প্রথম পুরষ্কার   – নয়ন মালিক

প্রথম পুরষ্কার – নয়ন মালিক

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 17, 2020
  • Reading time:1 mins read

 

অনন্ত কারুর কথাতেই কান দেয়না । অনেকের বাধা আর আপত্তি সত্ত্বেও নাম দিয়েছে নিজে সাজো প্রতিযোগিতায়। অবশ্য সেদিনে মনিষের কাছে অপমানিত হবার পরই তার এই কঠোর সিধান্ত। তাই কারুর বারণ শোনার পাত্র সে নয় । 
 
   মনিষের সেই কথাগুলো তৃঘ্ন্য বাণের মত এখনও তার কানে বিঁধছে । সেদিন বিকেলে হঠাৎ ঠাকুর পুকুরের ধারে মনিষের সঙ্গে দেখা হতেই , অনন্ত তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে জিঙ্গেস করেছিল—
 
 — কি রে মনিষ এবার নিজে সাজো প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিস ?
   মনিষ অনন্তকে একদম পছন্দ করেনা , না করার জোড়ালও কোন কারনও
 নেই । হয়তো প্রতিবন্ধী বলেই। তাই বেশ বিদ্রুপ মাখানো স্বরে বলে ওঠে—
— আমি নাম দেব না তো তোর মত খুঁড়ারা দেবে !
 
কথাটা শোনে অনন্ত ভীষণ আঘাত পায় , তার খোঁড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে গিলে গেল খোঁড়া পায়ের কষ্ট । জবাব দিল –
   — কেন খুঁড়ারা কি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না ?
মনিষের মুখে আবারও সেই তাচ্ছিলের হাসি নিমেশে খেলা করে গেল তার সারা মুখ জুড়ে । 
  — শক তো কম নয়—
  — এতে শকের কি হল ?
 
 মনিষ তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টি নিয়ে ছুঁয়ে গেল অনন্তের কম্পিত ডান হাতটা 
  — তোর ঐ নাচুনি হাত নিয়ে তুই নিবি নিজে সাজো প্রতিযোগিতায় অংশ , দর্শক তাহলে নেচে উঠবে । 
   অনন্ত আর একমিনিট ওখানে দাড়ায় নি , মনিষের প্রতি ঘৃণায় বিতৃষ্ণায় তার সারা শরীর কেঁপে ওঠেছিল। প্রতিবন্ধী হবার কষ্টে তার মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে । যাবার সময় শুনতে পেল মনিষের টিপ্পনী কাটুনি খুঁচা—
  — তোর ঐ নাচুনী হাতের দিব্বি-অংশ নিয়েই দেখা – যত রাবিশের দল ।
 
    বাড়ি গিয়ে অনন্ত কান্নায় ভেঙে পরে , সে আজ প্রতিবন্ধী বলেই লোকে তাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করে। যদি সে স্বাভাবিক হত তবে তার প্রিয় এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারতো ।
           সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত অনন্তের চোখে ঘুম আসেনি , এলোমেলো চিন্তা জট পাকিয়ে তোলপাড় করে তার মন । অনেক  ভেবে ঠিক করে এই প্রতিযোগিতায় সে অংশ নেবে , দেখিয়ে দেবে প্রতিবন্ধী বলে  অবঙ্গার পাত্র নয় । পরের দিন সকাল বেলায় প্রতিযোগী হিসাবে নামও নতিভুক্ত করে ফেলে।  
 
     আজ সন্ধে সাতটায় শুরু হবে অনুষ্ঠান । অনন্ত অনেক আগে পোঁছে গেছে অনুষ্ঠান স্থলে । সকাল থেকে মনের ভিতর একটা দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে অনন্তের । একটা ভয় একটা উদবেগ দাপিয়ে বেড়াছে তার সারা মন জুড়ে । সন্ধ্যে থেকে আরও বাড়তে সেটা । টেনশনে ডান হাতটা আরও জোরে জোরে কাঁপতে থাকে । ভয় পায় অনন্ত , যদি কম্পিত হাত নিয়ে ঠিক মত সাজতে না পারে ।
    সাতটার আগেই দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল স্টেজের চারপাশ । কিছু সময় পরই স্টেজ জুড়ে শুরু হয়ে গেল অনুষ্ঠান । সবশেষে আছে নিজে সাজো প্রতিযোগিতা । প্রতিযোগিতারা বসে আছে স্টেজের ডানদিকে গ্রিনরুমের কাছে । 
 
    এর মধ্যে মনিষ একবার অনন্তকে টোন কেটে বলে গেছে  
  — অবশেষে দর্শক হাসাবার ভারটা তুই নিলি ।
     অনন্ত কোন জবাব দেয়না । মনিষের কথায় দমে যায় আরও । টেনশনে হাতটা আরও জোরে জোরে কাঁপতে শুরু করে । অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেই ভালো হত । এই কম্পিত হাত নিয়ে সে কি পারবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাজতে ! মনে মনে  স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথকে । ছোট থেকেই রবীন্দ্রনাথের বড় ভক্ত সে , তার অনেক কবিতা গল্প তার ঠোঁটে মখস্ত । নিজে সাজো প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্রনাথ সাজাটা তার কাছে ছিল স্বপ্নের মত । শুধু প্রতিবন্ধী বলেই …
     হে ঠাকুর তুমি আমার মান রেখো । আর যাই হোক , একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড না ঘটে । অন্তত আমার দোষে কেউ যেন প্রতিবন্ধীদের নিয়ে মজা না ওড়ায় ।  
 
     অবশেষে শুরু হয়ে গেল নিজে সাজো প্রতিযোগিতা । একে একে প্রতিযোগিতারা গ্রিনরুম থেকে সেজে স্টেজে এসে প্রদর্শন করছে তাদের কলা । দর্শকেরা তাদের ট্যালেন্ট ভীষণ ভাবে উপভোগ করছে আর হাততালির বন্যা বইয়ে দিচ্ছে স্টেজ জুড়ে । আর মাত্র দুজনার পরেই অনন্তের পালা । অনন্ত প্রতিযোগিতাদের সাজ দেখে ভীষণ ভাবে দমে যায় । তার ভয়ের রেশটা আরও চেপে বসে মনে । মাত্র তিন মিনিট সময় , এর মধ্যে দেখাতে হবে তার ট্যালেন্ট । 
 
     অনন্ত বুঝতে পারে তার পক্ষে সময়টা খুব কম । এত অল্প সময়ে সাজবে কেমন করে । তার উপর আজ আবার যে ভাবে কাঁপছে , শেষে যদি –
     অনন্ত আর ভাবতে পারে না । মনটা স্থির করার চেষ্টা করে । মনে মনে রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবে । এখন তার সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া আর কেউ নেই , গোটা স্টেজ প্রাঙ্গণ যেন ফাঁকা , একটা মানুষের দেখা নেই । আজ যেন কোন অনুষ্ঠান নেই , শুধু সে আছে আর তার ঠাকুর ।  
     অনন্ত শুনতে পেল কোথায় যেন ঘোষণা হচ্ছে –
 
  — এবার উঠে আসবে আমাদের সব শেষ শিল্পী অনন্ত নাগ । তাকেও আমরা নির্ধারিত তিন মিনিট সময় দিলাম , তার মধ্যে সে অবশ্যই তার শিল্প কর্মের নিদর্শন আমাদের সামনে হাজির করবে ।
    অনন্ত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল গ্রিনরুমের দিকে । সামনেই মনিষের সঙ্গে দেখা । তার অবঙ্গা আর তাচ্ছিলের দৃষ্টি ভ্রূক্ষেপ না করে প্রবেশ করল গ্রিনরুমের ভিতর । অনন্ত আসতে আসতে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ল ড্রেসিং টেবিলের সামনে । আয়নার সামনে স্থির ভাবে চেয়ে রইল । সামনে সাজবার যাবতীয় সরঞ্জাম । অনন্ত মেকআপের জিনিস গুলো উঠাতে গেল, পারছে না , তার হাতটা অত্যধিক কাঁপছে । কোনমতেই কমতে চাইছেনা । 
      প্রমাদ গুনল সে । মনে মনে প্রাথনা করল রবি ঠাকুরকে । তার  চোখ ঝাপসা হয়ে আসে । সেই ঝাপসা চোখে আয়নার সামনা ফুটে উঠল একটা মূর্তি –
মাথা ভর্তি লম্বা লম্বা চুল, মুখ ভর্তি পাকা পাকা দাড়ি ।
 
      এ যে রবি ঠাকুর ! 
      অনন্ত আর তাল সামালতে পারল না , লুটিয়ে পড়ার আগেয় কার যেন মমতাময়ী হাত ধরে ফেলল তাকে । 
      অনন্তের যখন সম্বিৎ ফিরে এল দেখল সে স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে , আর হাতে ধরা নিজে সাজো প্রতিযোগিতার প্রথম পুরষ্কার । তার মাথায় কিছু ঢোকে  না । এক গাদা চিন্তা এলোমেলো হয়ে তারা করছে তাকে । অনুষ্ঠান শেষ হতেই অনন্ত ছুটতে ছুটতে চলে আসে বাড়ি ।স্থির হয়ে বসে পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তির কাছে , পাশে তার প্রথম পুরষ্কার । এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে তার দিকে ।
      রবীন্দ্রনাথের ছবিতে তখন মুচকি হাসি !
 
 
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply