শোগোৎসু  –  শম্পা  সাহা  – অন্তিম – পর্ব
shampasaha

শোগোৎসু – শম্পা সাহা – অন্তিম – পর্ব

সেবার শোগোৎসুর ঠিক আগে আগে হঠাৎই গ্রামে এক আগন্তুক এর আবির্ভাব। চুল দাড়ি লম্বা লম্বা, পরণে শতছিন্ন সৈনিকের পোশাক ,প্রায় পাগল উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। গ্রামে ঢোকার মুখে একটা বড় চেরি গাছতলায় আশ্রয় নিয়েছে । চারিদিকে উৎসবের আবহ তাই কেউ আর আগন্তুককে কিছু বললো না । উৎসবের সময় কাউকে আঘাত করতে নেই, মানসিক ভাবেও না। এই ঐতিহ্য জাপানের গর্ব তাই কেউ কেউ পাগলকে খাবার দিতে লাগল রোজ । কিন্তু পাগল যেন হাতরে বেড়ায় কিছু কিন্তু খুঁজে পায় না! শুধু একটা কথাই বলে কিন্তু কি বলে বিড়বিড় করে? তা কেউ বুঝতে পারে না। খুব চাপা স্বর। পাগলের মুখের কাছে কান দিয়ে কে আর শুনবে?
 
   দাই শোগোৎসুর  আগের সন্ধ্যায় শহর থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, মা বোনের জন্য উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বাসে শিরাকাওয়া বাস স্টপ ,সেখান থেকে সাইকেলে বাড়ি।রাত বেশ বেড়েছে ,তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে আসতে গিয়ে হঠাৎ ধাক্কা লাগল যেন কিসের সাথে ?আসলে  দাই মনের মধ্যে কালকের উৎসবের ছক করছিল, তাই খেয়াল করেনি। বৃদ্ধ আগন্তুক আনমনে রাস্তা পার হতে গিয়ে ,তাকে ধাক্কা মেরেছে দাই। মালপত্র ছড়িয়ে পড়ল ,কিন্তু দাই সেদিকে না তাকিয়ে ছুটল বৃদ্ধের দিকে। বারবার কাকুতি-মিনতি করে ক্ষমা চাইতে লাগলো ,”গোমেননাসাই,গোমেননাসাই”,আমাকে মাফ করুন আমাকে মাফ করুন।
 
   কিন্তু বৃদ্ধ জ্ঞান হারিয়েছেন।একজন পথচলতি লোকের সাহায্যে বৃদ্ধকে বাড়ি নিয়ে যায় দাই। আকি ছুটে আসে ,”কি হয়েছে ওনার? “,উৎকণ্ঠায় সব শুনে ভীষণ অনুতপ্ত, জল দিয়ে জ্ঞান ফেরান বৃদ্ধের । আকি বলে, ” বৃদ্ধ আজ এখানেই থাকুন ,কাল নতুন বৎসরের উৎসব। উনি এখানে থেকে একটু সুস্থ হয়ে যাবেন না হয়!”। জ্ঞান ফিরলে রাতে বৃদ্ধ  যেন ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে শুয়ে শুয়ে কি বিরবির বিরবির  করতে থাকেন। আকি কথাগুলো শোনবার জন্য ওর মুখটা বৃদ্ধের মুখের কাছে নিয়ে যায় । কি জানি হয়তো ওনার পরিবারের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে !কিন্তু একি শুনলো আকি! কি শুনলো! “আকি মোদত্তে কিমাসু”,আকি আমি ফিরে আসবো। একি? ও কি সত্যি শুনছে? কি শুনছে আকি!
 
    চিৎকার করে মেয়েকে ডাকেন, “আই…….”, মায়ের চিৎকারে ছুটে আসে আই। ” দেখতো শুনে উনি কি বলছেন? “, মায়ের কথায় কান পাতে বৃদ্ধের ঠোঁটের কাছে, সত্যিই তো তাই বলছেন, ” আকি আমি ফিরে আসবো”, তাহলে কি ? আকি আনন্দে আত্মহারা হয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। উৎকণ্ঠার দোলাচলে তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে, এই দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে আসল মানুষকে চেনার কোন উপায় নেই। দাই বাড়ি ফিরতে ওই রাতেই পাড়ার নাপিত কে ডেকে পাঠায় আকি। নাপিত চুল, গোঁফ, দাড়ি কেটে তাকে নতুন পোষাক পরায়। সকলে একেবারে চমকে ওঠে, একি! এতো কিশি! যে আজ থেকে বহু বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেনি!
 
    আকি ছেলে মেয়ের সামনেই সব ভুলে কিশিকে জড়িয়ে ধরে । কিশি বিহ্বল ,কিছুই বুঝে উঠতে পারে না! এরা কারা? তবে বৃদ্ধ এটা বোঝে এরা ওর আপন। পাগল হলেও স্নেহের স্পর্শ তো সবাই বোঝে। 
 
   পরদিন আবার সাতো পরিবারের শোগোৎসু পালিত হল মহা ধুমধামে । আজ আকি পড়েছে সেই কিমোনো জোড়ার একখানা আর অন্যটা পড়িয়েছে কিশিকে ! আজ যে তাদের অপেক্ষা শেষ হয়েছে! আজ যে তাদের পূর্ণ মিলনের দিন ,আজ কিশি আর আকির জীবনের সত্যিকারের শোগোৎসু ।। 
 
Shampa saha
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply