টপার – শম্পা সাহা

টপার – শম্পা সাহা

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 14, 2020
  • Reading time:1 mins read

 

” চোখের সামনে একটা মানুষকে তিল তিল করে ডুবে যেতে দেখেও আমাদের কিছু করার নেই”
মনে মনে একটু নিজের প্রতি যেন বিরক্ত মধুজা । 
 
 ত্রিপর্ণ ছেলে হিসেবে খুব ভালো,মানুষ হিসেবেও। বন্ধু-বান্ধবদের চোখের মণি, বুকের পাঁজর ত্রিপর্ণ । ওরা ‘ত্রি’ বলতে অজ্ঞান। 
 
 অরূপ, মৌসুমী, দেবল, ত্রিপর্ণ,মধুজা ওদের স্কুলে সবাই পঞ্চপান্ডব বলে ডাকতো। হরিতকী তলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওরা যেন চোখের মণি, মাথার মুকুট। হীরে এক একটা। যেমন ঔজ্জ্বল্য,তেমনি দ্যুতি!স্কুলের দিদিমণি মাস্টারমশাইরা পর্যন্ত ওদের নাম করতে অজ্ঞান । ওরা পাঁচজন যেমন দুষ্টু,যেমন প্রাণচঞ্চল, তেমনি পড়াশোনায় যাকে বলে রত্ন। 
 
   এমনিতে ওদের স্কুলের রেজাল্ট মোটামুটি, আহামরি কিছু নয়। কিন্তু ওরা পাঁচজন একসাথে ফাইভ এসে ভর্তি হবার পর টের পাওয়া গেল ফাইভের অ্যানুয়াল এর রেজাল্টে।
 
  পাঁচজন এরই প্রায় কাঁধ ছুঁইছুঁই নম্বর । এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়।  জোড়া থার্ড, জোড়া সেকেন্ড আর ত্রিপর্ণ ফার্স্ট। ওদের মধ্যে সবথেকে ভালো ওই । 
প্রথম থেকেই, যদিও ওদের নম্বরের ফারাক প্রতিবারই ওই এক দুই নম্বরের। তবু বাকিরা কোনদিনই ওকে টপকাতে পারে নি। ওরা সবাই ত্রিপর্ণ কে বলতো, “ভগবানকে ঘুষ দিয়ে হাত করে রেখেছিস, বল? “
 
 ওরা যত ভালো নম্বই পাক, টোটালে ত্রিপর্ণ এক নম্বর হলেও বেশি পাবেই।এভাবেই ধীরে ধীরে মাধ্যমিক,উচ্চমাধ্যমিকেও  দুর্দান্ত রেজাল্ট কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেল উচ্চমাধ্যমিকের পর। 
 
  ওদের বন্ধুদের মধ্যে অরূপ, মৌসুমী আর দেবল প্রথম চান্সেই জয়েন্ট ক্রাক করলো। অরূপ ইঞ্জিনিয়ারিং, মৌসুমী আর দেবল মেডিকেল । ওরা সবাই একসাথে পাথফাইন্ডার এ ট্রেনিং নিতে যেত। 
 
 ওদের হরিতকী তলা থেকে বহরমপুর পর্যন্ত পাথফাইন্ডার প্রায় তিন ঘন্টা রাস্তা । ওরা হইহই করে প্রতি রবিবার একসাথে যেত, আসতো । হুস করে অতটা সময় যে কোথা থেকে চলে যেত, টের পেত না । পড়াশোনাতেও টক্কর কিন্তু সেটা কোনদিনই রেষারেষিতে পরিণত হয়নি, পুরোটাই প্রতিযোগিতা, সুস্থ প্রতিযোগিতা। 
 
 এমনকি ওদের মা বাবাদের মধ্যেও সম্পর্ক খুব ভালো। ছেলে মেয়ের সূত্র ধরে ওনারাও যেন কবে একে অপরের বন্ধু হয়ে গিয়েছেন । একসাথে পিকনিক, ট্যুর, ফিস্ট সব, যেন এক বড় পরিবার।
 
 যদিও কারো বাবা ব্যবসা, কারো চাকরি , কারো মা হাউসওয়াইফ ,কারো আবার চাকুরিরতা কিন্তু ওরা পাঁচজন আর ওদের পাঁচ পরিবার যেন সমান । প্রতিটা পরিবারের মূল লক্ষ্য ছেলে-মেয়ের প্রতিষ্ঠা। 
 
   ওরা কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় কিন্তু কম্বাইন্ড ক্লাস করতো সবাই । একে অপরকে সাহায্য করবে বলে কম্বাইন্ড পড়া তাছাড়া যদি একটা না হয় তো অন্যটা তো আছেই । 
 
  জয়েন্ট এর রেজাল্ট বের হবে । ওরা হইহই করে রেজাল্ট দেখল এক সাথেই বসে । ওরা তিনজন পেলেও তৃপর্ণ আর মধুজা ভালো র ্যাঙ্ক করতে পারে নি । বেশ বোঝা যাচ্ছিল ওরা কোনভাবেই বেসরকারিতেও চান্স পাবে না।
 
  দেবল,মৌসুমী অরূপ ভর্তি হয়ে গেল ,ত্রিপর্ণ আর মধুজা পড়ে রইল । ওদের কারোরই মোটেই বিশ্বাস হচ্ছিল না ত্রিপর্ণ পাশ করতে পারেনি। মধুজারটা যদিও বা মেনে নেওয়া যায় কিন্তু ত্রিপর্ণ!  ও যে ওদের টপার! 
 
  একেবারে ভেঙে পড়ে ত্রিপর্ণ, ওর সঙ্গে সঙ্গে ওর বাড়ির লোকেরাও । তার ওপরে আছে পাড়ার লোক, আত্মীয়স্বজন সবার সহানুভূতি জানানো। সহানুভূতিই, কিন্তু প্রতিটা সহানুভূতির কথাই যেন ত্রিপর্ণর কানে গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছিল । ও যে  টপার ,ও ফেল করবে, এও কি হয়? ও যে টপার ! এই কথা শুনতে শুনতে আত্মীয়-স্বজনদের কৌতূহল মেটাতে মেটাতে ওরা সবাই ক্লান্ত।
 
  ধীরে ধীরে ত্রিপর্ণ লোকজনের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল । মধুজা নিজেই এরপর আকাশে ভর্তি হল ট্রেনিংয়ের জন্য আর একটা ডিস্টেন্স এ গ্রাজুয়েশন এর জন্য । কিন্তু ত্রিপর্ণ ওসব কিছু না করে শুধুই দরজা বন্ধ করে পড়তে লাগলো । ওকে প্রমাণ করতেই হবে , অরূপ মৌসুমীর তুলনায় ও মোটেই খারাপ ছাত্র নয় বরং ওদের থেকে অনেক ভাল ছাত্র ও। ও যে টপার! 
 
   বন্ধুরা বাড়ি আসলেও ত্রিপর্ণ কথা বলতো না ভালো করে ,শুধু পড়া আর পড়া !এমনকি ক্লাসে যাওয়াও বন্ধ করে দিল । ওর নাকি সব জানা হয়ে গেছে । ট্রেনারদের থেকে ওর আর জানার কিছু নেই। ও সব বুঝে গেছে এখন শুধু পড়লেই হবে । আসলে ও মানুষজন এড়াতে চায় । বন্ধুরা ফোন করলে ধরে না ,
 
“নিজেরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে তো তাই আমাকে ঠাট্টা করার জন্য ফোন করে! “
 
  মধুজা ভাবে, এ কি সেই ত্রিপর্ণ ?যে বন্ধুদের জন্য জীবন দিতে পারতো!ও কবে এত ছোট মনের আর হিংসুটে হয়ে গেল !
 
“এই যা তা বলিস না”,মধুজা প্রতিবাদ করে। 
“তুই ওদের হয়ে আর ফোকর দালালি করতে আসিস না তো “,
 
  মধুজার কথায় দাঁত খিচুনি দেয় ত্রিপর্ণ । আজকাল অবুঝের মতো আচরণ করে । কোথায় সেই হাসি খুশি, সরল ভালো মানুষ, মুখচোরা ছেলেটা !খোঁচা খোঁচা দাড়ি, রাতজাগা কালি চোখের তলায়, শীর্ণ চেহারা, বুকের খাঁচা দেখা যায়! ছোটবেলার বন্ধুর জন্য  মধুজার কষ্ট হতো ভীষণ ।
 
 ও বাকিদের সঙ্গে আলোচনা করত,”যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না ,একটুতো লোকজনের সাথে মেলামেশা করার দরকার ,বোঝার দরকার। কারো সাথে না মিশলে ও যে আস্তে আস্তে ডিপ্রেশনে চলে যাবে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে পড়লেই কি জয়েন্ট পাশ করা যায় ?কই ওরা তো ওইভাবে পড়েনি তাহলে ওরা কি করে পেলো ?”
 
  কিন্তু একথা ত্রিপর্ণকে বোঝানো যাবে না । 
“ওরা তো জিনিয়াস, ওরা ট্যালেন্টেড, আমি অগা, হল? আসিস কেন আমাদের বাড়ি আর আসবি না। তুই যা এখান থেকে, ভালো ছেলেদের সঙ্গেই মেশ। আমি তো খারাপ !”
“আরে ধুর, ওরা যা পারে তা তুইও পারিস। কে বলেছে তোকে এসব কথা? “
 মধুজা শান্ত করতে চায় অবুঝ একটা উনিশ বছরের যৌবনপ্রাপ্ত বন্ধুকে। যাকে ও দেখছে সে গত প্রায় দশ বছর ধরে। হয়তো একটু অন্যরকম মায়াও পড়েছে। সে ও  টপার বলে কি? কিন্তু ও তো জয়েন্ট পায়নি তবুও তো মধুজার ওর প্রতি বন্ধুত্ব একটুও কমেনি! মধুজা নিজেই দ্বিধাগ্রস্থ! 
 
  জয়েন্ট শেষ তবু ত্রিপর্ণ পড়ে যায় । ওর বাবা বলেন, “এই বাবু,  পরীক্ষা তো  শেষ ,কি পড়িস এখন? “,
ওর মা বলেন, “বাবা পরীক্ষা তো হয়ে গেছে, যা, একটু বাইরে বেরিয়ে আয়”,
 
  ত্রিপর্ণ পড়ার ঘরে আলো জ্বালিয়ে বসে থাকে । আজকাল জানালাও খোলে না ,চুপচাপ । ঘরে ঢুকতে দেয় না কাউকে এমনকি পরিষ্কার করতে ও দেয়না ঘর। বলে, “দরকার নেই”। 
 
  এবার কিন্তু ওর বাবা-মার চিন্তা হয়, ভাবে একবার কারো সঙ্গে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে । কিন্তু কাকেই বা বলবেন,কিই বা বলবেন?
 
 ত্রিপর্ণর মা বলেন, “আমার  ছেলে কি পাগল নাকি যে ডাক্তার দেখাতে হবে? বরাবরই ও পড়াশোনা ভালোবাসে”, এককথায় সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানোর প্রস্তাব নাকচ করে দেন  সুজাতা দেবী । অনিমেষ বাবু অসহায়, তিনি কি আর সাধে ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে চান ?চারদিকে সব দেখে শুনে  বড় ভয় করে আজকাল।
 
  দেখতে দেখতে রেজাল্ট বের হল। মধুজা ভালো র ্যাঙ্ক করেছে, ইঞ্জিনিয়ারিং-এ, 512  কিন্তু ওর নিজের সাফল্যে ততটা আনন্দ হচ্ছে না। ভয়ে ও ফোন করল না খবরটা নিয়ে নিজেই গেলো  ত্রিপর্ণদের বাড়ি। 
 
   ত্রিপর্ণ সকাল থেকে দরজা বন্ধ করে রয়েছে। কাকীমাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেলো ও এবছরও পাশ করতে পারেনি । কিন্তু এ কথাটা ওকে কে বলবে? 
 
 অনেক ডাকাডাকি হয়েছে, ভেতর থেকে কথা শোনাও যাচ্ছে কিন্তু দরজা খুলছে না। মধুজা  দুচারবার ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ত্রিপর্ণ । 
 
  একি? এ কে?  আঁতকে ওঠা মধুজা। খালি পা, চোখ লাল,চুল উস্কখুস্ক । দেখে বোঝাই যাচ্ছে সারারাত ঘুমোয়নি। দরজাটা খুলতেই একটা বিশ্রী গন্ধ এসে লাগে নাকে। 
 
  “কিরে আমি পেয়েছি তো  মেডিকেল ?”
মধুজা কি উত্তর দেবে ভেবে পায়না। কিন্তু অবাক কান্ড ত্রিপর্ণ উত্তর শোনার অপেক্ষা করে না। আবার ঘরে ঢুকে যায়,  গিয়ে খাটের উপর বসে চেঁচায়, “মা, মা, আমার লাগেজ গুছিয়ে দাও । আমাকে হোস্টেলে যেতে হবে। আর আগে কাউন্সেলিং ও আছে।  তোমাকে ছেড়ে থাকতে হবে, এটাই যা। আমি জানতাম আমি টপার, আমি তো টপার, আমি ভালো রেজাল্ট করবই “
 
   মধুজা একবার ডাকে, “ত্রি”,ওর গলা শুনে মুখ তুলে তাকায় ত্রিপর্ণ তারপর আবার বলতে থাকে, 
“আমি জানতাম, আমি টপার আমি ভালো রেজাল্ট করব। কেউ বিশ্বাস করেনি, কেউ না, কিন্তু আমি জানতাম, জানতাম । “
 
  ওর চোখের উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে মধুজা বুঝে ফেলে ত্রিপর্ণ আর ত্রিপর্ণ নেই । ও ধীরে ধীরে ওর বাবার কাছে যায়, “কাকু ওকে একটু সাইক্রিয়াটিস্ট দেখান ,আগেই দেখাতে হত। যাক্ গে”, 
 বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে মধুজা।অনিমেষ বাবু ওর চলার পথে  শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। 
শম্পা সাহা
 
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply