স্বীকারোক্তি  – শম্পা সাহা

স্বীকারোক্তি – শম্পা সাহা

পর্ব  – ২

একদিন চকাস করে চুমু খেলাম ।না,না, খারাপ ভাববেন না। গালে! দেখলাম ওর মুখটা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেল, ও  একবার আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে এক হাতে অন্য হাত চেপে ধরল । নিজের ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে কান্না চাপছে, বেশ ভালো বুঝলাম, কিন্তু আমি সাহস পেলাম । আমার এতদিনের পরিশ্রমের পুরস্কার!
  আমি জানতাম ওর গাধা প্রেমিকটা নিশান্তিকার সঙ্গে কিছুই করেনি । কারণ তাহলে ও পায়ে ধরে হলেও ওর প্রেমিকের সঙ্গে থাকত। টিপিকাল বাঙালি মধ্যবিত্ত মেয়ে! ওর সতীলক্ষীপনা, বিবেক, এসব কি ধরনের তার গতি প্রকৃতি এত দিনে আমি বেশ ভালো বুঝে ফেলেছি।
  ওমা! হঠাৎ একদিন দেখি ওই সেন্টারের গেটে ওর প্রেমিক। আমার গা জ্বলে গেল ! আমার ভাবনা মতোই কাজ হল । আমি জানতাম নিশান্তিকা এই মুহূর্তে নিজেকে এঁটো ভাবছে, অপবিত্র ভাবছে !
   ও কোনদিন আমার ঠোঁটের ছোঁয়া নিয়ে ওর প্রেমিকের কাছে ফিরবে না! ও আরষ্ঠ ,আমি ওদের  একা ছাড়লাম না, বরং বেশ বুদ্ধি করে সবাই জনা দশ বারো দলবেঁধে ওদের সঙ্গে আড্ডা দিতে লাগলাম।
  মেয়েটা না আমার কাছে এলো না ওর প্রেমিকের পাশে, চুপ করে বসে রইলো এক কোণে।আমি একটা ব্লেড বার করে ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে আমার হাত কেটে ওর নাম লিখলাম । ভাবখানা এমন যে কেউ দেখছে না যেন। কিন্তু আমি বেশ জানতাম অত ভিড়ের মধ্যেও নিশান্তিকার  ঠিক চোখে পড়বে এবং ওর প্রেমিকের ও। ওর কৃতজ্ঞতা ভরা চোখ দুটো মাটি কামড়ে । ওর প্রেমিক বুঝে গেল ওর জায়গা আর ততটা শক্ত নেই ,আগের মত! চলে গেল, আর আসেনি তারপর।
   একদিন বৃষ্টির দুপুর, আমি অবশ্য জানতাম না বৃষ্টি নামবে। আমার জন্মদিন ,তাই ওদের বাড়ি গেলাম। কাকু ভাঙ্গা পা নিয়ে শুয়ে, কাকিমা বেশ ঘুম জড়ানো। নিশান্তিকা আর আমি প্রজেক্টের কাজে ব্যস্ত ।
  হঠাৎই আমার ভেতরে এক দুর্ধর্ষ ডাকাত জেগে উঠল। ওকে বললাম,
  “আজ আমার জন্মদিন ,আজ একটা জিনিস চাইবো, দিবি? “
  ও চোখ নিচু করে রইল । ওকে আমি গ্রাস করলাম, দখল নিলাম । ওর কোন উদ্দীপনা নেই, তবে এরপর থেকে আমার একটা দারুন কাজ হল । আমি না ওই আমার পেছনে ঘুরতে লাগল। জানতাম এটাই হবে! তবে প্ল্যানমাফিক যে করেছি এমন নয় ।
  আসলে ওর গন্ধটা আমাকে মাতাল করে !ওকে দেখলেই আমার রক্তে এক অদ্ভুত নাচন শুরু হতো! আমার শিরা উপশিরায় ঝড় উঠতো ,আমি কি করবো!
  এরপর থেকে নিশান্তিকা শুরু করলো,
  “বিয়ে করবি তো? বিয়ে করবি তো? “,
আমার একটুও ইচ্ছে নেই ,কিন্তু ওর কাছে আমার ইমেজ তো নষ্ট করতে পারি না। তাই  ঝামেলা করে তুললাম ওকে আমার বাড়িতে  বউ করে ।
  কি অদ্ভুত ! বৌভাত মানে ফুলশয্যা, কিন্তু আমি আর ভেতরের সেই বাজনাটা যেন আমার রক্তে শুনতে পাচ্ছি না। যে মুহূর্তে ও আমার বাড়িতে পা দিয়েছে, আর কোথাও যেতে পারবে না, পালাতে পারবে না, আমি আর ওর প্রতি কোন আগ্রহ পাচ্ছি না! না শরীরে, না মনে! পাচ্ছি না, তো পাচ্ছি না, কি করব ? স্বীকারোক্তি করতে এসে তো মিথ্যে বলা সাজে না!
  এরপর কিছুদিন ওই শরীরী নেশায় মিলিত হলাম। কিন্তু ওকে দেখলেই বিরক্ত লাগতো, দেখুন আমাকে খারাপ ভাববেন না যেন! যখন ভালো লেগেছে, বলেছি । এখন খারাপ লাগছে, বলতে আপত্তি কোথায়?
  সারাদিন আড্ডা দিতাম ক্লাবে, যেমন বিয়ের আগে দিতাম । কিন্তু ও বলতো, “কাজ করো”,
বলতো, “নিজের পায়ে দাঁড়াও”,
ও বলতো, “ভালোবাসো”,
  নিশান্তিকা  কে এরকম আমার একটুও ভালো লাগছে না । ও যখন আমাকে রোজগারের জন্য বলতো মাথায় খুন চেপে যেত। “শা… ঝামেলা! “,
দিলাম বসিয়ে দু ঘা আচ্ছা করে।
   ও ও আমাকে বসাতে চাইল, জেদি তো! কিন্তু সকালে মা দিল আচ্ছা করে কড়কে। হুঁ হুঁ বাবা একমাত্র ছেলে বলে কথা!
  দেখলাম নিজে নিজেই টিউশনি খুঁজছে !একটা পার্টটাইম কাজও জুটিয়ে ফেললো! মজার ব্যাপার ও এই কাজটা পেতেই আমার বাড়ির থেকে হাতখরচ গেল বন্ধ হয়ে।
  নিশান্তিকা অবশ্য আমার খাওয়া খরচ বাদে বাকি সবটাই দিতো । ওর বাবার থেকে কিছু টাকা এনে একটা দোকানও করে দিল। কিছু টাকা অবশ্য আমার বাবাও দিল কিন্তু, কি  করব? আমার ওসব ভালো লাগতো না। মানুষ নিজের জন্য কিছু করতে পারেনা, সব নাকি অন্যের জন্য করে । কিন্তু আমার ওর জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করত না!
  ও একটা ভালো চাকরি পেল, সরকারি । আমার হঠাৎ ওর প্রতি ভালোবাসা জাগলো। দেখুন অবচেতন মনে কি হচ্ছে তা তো আর বলতে পারব না, কিন্তু চেতন মনে জানতাম যে আমাদের একটা বাচ্চা চাই ।
  অনেকদিন বাদ আমাকে ভালবাসতে দেখে ও গলে গেলো। ব্যাস দশ মাস পর আমাদের একটা ফুটফুটে ছেলে হলো।
  যখন প্রেগন্যান্ট তখন এত ন্যাকামি ,আমার সহ্য হতো না ! সিনেমাতেও দেখি বর বউয়ের জন্য কত কিছু করে! ফলটলও আনে, ডিম টিম।  আমার এসব মনেই হত না, আনিও নি কোনোদিন। ওই বরং ফলটল আনলে আমাকে দিত, তবে মা খুব সতর্ক, তক্কে তক্কে থাকতো! বেচাল হলেই দিত আচ্ছা করে!
  ছেলে হবার পর ও যেন আরও ক্ষেপে গেল,”রোজগার করো, রোজগার করো “,আমার ওকে দেখলেই মাথা গরম হত ।
  বাচ্চাটার জন্য প্রথম প্রথম মানে ওই মাস চার পাঁচ মায়া তারপর  বিরক্তিকর লাগতো। শা..  সারা রাত প্যা প্যা কান্না। ও চাকরিতে গেলে আমাকেই ওটাকে দেখতে হতো । ঝামেলা!
  এভাবে ধীরে ধীরে নিশান্তিকার সঙ্গে আমার দূরত্ব বাড়ল । মিথ্যে বলব না একটা মেয়েকে আমার বেশ লাগত, মানে একটু ইয়ে মতন। মেয়েটা  আবার চাকরিও করে। কিন্তু নিশান্তিকা তা নিয়ে ঝামেলা করলো খুব।
   চাকরি করা বউ চলে গেলে, খুব একটা সুবিধা হবে না। কিন্তু নিশান্তিকা গিয়ে তিন চার দিনের জন্য ওর এক বান্ধবীর বাড়িতে উঠলো। বাবা মায়ের বাড়ি যাবে না জানতাম কারন বাড়িতে ও এ সব কিছুই বলেনি ।
  ভালোই বুঝতাম বুড়ো বাবা-মা কষ্ট পাবে তাই ও কিছুই বলবে না বাড়িতে। ছেলে তখন সেভেন । আমার সমস্যা, পকেটে টান! তার ওপর বাবা মারা গেছে, মা সব টাকা-পয়সা নিজের কাছে রেখেছে, যদিও জানি মরলে সবই আমার, কিন্তু এখন, এখন চলবে কি করে?
  তাই বাধ্য হয়ে আনতে গেলাম ওখানে ।লোকের বাড়িতে সবার সামনে এমন ন্যাকামো শুরু করলো, ছেলের কিছু খরচ দিতে হবেই আর আমার হাতখরচ আমাকেই জোগাড় করতে হবে । ও শুধু খাওয়া পরা দেবে । আমি সবেতেই হ্যাঁ বলে বাড়ি নিয়ে এলাম। জানতাম আমার কি করনীয়!
শম্পা সাহা
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply