ওড়না ভিজে যাচ্ছেভিজে যাচ্ছে ওর সেলফে রাখা বইখাতাওতরু ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে জানালার সামনেযেন এই জানালা দিয়েই কোন এক কাঙ্ক্ষিত খবর আসবেএলো না,কেউ এলো না কোন সুখবর নিয়ে। 

ফোন এলো রাতেঘটক জানালো পাত্র-র মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে কিন্তু ছেলের মুখে পাত্রীর বর্ণনা শুনে ছেলের মা না করে দিয়েছেন নিয়ে বাসায় মহা গোলযোগ বেঁধেছেছেলে বিয়ে করবেই কিন্তু মা কিছুতেই কালো মেয়েকে ঘরে তুলবেন নাছেলের সাথে রাগ করে মায়ের খাওয়াদাওয়া বন্ধঅগত্যা ছেলেকে মায়ের কাছে হার মানতেই হলোঘটক ফোন করতেই নাকি ছেলের মা ঘটককে রাজ্যের গালিগালাজ করেছেন কেন তিনি জেনেশুনে এমন মেয়ের সাথে তার হীরের টুকরো ছেলের বিয়ের প্রস্তাব দিলো

একটানা দুইদিন খুব বৃষ্টি হলো ঢাকা শহরে,সাথে বজ্রপাতওবৃষ্টির পানি জমে রাস্তাঘাট ভেসে গেলোদুদিন পর আজ আবারও রোদের দেখা মিলেছেতরু সেদিনের পর জানালাটা আর একবারের জন্যও লাগায় নিখুব স্বাভাবিকভাবে ঘরের কাজকর্ম করেছে,বাবা-মায়ের সাথে কথা বলেছেকিন্তু মা খুব কেঁদেছেন আর বাবা-ও গম্ভীরতরু সংবাদপত্র গোছানোর সময় হঠাৎ একটা লেখায় চোখ আটকে গেলএকটা কলাম,নামঘৃণ্য সমাজব্যবস্থা এবং আমরা”,লেখক মাহমুদ নূরসবটা কলাম পড়লো তরুওকে যা বলেছিলো সেদিন,তারই সারমর্ম লেখা কলামটায়এই সমাজের ঘৃণ্য সিস্টেম থেকে বের হওয়ার উদাত্ত আহবান করেছে লেখকলেখাটা পড়ে খুব হাসলো তরুহাসির শব্দ শুনে তার মা ঘর থেকে বের হয়ে ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,”কী হয়েছে? কী হয়েছে?”কোন উত্তর না দিয়ে মায়ের হাতে পেপার‍্টা দিয়ে ঘরে চলে গেল তরু হাসতে হাসতেই বুঝতে পারছে না কেন এই হাসিমাহমুদের হিপোক্রেসির জন্য হাসি পাচ্ছে নাকি মাহমুদের মত এত আত্মবিশ্বাসী ছেলেকেও মাঝে মাঝে সমাজব্যবস্থার ঘৃণ্য সিস্টেমের বলি হতে হয়,তাই?

অনেকেই চায় সমাজটাকে বদলে দিতে কিন্তু পারে নাতাদের সময়,তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সেই কাজে তাদের পাশে থাকে নামাহমুদ তাদের দলেরই একজনহঠাৎ মাহমুদের প্রতি করুণা হয় তরুরমাহমুদ ওকে নিষেধ করেছিল এই সমাজের ঘৃণ্য সিস্টেমের বলি হতে কিন্তু বলি হলো মাহমুদ নিজেইহয়ত মাহমুদ বেঁচে গেলোতবে তরু আর বলি হবে নাঅন্য কারো আশায় নিজেকে গুটিয়ে রেখে দিন পার করবে না সেএই দারুণ সুন্দর পৃথিবীতে হয়ত একবারই জন্মানোর সুযোগ পেয়েছেএই সুযোগ অবহেলা আর অপমানে নষ্ট করবে না সে

 জানালা দিয়ে বৃষ্টি শেষে কাচা রোদ্দুর পড়ছেজলে ভেসে যাওয়া রাস্তাঘাট শুকিয়ে গেছে,কোথাও আর জলের এতটুকু চিহ্ন নেইতরু ধীরপায়ে জানালার কাছে আসলোএই জানালা থেকেই তরুর বিদ্রোহ শুরু হয়েছেএকবার নিজের ভেতরকার জানালা খুলে দিয়েছে সে,রোদ-ঝড়-তুফান যাই হয়ে যাক না কেন,তরু আর সেটা বন্ধ করবে নাবৃ্ষ্টি শেষের কাচা  রোদ্দুর ঝরে পড়ছে তরুর সবুজ গালেতরু হাত জানালার গরাদে হাত রেখে রোদ্দুর ছুঁতে চাইছেআপনমনে আবৃত্তি করছে,

আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো-একই নক্ষত্রের নীচে তবু-একই আলো পৃথিবীর পাড়ে।“

ঠিক তখনই জানালা দিয়ে মাহমুদকে আসতে দেখলো তাদের বাড়ির দিকে

       (সমাপ্ত)

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply