স্বীকারোক্তি – শম্পা  সাহা

স্বীকারোক্তি – শম্পা সাহা

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 10, 2020
  • Reading time:1 mins read

সত্যি কথা বলতে কি নিশাকে আমি ভালোবাসি না বাজেবাসি সেটা ঠিক বলতে পারবো না । মানে আসলে ওর প্রতি আমার ফিলিংটা যে কি তা আমি নিজেই বুঝিনা তো আপনাদের কি বলবো !তবে এই নির্লিপ্ত ভাবটা ওর প্রতি আমার যে বরাবরের তা কিন্তু নয় । বরং যদি কাছে পেতে চাওয়া ভালোবাসা হয় ,দেখা করার জন্য সবকিছু কে উপেক্ষা করা ভালবাসা হয়, কারো সঙ্গ পাওয়ার জন্য সব কিছু দাঁও হিসাবে লাগানো কে ভালোবাসা বলে তাহলে আমি ওকে ভালবাসতাম খুব খুব ভালবাসতাম।
   সেও প্রায় আজ থেকে বছর কুড়ি আগের কথা । আমি সবে আই টি তে ডিপ্লোমার জন্য সরকারি একটা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছি । ওখানেই নিশাকে দেখি। বয়সে ও আমার চেয়ে বছর খানেকের বড়ই হবে। তখন কি সব জানতাম ? আর তাছাড়া “প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কখন ধরা পড়ে কে জানে”!
  ওকে দেখে, ওর চুল, ওর চোখ ,ঠোঁট  মায় শ্যামলা গায়ের রং পর্যন্ত আমাকে যেন ভালোলাগায় ভরিয়ে দিতো । প্রথম দিন থেকেই আমাকে ও ভীষণ ভীষণ টানতো! সেই সিনেমায় যেমন হয়, এই সেই, এই যে সে, যাকে আমি খুঁজছি, এই আমার সেই যার জন্য আমি অপেক্ষা করছি, এই ফিলিংটা আসতো । তবে ক্লাসের বাকি মেয়েদের সঙ্গে আমার ভালই বন্ধুত্ব তারা আমাকে বেশ পাত্তা টাত্তা ও দিত।
  আমি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে, হাতে প্রচুর পয়সা তাই ফুচকা, চপ, এগরোল, চাউমিন এগুলো সব আমার সঙ্গে মেয়েদের বন্ধুত্ব বাড়িয়ে দিলো। কিন্তু নিশান্তিকা অদ্ভুত !একদম পাত্তা দিত না আমাকে। কিছু খাওয়াতে চাইলে খেতো না বলতো, “আমি কারো  খাই না, কাউকে খাওয়াইও না “!
  ওর এক বয় ফ্রেন্ড ছিল ,সে মাঝেসাঝে আসতো। নিশান্তিকা যেন ওর বয়ফ্রেন্ডের প্রতি একেবারে উৎসর্গীকৃত প্রাণ। কেন, আমার সঙ্গে একটু কথা বললে কি ওর প্রেম ক্ষয়ে যাবে? কিন্তু বলতো না !
  একদিন ভুল করে ওর হাতে একটু হাত দিয়ে ডেকেছিলাম । ও সবার সামনেই আমাকে বলল, “এই একদম গায়ে হাত দিবি না”,
  আমি বেশ অপমানিত কিন্তু মুখে কিছু বলিনি । ধীরে ধীরে ওর প্রতি এক পাগলামি পেয়ে বসলো । ও যত আমাকে ইগনোর করত, ততই যেন আমার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠতে লাগলো।
  আমারও এরই মধ্যে চট করে একটা মেয়েকে ভালো লেগে গেল ।ভালো তো লাগতো সবাইকেই। কিন্তু ওকে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রপোজ করে ফেললাম । সোমা, সঙ্গে সঙ্গে রাজি। ব্যাস! আমাদের প্রেম শুরু।
  নিশান্তিকা কিন্তু খুব ভালো বন্ধু। দেখতাম ও দাঁড়িয়ে থাকতো ওর প্রেমিকের জন্য । আমি আর সোমা ক্যান্টিনে গল্প করছি, নিশান্তিকা গেটে হা করে দাঁড়িয়ে সেই হিরোর জন্য। যেই হিরো আসতো,কোনো দিকে না তাকিয়ে হাওয়া!
  হ্যাঁ ঠিকই ভাবছেন, আমি সোমার সঙ্গে থাকলেও, একটা চোখ কিন্তু থাকতো নিশান্তিকার দিকে। মাঝে মাঝে ওকে দাঁড়াতে দেখে আমি বলতাম, “কিরে দাঁড়াবো তোর জন্য? “,
 ও যেন হাতে চাঁদ পেতো।  আসলে একা  একা একটা মেয়ের দাঁড়ানোটা অস্বস্তিকর। ও কোনো কোনো দিন ওর বয়-ফ্রেন্ড আসতে দেরি করলে, আমি সোমাকে বাসস্ট্যান্ডে তুলতে গেলে, সঙ্গে থাকত। একেবারে যথার্থ বান্ধবী যাকে বলে। সোমার আমার কমন ফ্রেন্ড।
   মাঝে নিশান্তিকা ক্লাসে আসা বন্ধ করলো। আমি পৌঁছে গেলাম ওর বাড়ি। বন্ধু হিসেবে তো যেতেই পারি! ও ভীষণ অপ্রস্তুত । না আসার কারণ  জানলাম, ওর বাড়িতে ওর প্রেম নিয়ে বেশ আপত্তি। ছেলেটিকে বাড়ির লোকেরা মেনে নেবেন না।
  আমার ভালো লাগলো, খুব খুব ভালো লাগলো । ধীরে ধীরে ওদের বাড়ির ছেলে না থাকার সুবাদে ,আমার হেল্প ফুল হবার মানসিকতায় ওনারা শুধু আমাকে আপন করে নিলেন তাই নয়, আমাকে ভরসা করতে শুরু করলেন, দায়িত্ব দিতে শুরু করলেন। ওর বাড়ির লোক আমাকে বিশ্বাস করে নিশান্তিকাকে ক্লাসে আসার পার্মিশন দিলেন। আমি অবশ্য বন্ধুর দায়িত্ব পালন করতাম ওর বয় ফ্রেন্ড আর ওর  যোগাযোগের কথা ওর বাড়িতে না জানিয়ে।
   হঠাৎই একদিন নিশান্তিকার বাবা দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ফেললেন। আমি নিয়মিত যাতায়াত এর সুবাদে জেনে সাহায্য করলাম। কেন জানিনা, তবে কাকুর মানে নিশান্তিকা বাবার অপারেশন থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে আমি নিশান্তিকার পাশে।
  বুঝতে পারলাম নিশান্তিকা আমাকে ভরসা করতে শুরু করেছে, বিশ্বাস করছে। আমার ভেতরের একটা পাগল যেন ক্ষেপে উঠল।
  সোমার সঙ্গে আমার যোগাযোগ কমতে লাগল, আর নিশান্তিকার সঙ্গে  বাড়তে। তবে ও কিন্তু এখনো ওর প্রেমিককেই ভালবাসে । এক কথা শুনতে শুনতে আমার কানের পোকা নড়ে গেলেও আমি তা বুঝতে দিতাম না।
  ওর সঙ্গটাই আমাকে স্বর্গীয় অনুভূতি দিতো । ওর তাকানো, হাসি ,অসহায়তা আমার শিরায় ধমনীতে ঝড় তুলতো। মাথার ভেতর দপদপ করতো!
  এক এক দিন ওর বয়ফ্রেন্ড আমাকে দেখে বিরক্ত হতো। আমি বেশ বুঝতাম, কিন্তু যেন কিছু হয়নি এমন ভাব করে ওদের সঙ্গে থাকতাম। নিশান্তিকা কিছু বলতো না। বলবে কি? ও যে আমার প্রতি কৃতজ্ঞ । ওর বাবা-মায়ের যে আমাকে দরকার প্রতি পদে পদে ।
   এর মধ্যে হঠাৎ একটা ফোন। ওর বয়ফ্রেন্ড জানালো সে আর এই সম্পর্ক চালাতে রাজি নয়। আহা! কি সুখ, কি সুখ!
  নিশান্তিকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । আমিও বেশ দুঃখী দুঃখী ভাব ফুটিয়ে তুলছি মুখে। কিন্তু আমার সেদিন নাচতে ইচ্ছে করছিল। বিশ্বাস করুন !কেন জানিনা !
  ও ভীষণ জেদি মেয়ে, খুব কষ্ট পেয়েছিল কিন্তু নিজে থেকে আর যোগাযোগ করেনি,ওর সে প্রেমিকের সঙ্গে। বড় অভিমান!
  আসলে আমি খুব ভালো জানতাম ওর সম্পর্কটা ঠিক প্রেম নয়, পুজো! এরা হলো সেই টাইপের মেয়ে, যাদের কাছে প্রেম মানে, বিয়ে করতে হবে। কিন্তু এই মন খারাপের দিনগুলোতে আমি ওর পাশে একেবারে আদর্শ বন্ধু!
   ও যখন ওর প্রেমিকের কথা বলতে বলতে এক দিকে তাকিয়ে থাকত, আর টপটপ করে ফোঁটা ফোঁটা জল গাল বেয়ে ভিজিয়ে দিতে ওর বুক ,খুব ইচ্ছে করতো  সেই নোনতা স্বাদ নিতে! কিন্তু নিজেকে সংযত করতে হতো ,যতই হোক বান্ধবী বলে কথা!
  আমার ওকে পেতে ইচ্ছে করতো ।জানি আপনারা ভাববেন আমি অসভ্য !কিন্তু ইচ্ছে করতো, তো করতো! যা সত্যি তাই বলছি! একদিন সুযোগ বুঝে ওকে আকারে-ইঙ্গিতে বোঝালাম ,আমি ওকে ভালোবাসি ।
  না, মুখে কিছু বলিনি, কিন্তু বুঝিয়েছি !মানে এই আর কি?  ওদের বাড়ি যেতাম, ওর বাড়ির সব ব্যাপারে আমার সুচিন্তিত মতামত জানাতাম, কাকু পা ভেঙে বিছানায়, তাই কাকুর কিছু কিছু কাজও করে দিতাম।
   ও আরো নুয়ে পড়তো কৃতজ্ঞতায় !আরো আরো করে ওকে কৃতজ্ঞতা নুইয়ে ফেলতে, আমার যাবতীয় সময় লাগিয়ে দিলাম ওদের সবার উপকারে ।
  আজকাল প্রায় দিনই ওর মা আমাকে গেলে না খাইয়া ছাড়তেন  না। আমি ওদের পাড়াতেই দুটো টিউশনি নিলাম। নিশান্তিকাও ওর প্রেম ভুলতে ছাত্র পড়ানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
  একদিন ওকে মজার ছলে জিজ্ঞাসা করলাম,”আমাকে বিয়ে করবি? “
  ও হতবাক! কিন্তু না, হ্যাঁ  কিছু বলেনি। তবে আশায় ছিলাম, ওর ভেতরে ওর প্রেমিকের ওপর যে রাগ, তাতে আমার হিল্লে হয়ে যেতে পারে !
 আর আমার বাবা মা? ধুর !তখন আমার মাথায়, মনে শুধু নিশান্তিকা । পৃথিবী মুছে গেছে! চোখ বুজলে ওকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই না যে!
শম্পা সাহা
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply