রান্নাঘর রহস্য – সুশ্বেতা ব্রহ্মচারী

রান্নাঘর রহস্য – সুশ্বেতা ব্রহ্মচারী

  • Post category:গল্প
  • Post comments:0 Comments
  • Post last modified:December 18, 2020
  • Reading time:1 mins read

 

ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ার থেকেই লিভ-ইন করত ঈশিতা আর শুভ্রনীল। ঈশিতা অবশ্য ওকে নীল বলেই ডাকত। বাড়িতে না জানিয়ে লুকিয়ে একসঙ্গে থাকায় প্রথম প্রথম যতখানি রোমাঞ্চ ছিল, আজকাল সেটা অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। ইদানিং খুব চেনা দুটো মানুষ একে অপরের কাছে ভীষণ অচেনা হয়ে পড়েছে যেন। ব্রেকফাস্টের মেনু থেকে রাতে শুতে যাওয়ার সময় এসির টেম্পারেচার, সব কিছুতেই মতের অমিল। সেদিন রাতেও তেমনই কিছু একটা নিয়ে তুমুল অশান্তি বেধেছিল।

 

নীল মনে মনে ভাবছিল, এভাবে চুলোচুলি আর নয়। এবার দু’জনের পথ আলাদা হওয়ার সময় এসেছে। পরের দিনের সকালে ওর জন্য কী অপেক্ষা করেছিল, তা কি ও স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল! মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। কার জীবনে কী কী মুহূর্ত অপেক্ষা করে আছে, আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ একটা কাজের কথা মনে পড়ল নীলের। জামা গলিয়ে চট করে বাইরে বেরিয়ে গেল নীল। তখনও ঘুমোচ্ছিল ঈশিতা।

 

ফিরতে বেজে গেল প্রায় দুপুরবেলা। দরজা ভিতর থেকে লক। প্রায় আট-দশবার বেল বাজিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিন সাধারণত দু-তিনটে বেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় ঈশিতা। আজ বাধ্য হয়েই ডুপ্লিকেট চাবি বের করল নীল। দরজা বন্ধ করে একটু এগোতেই যা দেখল, তাতে ওর বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেল যেন। কিছুক্ষণ থরথর করে কাঁপছিল। তারপর মনে হল, ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। রান্নাঘরের দরজা থেকে রক্তের স্রোত ডাইনিং পর্যন্ত নেমে এসেছে। ঠিক রান্নাঘরে ঢোকার সামনে পড়ে আছে ঈশিতার দেহ।

 

যেন দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পিছন থেকে দেখে মনে হচ্ছে উপুড় হয়ে বসে আছে। রাতে যে টপ আর শর্টস পরে শুতে গিয়েছিল, এখনও গায়ে সেটাই আছে। ফর্সা লম্বা পা দুটো যতখানি দেখা যাচ্ছে, তার কিছু জায়গায় এলোমেলো ভাবে রক্ত লেগে গেছে। পেটে অর্ধেক ঢুকে আছে একটা ধারালো ছুরি। অগোছালো হয়ে আছে চুলগুলো। নীলের মনে পড়ে গেল, ও রোজ বলত, -এরকম এলোকেশী হয়ে রান্নাঘরে কাজ করিস কেন?

 

খাবারে রোজ চুল পাই। সুন্দর স্ট্রেট করা চুল বেঁধে রাখা আবার ঈশিতার একদম পছন্দ ছিল না। এই সামান্য ব্যাপার নিয়েও কী ঝগড়া কম হয়েছে নাকি! নীল কী করবে তখন! একসঙ্গে অনেক কিছু মাথায় ঘুরছিল। ঈশিতার বাড়িতে জানত না, ওরা লিভ-ইন করছে। বাড়িতে ফোন করে কী বলবে ওরা! থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে সবার আগে ওর কলারটাই চেপে ধরবে। ওদের মধ্যে যে ঝামেলা চলছিল, সেটা কোনও ভাবে সামনে আসলে তো সব গেল। নিজে বাঁচতে খুন করে নিজেই পুলিশ ডেকে আনে খুনী।

 

মনোস্তত্ব বিজ্ঞানে এই ঘটনা বিশ্বাস করার সম্ভাবনাই বেশি। স্বাভাবিক ভাবেই নীলই পুলিশের প্রাইম সাসপেক্ট। ঘরে একটা লাশ আর অনেকগুলো প্রশ্ন। ঘরে একটা লাশ ও অনেকগুলো অজানা আশঙ্কা। রক্তে ভেসে যাওয়া লাশ, আর সেটা তার লিভ-ইন পার্টনারেরই। ভাবতে ভাবতে তিনঘণ্টা কেটে গেল কখন, নিজেই বুঝতে পারেনি নীল। এবার যেন একটু মানসিক শক্তি ফিরে পাচ্ছে ও। ফোনটা পকেট থেকে বের করল। কললিস্ট স্ক্রল করে কাকে ফোন করবে ভাবছিল, তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা ফোন। ট্রু কলারে কলকাতা পুলিশ জোড়াসাঁকো থানা। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা বাজখাঁই গলার আওয়াজ ভেসে এল। -মিস্টার শুভ্রনীল গাঙ্গুলি বলছেন? জোড়াসাঁকো থানা থেকে বলছি। আমাদের কাছে একটা উড়ো ফোন এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আপনার বাড়িতে খুন হয়েছে। আপনি কি এখন বাড়িতে আছেন? 

 

-হ্যাঁ। -আচ্ছা, আপনি বাড়িতে থাকুন। আমরা না আসা পর্যন্ত অন্য কাউকে ফোন করার, বা প্রতিবেশীদের ডাকার কোনও দরকার নেই। 

-ওকে স্যার

 

যে কোনও রহস্যের ভিতরে ঢুকতে গেলে প্রাথমিক ভাবে কিছু বিষয় জানা প্রয়োজন। মৃত ব্যক্তির নাম, ঘটনাস্থল ও কীভাবে দেহ উদ্ধার হয়েছে। এরপর ব্যক্তির পরিচয় জানতে পারলে চলে আসে পরের প্রশ্নগুলো। এই খুনের সঙ্গে কারা জড়িত। সন্দেহ বা হুমকি আছে কি নেই। সেই ব্যক্তির সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল কি নেই। অর্থাৎ সেই ব্যক্তির ডেইলি সার্কলটা ঠিক কতটা বড়! কার কার সঙ্গে মিশত সে! কখন খুন হয়েছে, ও মৃত্যুর কারণ- এই দুটো প্রশ্নের উত্তর ফরেনসিক ও ভালো পুলিশ অফিসারের দক্ষতায় পাওয়া গেলেও, যেটা না পাওয়া গেলে একটা কেস সলভ করা প্রায় অসম্ভব, তা হচ্ছে কী কারণে খুন। মানে মোটিভ। প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল।

 

শুরুতে যে কেসটা খুব সহজ মনে হয়েছিল, সেটা এখনও অন্ধকারে। কোনও তাগড়াই মোটিভ এখনও সামনে আসছে না। যত এগোচ্ছে জট খোলার বদলে আরও নতুন জট পাকাচ্ছে। দু’টো চরিত্র পাওয়া গিয়েছে। যাদের কাছে খুনের যথেষ্ট মোটিভ এবং সুযোগ আছে। প্রমাণ হাতে দুটো। কিচেনের একটা খাপে ছোট্ট একটা কাপড়ের টুকরো প্রথম দিনই স্পট থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইন্সপেক্টর সান্যাল। মিলিয়ে দেখেছে, সেটা ঈশিতার টপের একটা অংশ থেকে ছিঁড়েছে। কিন্তু খুনের সময় ওভাবে টপের কাপড় ছিঁড়ল কী করে!

 

আরেকটা প্রমাণ, বডির নিচে পাওয়া পায়ের ওপড়ানো নখ। দুটোই যত্ন করে রেখে দিয়েছে ইন্সপেক্টর সান্যাল। ফরেনসিক রিপোর্টে আরও একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য পেল ইন্সপেক্টর সান্যাল। মার্ডার ওয়েপনের অ্যাঙ্গেল ছিল ৪০ ডিগ্রি। কীভাবে সেটা সম্ভব! সকালে স্পটে এসে ফ্ল্যাটের দারোয়ানকে আরও একবার জিজ্ঞাসাবাদ চালাল। আর তা থেকে বেরিয়ে এল আরও একটা নতুন জট। সেদিন সকালে আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ একটা ছেলে এসেছিল ঈশিতাদের ফ্ল্যাটে। ও আগেও দু-একবার এসেছে। প্রত্যেকবারই নীল বাড়িতে না থাকাকালীন এসেছে। তবে কী ঘটনাটা ত্রিকোণ প্রেমের?

 

ঈশিতার কললিস্ট আর হোয়াটসঅ্যাপটা আরও একবার ভালো করে খতিয়ে দেখলেন ইন্সপেক্টর দাস। চোখে পড়ল এড়িয়ে যাওয়া একটা চ্যাটবক্স। সেখানে খুনের দিন, সেই তারিখেই আছে ছোট্ট দু’টো কনভারসেশন। একটা নম্বর সেভ করা নেই। 

-আর কতদিন এভাবে ঝোলাবি। আমার আর পোশাচ্ছে না। আজ মিট কর একবার।

– বাড়িতে আয়। নীল সকালেই বেরিয়ে গেছে।’

এরপর ওই নম্বর থেকে সাড়ে আটটা নাগাদ ফোন আসে বেশ কয়েকবার। ঈশিতা একবারও কলটা রিসিভ করেনি। ট্রু কলারে নম্বরটা দিয়ে দেখা যায় রাহুল বলে কোনও একজনের নম্বর। প্রোফাইলে যে ছবি আছে, তা দারোয়ানকে দেখাতেই বলল, এই খুনের দিন সকালে এসেছিল। ইন্সপেক্টর সান্যালের মনটা খুশিতে নেচে উঠল। পাতি ত্রিকোণ প্রেমের কেস। আর আগের দিন লক্ষ্য করেছেন ওদের মেন দরজাটা টেনে দিলেই লক হয়ে যায়। বাইরে বেরোনোর সময় লক করতে চাবি লাগে না। বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকতে চাবি লাগে। দ্বিতীয় নম্বরটা নীলের। নীল সকালে যখন বেরিয়েছিল, তখনও ঘুমোচ্ছিল ঈশিতা। রাতে ঝামেলার পরেও সকালে উঠে প্রথম মেসেজটা নীলকেই করেছিল। সকাল সাড়ে সাতটায় নীলকে মেসেজ পাঠিয়েছে। তারপর সাড়ে আটটায় রাহুল এসেছে বাড়িতে। খুনও হয়েছে ওরকম সময়েই। 

 

প্রথম কাজ এখন রাহুলের বাড়ি খুঁজে জেরা করা। মানিকতলার কাছে একটা পিজিতে থাকে। ট্রেস করতে খুব বেশি অসুবিধা হল না। তবে কথা বলে নিজেই জেরবার হয়ে গেল ইন্সপেক্টর সান্যাল। ঈশিতা কোচবিহারের মেয়ে। রাহুলও ওই জেলার ছেলে। স্কুল, কলেজে একসঙ্গে পড়লেও ওদের কোনও দিন খুব একটা বন্ধুত্ব ছিল না। দু’জনেই পড়াশোনা ও কাজের সূত্রে অনেকদিন কলকাতায়। কিন্তু যোগাযোগ হয়নি। সম্প্রতি ওদের যোগাযোগ বাড়ে। না, প্রেম-ট্রেম নয়। ঈশিতার একটা বুটিক ছিল।

 

আর রাহুল ছেলেটা প্রাইভেটে সুদের ব্যবসা চালাত। লোককে মোটা টাকা ধার দিত। চড়া সুদে তা ফেরৎ নিত। বুটিকের জন্য ঈশিতাকে লাখতিনেক টাকা ধার দিয়েছিল রাহুল। সেকথা ঈশিতা নীলকে জানায়নি। তাই এত গোপনীয়তা। এখন রাহুল ওই টাকা ফেরত চাইছিল। মেসেজে সেদিন টাকার কথাই বলেছিল। ইন্সপেক্টর সান্যাল বলল, -সত্যি কথা বল। আর কোনও ঘাপলা ছিল না তো তোদের মধ্যে। এখন না বললে জেলে ঢুকিয়ে মেরে মেরে কথা বের করাব। 

-স্যার আমি যা বলার আপনাকে বলেছি। সেদিন টাকার ব্যাপারে কথা বলতেই ওদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। কিন্তু এতবার ফোন করার পরও কোনও সাড়া পায়নি। 

-আর তাই তুই ভদ্র ছেলের মতো ফিরে গেলি। টাকার জন্য আর মেসেজ বা ফোন কিছুই করলি না! বল না, বল না- টাকা না পেয়ে রাগের মাথায় ঈশিতার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছিস। তাই এখন বলছিস, আর টাকা লাগবে না। 

-না স্যার, আপনি প্রমাণ করতে পারলে আমাকে অ্য়ারেস্ট করুন। ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওর মাসি এতটাই ধাক্কা পেয়েছে, যে মেয়ের ডেডবডিও রিসিভ করতে আসবে না বলে দিয়েছে। আপনি চাইলে ওদের ফোন করে দেখতে পারেন। 

 

মাসি কেন! ঈশিতার বাবা-মা কোথায়! এই একটা কথায় এবার ইন্সপেক্টর সান্যালের ফের খটকা লাগল। কোচবিহার কোতোয়ালিতে একটা ফোন করে প্রথমে ফরমালিটিজ সারল। যেটা এতদিন করে ওঠা হয়নি। এবার ওখান থেকে যা শুনল, তা হল খানিকটা এরকম। ইন চার্জ বলল, ঈশিতার মা-বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছে। এরপর মাসির কাছেই মানুষ ও। মাসির বয়সও সত্তরের ওপরে। কিন্তু এই বয়সে কলকাতা আসা কি আর সম্ভব! আমরা কলকাতা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঈশিতার খবর পেয়েছি। কিন্তু আপনিই যে কেসটা দেখছেন জানতাম না। ঈশিতার বাড়ির এলাকায় কোনও প্রাক্তন প্রেমিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে কিনা, তার আপডেট জানাতে বলে ফোনটা কেটে দিল ইন্সপেক্টর সান্যাল। সেই মুহূর্তে বেজে উঠল সৌম্যের ফোন। 

– স্যার আমরা এখনও তিনজন সাসপেক্ট পেলাম। অথচ এত খুঁজেও বাড়িতে কোথাও ঈশিতা আর শুভ্রনীল ছাড়া অন্য কারও ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া গেল না। ঘটনাস্থলে তৃতীয় কারও থাকার একটা কোনও সূত্রও না। তাহলে কি আমরা ঠিক পথে এগোচ্ছি! 

– তোমার কি মনে হচ্ছে, কে আমাদের প্রাইম সাসপেক্ট? আর তিনজনের মধ্যে কাকে কাকে রাখছ তুমি? 

– প্রথম সাসপেক্ট, অবশ্যই নীল। রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে ও বেঁচে গেলেও প্রথম সন্দেহ ওর ওপরই পড়বে। দুই মিস্টার মেহতা। তার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়নি। শুধু তাই নয়, পাবলিক ইমেজও খারাপ করেছে। তিন, এই রাহুল বলে ছেলেটা, যার সঙ্গে আপনি দেখা করতে গেলেন। টাকার জন্য খুন করাটা অস্বাভাবিক তো নয়। বাই দা ওয়ে, কী বলল ছেলেটা? কোনও নতুন সূত্র পেলেন কি! 

– নাথিং। আমাকে ভাবাচ্ছে অন্য একটা বিষয়। নীল আর ঈশিতা ছাড়া বাড়িতে অন্য কোনও লোক আসেনি, সেটা কনফার্ম। পরিচিত কেউ খুন করে থাকলেও ঈশিতা বাঁচার চেষ্টা তো নিশ্চয়ই করবে। সেরকম কোনও কিছু, মানে ধস্তাধস্তির ছাপ, বা সেরকমও কিছু তো পাওয়া যায়নি। একবার চট করে স্পটে আসো তো সৌম্য। 

ঈশিতার ফ্ল্যাটের রান্নাঘর, অর্থাৎ ক্রাইম স্পট ছোট্ট একফালি রান্নাঘর। এবার তার বিবরণটা এখানে একটু দেওয়া যাক। একটা মডিউলার কিচেন যেমন হয় আর কী। চিমনি বাদে প্রায় সবই ছিল। নিচে চারটি ড্রয়ার। ওপরে দুটো মিডিয়াম ড্রয়ার। মাঝখানে বাসন,মশলা আর অন্য জিনিসপত্র রাখার চারটে ড্রয়ার। এত জিনিস থাকলেও রান্নাঘরের জায়গাটা একটা গলির মতো।

 

