শোগাৎসু ( জাপানী ভাষায় নতুন বছর) – শম্পা  সাহা
shampasaha

শোগাৎসু ( জাপানী ভাষায় নতুন বছর) – শম্পা সাহা

পর্ব-১

জাপানের প্রায় হৃদপিন্ডে আল্পসের কোলে মিষ্টি এক গ্রাম শিরাকাওয়া- গো, ছোট করে শিরাকাওয়া। এমনিতেই জাপান বহু বৈচিত্রের দেশ, এদেশে যেমন শহুরে বৈভব, হৈ-হুল্লোড় ,ধোঁয়া, দূষণ পাওয়া যাবে তেমনি, অন্য প্রান্তে আছে খোলা পরিষ্কার নীল আকাশ, ঝিলমিল ঝরনা, শান্ত নিরিবিলি জীবন । তেমনি এক গ্রাম  শিরাকাওয়া । যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ ধাঁধানো, যেন কোন সুদক্ষ চিত্রকরের হাতে আঁকা এক বাস্তব ছবি। ছবি যেখানে যেন ঈশ্বর সব কিছু নিজে হাতে বানিয়েছেন, কোথাও এতটুকু ভুলচুক নেই । 
 
  তাকায়ামা থেকে আজকাল বাসে এক ঘন্টায় এই গ্রামে পৌঁছানো যায় । পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন ট্র্যাডিশনাল গ্যাসো- জুকেরি  প্রথায় তৈরি ঘর গুলো দেখতে । এখন শিরাকাওয়া-গো জাপানের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।
 
     সময়টা 1943 ,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহ । ভয়ঙ্কর যুদ্ধে মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির আড়ালে জড়িয়ে পড়েছে প্রায় সমগ্র বিশ্ব । ভেনেজুয়েলার মত দেশগুলি সামনে নিরপেক্ষ ভূমিকা নিলেও ভেতরে ভেতরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে কোনো না কোনো পতাকার তলায় । জাপান পুরোপুরি  মিত্রশক্তির নিশানায়। গ্রামকে গ্রাম সমস্ত যুবকরা চলল যুদ্ধে, সার বেঁধে। তাদের স্ত্রীরা বিদায় দিল প্রিয়জনকে। শিরাকাওয়া জুড়ে শুধু নৈঃশব্দ । গ্রামের মাঠে ঘাটে আর শিশুদের হুল্লোড় নেই, বাড়িতে বাড়িতে শুধু বৃদ্ধ আর মহিলারা তাদের সন্তান আগলে।
 
   চেরি ব্লসম এর আনন্দ দেখার কেউ নেই ! শোগাৎসু পালনে আর ভিড় হয় না । টোরো উৎসবে সেবার সমুদ্রে জ্বললো না একটাও প্রদীপ, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ আলোক বিন্দুতে মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রদীপে করে তারা ভাসিয়ে দেন সমুদ্র দেবতার উদ্দেশ্যে। 
 
   এই  শিরাকাওয়ারই এক প্রান্তে বাস গোরো সাতোর পরিবারের। গোরোই পরিবারের প্রধান। তার এক ছেলে কিশি আর মেয়ে ইমা। স্ত্রী আইকো মারা গেছেন তাও বছর দুয়েক , আর ইমার বিয়ে সেতো স্ত্রীর মৃত্যুরও আগেই। ।
 
   বৃদ্ধ গোরো, কিশি আর তার স্ত্রী আকি এবং তাদের ফুটফুটে দুই ছেলেমেয়ে দাই আর আই কে নিয়ে বাস করেন একটা গ্যাসো-জুকেরিতে । এটি জাপানের এক ট্র্যাডিশনাল বাড়ি। কাঠের বাড়িগুলির বিশেষত্ব হচ্ছে এদের ছাদ  ঢালু হয় নিচের দিকে নেমে এসেছে, যাতে  প্রচুর বরফ পড়ে ছাদ না নিচে বসে যায় , বরফ যেন সহজেই মাটিতে পড়ে। 
 
   গোরোর পারিবারিক বেশ কয়েক বিঘা জমি আছে মূলত ধানই হত আর কিছু মূলো, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম তাছাড়া নিজেদের প্রয়োজনমতো সবজিও ফলাতো তারা বাপ বেটায় মিলে। সেই কোন ভোরে উঠে গরমা- গরম কফি আর উডোন(বিশেষ জাপানী পিঠে জাতীয় খাবার) খেয়ে রওনা দিতো মাঠে । তখনও জাপানে এত পড়াশোনার চল ছিলোনা। দাই আর আই খেলে বেড়াতো বাড়ির উঠোনে । বৃদ্ধ একটু বেলা হলে টুকটুক করে তাঁর লাঠি ঠকঠকিয়ে যেত ক্ষেতের দিকে । চড়াই তাড়িয়ে, বুলবুলি তাড়িয়ে, রক্ষা করত তাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ফসল আর চোখ ভরে দেখতো সা-জোয়ান কিশি কেমন পেশীবহুল শরীরে একা  হাতেই লাঙ্গল দিচ্ছে, বীজ বুনছে, জল দিচ্ছে, যত্নে লালন পালন করছে ফসলগুলোকে।
 
   এক ফাঁকে বৃদ্ধ মাছ ধরে নিয়ে আসতো সামনের নালা থেকে । বেশির ভাগই ছোট ছোট উনাই এর বাচ্চা, এছাড়া উনি, ফুগু, ইকা জাতীয় মাছও পাওয়া যেত মাঝে মাঝে। তাই দিয়ে আকি বানাতো সুস্বাদু মিশো সুপ আর রাইস বল । কোনো কোনো দিন মাছের একটা সাধারন কারী। বেশ শান্তির জীবন, ঝঞ্ঝাট নেই, ঝামেলা নেই । স্বামী-শ্বশুর মাঠ থেকে ফেরার আগেই আকি সাফসুতরো হয়ে, ঘরদোর পরিষ্কার করে ,পরিস্কার কিমোনো পরে তৈরি । ছেলে মেয়ে দুটোকে স্নান করে ,খাইয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়েছে।
 
  ব্যাস, নিজেদের খাওয়া-দাওয়া আর বিশ্রাম। বিকেলের দিকে কিশি যেত একটু লাচিমা  কাকার চায়ের দোকানে, ওখানেই তো রাজ্যের খবর। সন্ধ্যে হতে না হতেই খাওয়া-দাওয়া সেরে শান্তির নিদ্রায় পুরো গ্রাম। আকি ঘরে ঘরে গরম আগুন রেখে আসত পাত্রে করে, যাতে এই প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 
 
   কিন্তু হঠাৎই বাধল যুদ্ধের দামামা। সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলো প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন করে শক্ত সমর্থ জওয়ানকে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতেই হবে। গোরো সাতোর তো যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, প্রায় লোলচর্ম অশীতিপর বৃদ্ধ! তাই অগত্যা কিশিই নিজেকে ব্রতী করল দেশ সেবায়। 
 
ক্রমশঃ
শম্পা সাহা
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply