সুইসাইড কেস  –  সবিতা কুইরী
Sabita Kuiri

সুইসাইড কেস – সবিতা কুইরী

  • Post category:গল্প
  • Post comments:1 Comment
  • Post last modified:December 20, 2020
  • Reading time:1 mins read

 

মাটির রাস্তায় একটা শুকনো কাঠি দিয়ে  চিক কেটে চু কিত  কিত খেলছিল শম্পা। হাঠুর ওপরে উঠে যাওয়া ফ্রক পরে এক মাথা এলোচুলে লাফিয়ে লাফিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কিত কিত  খেলে পায়ে হাতে ধুলো মেখে বাড়ি ফিরে মায়ের কিল চড়- এ যেন রোজকার রুটিন হয়ে গেছে বছর পনের কিশোরীর শম্পা র।

এরকমই এক রোজকার রুটিনে ব্যাঘাত ঘটাল পাড়ারই এক যুবক।দাড়িয়ে দাড়িয়ে শম্পার লাফানো দোদুল্যমান শরীরের সৌন্দর্য দেখছিল আনমনা হয়ে। খেলতে খেলতেই থমকে দাঁড়ায় শম্পা তারপর তাকিয়ে থাকে দুজন দুজনের দিকে।রাস্তায় সাইকেলের ঘন্টার আওয়াজ কানে আসতেই দৃষ্টিতে পলক পড়ল চোখে দুজনের।

ব্যাস তারপর শম্পার সেই ধুলোমাখা পা দুটি আর ধুলোতে রাঙালো না এর পর থেকে।পায়ের আঙুলের উঠল রঙিন নখপালিশের প্রলেপ । চঞ্চল শিশু সুলভ কিশোরীটি কোথায় যেন হারিয়ে গেল।স্বভাবে লাজুক ভাব এসে চঞ্চলতা কাটিয়ে শান্ত হয়ে গেল ওপর থেকে।কিন্তু মনে যেন সমুদ্রের তরঙ্গ আছড়ে পড়তে লাগল।প্রেমের জোয়ারে তোলপাড় করা হৃদয়ে রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ।রাতদিন মিলেমিশে একাকার ।রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে সারাক্ষণই ।মাঝেমাঝে উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা তার প্রাণসখাকে।

কখনো দেখেও লুকিয়ে যায় । গ্রামের মাটির রাস্তা দুপাশে নানা রকম গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা প্রকৃতির বেড়া দেওয়া রাস্তার শেষ প্রান্তে থাকা মস্ত পুকুরে স্নান করতে যাওয়ার ফাঁকে দেখা হয় দুজনের।শুরু হয় অল্প অল্প প্রেমালাপ। ভালোবাসাবাসি। কি যে ভালো লাগে সব কিছু ।

পৃথিবীর সর্বস্ব সুখ যেন তার হাতের মুঠোয় ।আর মায়ের কিল চড় পড়ে না পিঠে।সব সময় যেন ভাবুক হয়ে থাকে।ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসির রেখা। রাস্তার ধারে চু কিত কিত না এখন তার প্রিয়  জায়গা হল ঘরের কোণের জানলাটা।সেটা যেন একটা দুরবীন।যেকোন মানুষ পেরিয়ে গেলেই দেখা যায় একটু উঠোন ঘেঁষা বলে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বসে থাকা মানুষজন কে অনায়াসেই দেখা যায় । আর দাদার বন্ধু হওয়ার সুবাদে প্রাণসখা তো এখানেই ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা ।

তাই বাইরে বেরোনোর দরকারই পড়ে না।দেখার ইচ্ছা পুরণ চোখাচোখিতেই হয়ে যায় ।কখনো কখনো একটু কাছে এসেও মোবাইল এ ছবি দেখে প্রাণসখার কাছে।ছবি দেখতে দেখতে হাতের পরশ ও পায় দুটিতে।সে কি অনুভূতি কি মধুর সুখানুভব যারা এই সুখ পেয়েছেন তারাই ভালো বুঝবেন। এইভাবেই চলে যাচ্ছিল সুন্দর মুহূর্তের দিনগুলো।

বাড়িতে থাকা শম্পার ঠাকুমা এই প্রেমের গন্ধ পেয়েছিল কিছুটা ।মন্দ লাগত না ঠাকুমার ।মাঝে মাঝে বলেই ফেলত ঐ ছোঁড়াটা  নাতজামাই হলে কেমন হয় লো শম্পি? লজ্জায় মুখ রাঙা হয়ে যাওয়া শম্পা হাত দিয়ে মুখ লুকিয়ে বলত ঠাকুমা ভালো হচ্ছে না কিন্তু।মুখে বললেও মনে মনে দারুণ উপভোগ করত ঠাকুমার কথা।

এইভাবে চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে।লুকিয়েও বাড়ির পেছনে দেখা হয় দুজনের।চারিদিকে গাছ পালা দিয়ে ঘেরা ।লাউ  কুমড়োর লতানা গাছের ফাঁকে ফাঁকে হলুদ সরষের ফুলের অপরূপ শোভা একটু  দূরেই ছোট পুকুরের পাড়ে তাল নারিকেল গাছ যেন সাক্ষী এই দুটি নিষ্পাপ প্রেমের। কিন্তু কথায় আছে ফুলের গন্ধ কখনো চাপা থাকে না।

এইভাবেই একদিন দেখা করার সময় হাতে হাত রেখে কপালে চুমু খাওয়ার একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত দেখে ফেলে পাড়ার কোন লোক। কথাটা কানে যায় যুবকের মার। শম্পা  কে দোষারোপ করে চারটি কথা ও শুনিয়ে যায় বাড়ি বয়ে। এরপর শুরু হয় শম্পা র বাড়িতে অশান্তি ।যুবকের মায়ের কথা হজম হল না শম্পা বাড়ির লোকজনদের।

তাঁরা সিদ্ধান্ত নেয় মেয়ের বিয়ে দেবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব । এদিকে ছেলেটি বাড়ি তে জানাই সে শম্পা কেই বিয়ে করবে।কিন্তু বাড়িতে রাজি না থাকায় সে নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দোরে খিল দিয়ে বসে থাকে। শেষে ছেলের অবস্থা থেকে বাড়ি র লোক রাজি হয়ে শম্পার বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে।কিন্তু শম্পা র বাড়ি থেকে মোটেই রাজি হল না উল্টে শম্পা কে দুরে মাসির বাড়ি তে নজর বন্দি করে রেখেই তড়িঘড়ি করে পাত্র খোঁজা শুরু হল। শেষে শম্পারই প্রেমিকের এক নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে শম্পার বিয়ের ঠিক হল।

বলা বাহুল্য সব জেনেবুঝেই পাত্র শম্পা কে বিয়ে করে উদ্ধার করতে এক বাক্যে রাজি হয়ে যায় ।এমন কি পাত্রের বাড়ির সবাই সব কিছু জেনেই শম্পা কে বাড়ির বৌ করতে রাজি। শম্পার দাদার সঙ্গে  শম্পা র প্রেমিক এর বন্ধুত্ব থাকায় শম্পা মাসির বাড়ি তে আটক আছে এ খবর যুবকটি পেলে তাকে উদ্ধার করতেও সেখানে হাজির হল কিন্তু শেষ রক্ষা হল না শম্পা নাকি বেরিয়ে আসতে রাজি হয়নি।কিন্তু আসল কথা হল শম্পা কি আদৌ সে খবর পেয়ে ছিল?? মনে হয় না। মিথ্যা বলা হয় শম্পার হয়ে।যুবক প্রেমিক মুষড়ে পড়ে এক বুক অভিমান নিয়ে বাড়ি ফেরৎ আসে।

পরদিনই বিয়ে হয়ে গেল শম্পার বৌ হয়ে চলে গেল বাড়ি র থেকে ঠিক করা পাত্রের সঙ্গে । পাহাড় ফাটা কান্না বুকেই চেপে রাখতে হল শম্পা কে ।দম আটকে আসে তার শশুরবাড়িতে।তবুও নীরবে কাঁদে পাছে কেউ দেখে ফেলে। কয়েকদিনের মধ্যেই মদ্যপ স্বামীর অত্যাচার এবং বাড়ির লোকের অশ্লীল ভাষায় গালাগালি মানসিক ও শারীরিক কোনটাই বাকি থাকল না।

এমন কি তাকে শশুরডাড়ি ছাড়ার হুমকিও দেওয়া হয়। তারই মাঝে বাপের বাড়ি আসে একদিনের জন্য স্বামীর সঙ্গে । এখানে এসেই পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হতেই কান্নায় ভেসে যায় শম্পা  যুবকটিও প্রচুর কষ্ট পায় । শান্তি পায় শম্পা এটুকু ভেবেই যে সেও তাকে এখনও ভালোবাসে।

শ্বশুরবাড়ি ফিরে যায় সে।কিছুদিন কাটার পর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এক রকম জোর করেই বাপের বাড়ি আসে সে। কিন্তু যুবক প্রেমিক আর দেখা করে না তার সঙ্গে ।লুকিয়ে থাকে বাড়ির মধ্যে ।বাড়ির লোক বলে দিয়েছে শম্পার সঙ্গে যেন কোন সম্পর্ক না রাখে আর। এটাই তো স্বাভাবিক তাই না??? কিন্তু শম্পা বাঁচতে চাই।শশুরডাড়িতে থাকলে মেরে ফেলবে তাঁরা ।

কিছুতেই শম্পা কে শান্তি তে বাঁচতে দেবে না। আচ্ছা শম্পার কি বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই??? কিন্তু শম্পা তো তার প্রেমিকের কাছে আর ফিরতে পারবে না সে যে অশুচি হয়ে গেছে।ইচ্ছে থাকলেও নাকি কোন উপায় নেই তার প্রেমিকের।তাই তো সে শম্পাকে দেখলেই লুকিয়ে থাকে।

শম্পার কিন্তু সেরকম কোন দাবী ও নেই শুধু এখানে এসে তার ভালোবাসার ভগবান কে এক টু  চোখের দেখা দেখবে ব্যাস এই টুকু। সেটাও যখন হল না শশুরডাড়ি ফিরে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিষ খেল শম্পা।কিন্তু বলে না মেয়েদের নাকি কই মাছের প্রাণ।বেঁচেই গেল  সে।

প্রশ্ন হল

1)শম্পা কি সত্যি সত্যি বাঁচল?

2)শম্পার  এই বাঁচার কে দাম দেবে?

3)শম্পা কি সত্যি অশুচি হয়ে গেল?

4)এখন কি তার প্রেমিকের সত্যি করণীয় নেই?

5)শম্পার বর্তমান স্বামী কি উদ্দেশ্যে শম্পাকে বিয়ে করল?

6)ছেলেরা কেন অশুচি হয় না?

 

Print Friendly, PDF & Email

This Post Has One Comment

Leave a Reply