আড়াআড়িভাবে দুটো মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ানো যাবে না। কিন্তু পাশাপাশি তিনজন দাঁড়াতে পারবে। একটা স্ল্যাব, যেখানে গ্যাসের ওভেন আর বাইরের দিকটায় কিচেন সিঙ্ক। ঈশিতা চপার বোর্ডের ওপর কিচেন নাইফটা রেখে রান্নাঘরে ঢুকেছিল। ছুরির ফলাটা ছিল ওর বিপরীত দিকে। সঙ্গে ওর হাতে ছিল সবজির ঝুড়ি। লাশের পাশে সবই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পৌঁছে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাটা একবার রিওয়াইন্ড করে নিল ওরা। সান্যাল বলল, -বডিটা পড়েছিল কিচেনের ঠিক মুখে। কিচেনের মধ্যে যদি কেউ ওর পেটে ছুরি বিঁধিয়ে দেয়, তাহলে ধস্তাধস্তির চিহ্ন আমরা দেখতে পেতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনও চিহ্ন আমরা পাইনি! ধরেই নিলাম, ভিতর থেকেই আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু আক্রমণ হলে উপুড় হয়ে পড়বে কেন! উপুড় হয়ে কখন পড়ে? 

-যদি আত্মহত্যা করে।

চাপা গলায় বলল সৌম্য। নিমেষে বিদ্যুৎ খেলে গেল ইন্সপেক্টর সান্যালের মাথায়।

– এক্সিলেন্ট সৌম্য। ব্র্যাভো। 

সৌম্য কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তারপর মিনমিন করে বলল, আমি কি করলাম স্যার? 

-আলোর পথে নিয়ে গেলে ভাই তুমি। আচ্ছা তুমি কী বললে, আরেকবার বলো। মানে লজিক দিয়ে বলো।

-আমার মনে হল, কেউ যদি নিজের পেটের ছুরি চালায় তাহলেই এরকম উপুড় হয়ে পড়তে পারে। 

-একজাক্টলি। যন্ত্রণা অনুভবের হিউম্যান সাইকোলজি। কেউ যদি একটা ছুরি নিয়ে নিজের পেটে চালায় তাহলে সেই ব্যক্তি অধিকাংশ সময়ই মাথা নিচু হয়েই সেই যন্ত্রণা অনুভব করে। আর যদি আঘাত উলটো দিক থেকে আসে তাহলে সে…

-চিৎ হয়ে পড়ে। তাহলে কি এটা আত্মহত্যা!

-না হে সৌম্য। অ্যাক্সিডেন্ট।

-অ্যাক্সিডেন্ট? কী বলছেন কী!

এক লাফে রান্নাঘরের ভিতরে চলে গেল ইন্সপেক্টর সান্যাল। তারপর হাতে একটা সবজির ঝুড়ি, চপার বোর্ড আর ছুরি তুলে নিল। তারপর সৌম্যের দিকে ইশারা করে বলল,

-ধরে নাও, আমি ঈশিতা। আমার হাতে এই তিনটে জিনিস একসঙ্গে আছে। সবজির ঝুড়ি- বেশ ভারি। সেটা বাঁ হাতে তুললাম ঈশিতা। আর ডান হাতে চপার বোর্ড আর তার ওপর তীক্ষ্ণ ফলার একটা কিচেন নাইফ। মেয়েদের হাতের জোর তুলনামূলক একটু কম হয়। ব্যালেন্স করার জন্য বেশ সাবধানে হাঁটতে হবে এবার এত জিনিস নিয়ে। রান্নাঘরে ঢুকে চপারবোর্ড আর ছুরি নামানোর পরেই ওর টপের একটা অংশ এই ড্রয়ারের হ্যান্ডেলে আটকে গেছিল। এটা ধরে দেখো, বুঝতে পারবে- প্রত্যেকটা স্টেনলেস স্টিলের আর কোনগুলো অসমান ও ধারাল। এতে খোঁচা লাগলে এমনি কেটে যাওয়ারও চান্স আছে। আর টপ আটকে যাওয়াতে সেটা খোলার চেষ্টা করে ঈশিতা।

 

কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে, দুটো হাত ফাঁকা করে, মানে জিনিসগুলো নামিয়ে জামাটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এখানেও সেই হিউম্যান সাইকোলজি। দুটো হাত আটকে থাকলে, আমরা শরীর ঝাঁকিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক মুশকিল আসান করার চেষ্টা করি। সেই ঝাঁকানোতে চপারবোর্ড আর ছুরি নিচে পড়ে। আর তাল সামলাতে না পেরে ঠিক তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে ছুরির ওপর পড়ে ঈশিতা। এক্ষেত্রে মনে রাখো সৌম্য, তিন-চার সেকেন্ড। চপারবোর্ড পড়ার ওই মুহূর্তেই ঈশিতার টপের ওইটুকু অংশ ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। আর এই সেই টুকরো। 

এত অবধি বলে পকেট হাতড়িয়ে একটা প্লাস্টিকের মোড়ক বের করল ইন্সপেক্টর সান্যাল। সৌম্য এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্যারের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে শুনছিল। যেন স্লো মোশনে গোটা ঘটনার রিপিট টেলিকাস্ট চলছে। সান্যাল থামতেই সৌম্য ঝুঁকে এগিয়ে গেল টপের অংশটি দেখার জন্য। তারপর বলল,

-স্যার প্লিজ থামবেন না। আমার শরীরের ভিতরে কেমন যেন শিহরণ খেলে যাচ্ছে। তারপর কী হল বলুন প্লিজ।

-ছুরি যদি উল্টো করে রাখা থাকে, তাহলে মাটিতে বাউন্স খেলে কোনদিকটা উপরে থাকে সৌম্য? ধারালো দিক পড়তেই পারে ওপরে। আর ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডে তাল সামলাতে না পেরে ঈশিতা এভাবে ছুরির ওপর পড়ল। তুমি যদি ফরেনসিক রিপোর্ট দেখো, সেখানে একটা অদ্ভুত তথ্য আছে। খুন করার সময় কখনও খুনি কখনও ছুরি ত্যারছা করে ঢোকানোর চেষ্টা করবে কী! মনে রাখবে, খুনির মনোস্তত্ত্ব সব সময় উল্লম্বরেখায় চলে। পেটে বা বুকে ঢোকালে ৯০ ডিগ্রি। আর গলায় কোপ মারলে তা ১৮০ ডিগ্রি। কিন্তু ফরেনসিকের রিপোর্ট বলছে, ঈশিতার দেহে ছুরি ঢোকার অ্যাঙ্গেল ৪০ ডিগ্রি। এটা একমাত্র সম্ভব অসাবধানতায় ছুরির ওপর যদি কেউ পড়ে যায়। 

-তদন্ত শেষ তাহলে স্যার! আমরা কী ভাবছিলাম, আর কী হল!

-ধীরে বৎস্য। আরও একটা প্রমাণ বাকি থেকে গেল যে। যা নিয়ে আমাকে মাথা অনেকটাই ঘামাতে হয়েছে। এই যে।

পকেট থেকে আরও একটা প্লাস্টিক মোড়ক বের করলেন ইন্সপেক্টর। 

-এটা তো নখ!

নাক কুঁচকে বলল সৌম্য। 

-ইয়েস। এটি ঈশিতার উপড়ে যাওয়া নখ। সেদিন সকালে এই দুর্ঘটনার সময় যা উপড়ে যায়। সিঙ্কের প্রায় নিচে চলে গেছিল। ক্রস চেক করেছি বডির সঙ্গে। তাহলে রিপোর্ট আরও পাক্কা হয়ে গেল। 

সৌম্যের চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল,

-স্যার একটা অনুরোধ ছিল। কেস ফাইলটা তৈরি করার পর, একবার যদি আমাকে পড়তে দেন। আসলে উত্তেজনায় মাথা এখন কাজ করছে না। 

কাঁধ চাপড়ে দিয়ে ইন্সপেক্টর সান্যাল বলল, 

-সে হবেখন। তার আগে তোমার একটা কাজ আছে। বিকেলে কয়েকজন সাংবাদিক ডেকে নিও। কিছু বড় চ্যানেলও যাতে থাকে। যাতে ভিডিও এভিডেন্স হয়। গুছিয়ে বলবে তুমি। দরকার হলে আমিও থাকব। 

কথায় বলে, জন্ম-মৃত্যু বিধাতার হাতে। নিজের হাতে নিজেই খুন। যাকে আবার খুন বলা যায় না। আত্মহত্যাও বলা যায় না। আইনি চোখে দুর্ঘটনা। কী অদ্ভুত না! নিজের মনে একগাল হাসল। তারপর ঈশিতাদের ফ্ল্যাটের দিকে একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে জিপের স্টিয়ারিং ঘোরাল থানার রাস্তায়।

Sushweta Brahmachary

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply